ধর্ম কি কেবল সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক পরিস্থিতির উৎপাদন?
রাসেল আহমেদ | প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর, ২০২৫

মিডিয়া মিহির: যদি আমরা মহান নবীদের জীবন পর্যবেক্ষণ করি, দেখা যায় তারা সবাই—একেবারেই ব্যতীত—সমাজের ভুল বিশ্বাস ও প্রথার বিরুদ্ধে কিয়াম করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের আলোকিত করা ও পথ প্রদর্শনের মাধ্যমে অনেক মানুষকে সেই একই ভুল পথ থেকে সঠিক পথে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন।
মানবজাতির সত্য অনুসন্ধানের আকাঙ্ক্ষা কোনো সীমান্ত চেনে না; বুদ্ধি ও স্বাভাবিক জ্ঞান মানুষকে ভৌগোলিক সীমানার বাইরে পৌঁছে দেয়।
ভ্রান্ত ধারণা
কিছু লোক মনে করেন ধর্ম ও বিশ্বাস কেবল সমাজের উৎপাদন এবং এটি ভৌগোলিক জবর অনুযায়ী গঠিত। অর্থাৎ, মানুষ যেখানে জন্মায়, সে সেই অঞ্চলের ধর্ম গ্রহণ করে।
সত্য ও ব্যাখ্যা
মানুষ বুদ্ধিমান, চিন্তাশীল এবং সত্য অনুসন্ধানী। অর্থাৎ, মানুষ পরিবেশের সঙ্গে যোগাযোগের সময় নানা প্রশ্ন করে এবং যত বেশি তার বুদ্ধি বিকশিত হয়, সেই প্রশ্নগুলো আরও গভীর ও ফলপ্রসূ হয়।
মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি প্রশ্ন হলো:
- আমরা কোথা থেকে এসেছি?
- আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য কী?
- আমরা কোথায় যাচ্ছি?
এই তিনটি প্রশ্ন মানবজাতির জন্য প্রাচীনকাল থেকে গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ সবসময় এই প্রশ্নগুলির যথাযথ ও সন্তোষজনক উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করে। যতক্ষণ না সে উত্তর পায়, সে কখনও সত্যিকারের শান্তি অনুভব করতে পারে না।
দর্শনশাস্ত্রের ভূমিকা
দর্শনশাস্ত্রও এ কারণে সৃষ্টি হয়েছে। এটি মানুষের চিন্তা ও বিশ্লেষণকে কেন্দ্র করে। দর্শন একটি স্বাধীন বিজ্ঞান, যা চায় মানুষ বাস্তবতাকে যেমন তা আছে, তেমনভাবে বোঝুক। এখানে বলা হয়, শুধুমাত্র যুক্তি গ্রহণযোগ্য; যা যুক্তি ও প্রমাণ ছাড়া বলা হয়, তা গ্রহণযোগ্য নয়। যুক্তি হলো দুটি নিশ্চিত প্রিমিস থেকে প্রাপ্ত ফলাফল, যা নিজেই নিশ্চিত।
সুতরাং, যদি মানুষ সত্যের অনুসন্ধানে থাকে এবং প্রতিটি বিষয় যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে গ্রহণ করে, সে কখনও ভ্রান্ত ধারণা বা কুসংস্কারে বিভ্রান্ত হবে না। মানুষকে সমাজের রীতিনীতি বা প্রথার প্রতি অন্ধভক্ত হতে হবে না। তাকে এগিয়ে গিয়ে নিজের বুদ্ধি দিয়ে তা মূল্যায়ন করতে হবে। যদি তা যৌক্তিক মনে হয়, গ্রহণ করতে হবে; আর যদি তা বুদ্ধি ও স্বাভাবিক জ্ঞানের বিপরীত হয়, তা পরিত্যাগ করতে হবে।
নবীদের উদাহরণ
মহান নবীরা সবাই সমাজের ভুল বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কিয়াম করেছেন এবং কিছু সময়ের মধ্যে অনেক মানুষকে আলোকিত করেছেন।
হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর উদাহরণ
তিনি এমন একটি সমাজে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, যেখানে কেবল কয়েকজন ব্যতীত সবাই মূর্তিপূজক ও মুশরিক ছিল। তিনি জীবনের প্রায় ৪০ বছর আগে পর্যন্ত মূর্তিপূজারী হননি। পরে প্রেরিত হয়ে তিনি তীব্রভাবে তাদের ভুল ধর্মের বিরুদ্ধে লড়াই করেন। খুব কম সময়ে অনেক মানুষকে তার সঙ্গে নিয়ে আসেন এবং ২৩ বছরের মধ্যে সমাজ থেকে সমস্ত মুশরিকতা ও মূর্তিপূজা নির্মূল করেন। তিনি বুদ্ধি ও যুক্তির ভিত্তিতে নতুন ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন।
আধুনিক উদাহরণ
বর্তমানে ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক মানুষ যারা অনৈতিক পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন, তারা নিজেরাই ধর্ম পরিবর্তন করে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। প্রায় ৩০–৪০ বছর আগে ইউরোপে ইসলামকে বিদেশী ধর্ম বলা হতো, এখন অনেক দেশে ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম হিসেবে গণ্য। তারা মুসলিম দেশে স্থানান্তরিত হয়নি; তারা নিজ দেশে ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
ধর্ম কখনও ইতিহাস বা ভৌগোলিক জবরের ফল নয়।
১. সমাজ কখনও মানুষের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে পারে না।
২. সারা বিশ্বে দেখা যায়, মানুষ এমনকি অনুপযুক্ত পরিবেশেও নিজের ধর্ম পরিবর্তন করতে সক্ষম।
এই উদাহরণগুলি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ধর্ম কেবল সংস্কৃতি বা ভৌগোলিক অবস্থার ফল নয়। ধর্ম মানবজাতির মৌলিক সত্য ও যুক্তির অনুসন্ধানের ফল।



