কীভাবে জনগণকে সাংস্কৃতিক যুদ্ধের বাস্তবতার সঙ্গে পরিচিত করা যায়?
রাসেল আহমেদ | প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর, ২০২৫

মিডিয়া মিহির: আমরা এমন এক যুগে বসবাস করছি, যেখানে প্রচলিত কঠিন যুদ্ধ ধীরে ধীরে তার স্থান ছেড়ে দিয়েছে আরও জটিল, বহুস্তরবিশিষ্ট ও গভীর প্রভাবসম্পন্ন এক সংঘর্ষের কাছে—যাকে বলা যায় সাংস্কৃতিক, নরম ও গণমাধ্যম যুদ্ধ। এই যুদ্ধে কামানের চেয়ে গণমাধ্যম শক্তিশালী, আর ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে বার্তা অধিক কার্যকর। এখানে সংবাদ কেবল তথ্য পরিবহনের মাধ্যম নয়; বরং গণমাধ্যম নিজেই হয়ে উঠেছে যুদ্ধক্ষেত্র, চিন্তা নির্মাণের কারখানা এবং জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অন্যতম প্রধান উপাদান।
বিশ্ব আধিপত্যবাদী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে অনুধাবন করার এবং শক্তিশালী ও কার্যকর গণমাধ্যম কাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন অনুভব করছে। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী বিপ্লবের নেতার ধারাবাহিক দিকনির্দেশনা—বিশেষত গণমাধ্যম ফ্রন্ট, বুদ্ধিদীপ্ত প্রচার বিন্যাস এবং জিহাদে তাবইনের ওপর তাঁর জোর—বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
এই বাস্তবতার আলোকে গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম আলী কাহরেমানির সঙ্গে একটি চিন্তামূলক আলোচনা উপস্থাপন করা হলো। আলোচনার মূল প্রশ্ন ছিল— আজকের এই জটিল ও বহুমাত্রিক পরিস্থিতিতে একটি সফল বিপ্লবী গণমাধ্যম নির্মাণের বাস্তব ও মূল্যায়নযোগ্য সূচক কী হতে পারে?

বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম
বিপ্লবের দুটি নির্ণায়ক অধ্যায়
ভূমিকাস্বরূপ একটি মৌলিক বিষয়ে দৃষ্টি দেওয়া জরুরি।
ইসলামী বিপ্লবের ইতিহাসে আমরা দুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নির্ধারক অধ্যায় অতিক্রম করেছি— যে দুটি বিষয়ে বিপ্লবের দুই ইমাম, ইমাম খোমেনি (রহ.) ও ইমাম খামেনেয়ি, গভীর উদ্বেগ ও সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা প্রদান করেছেন।
প্রথম অধ্যায়টি ছিল বিপ্লবের সূচনালগ্নে, যখন ইরানের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়। সেই সময় ইমাম খোমেনি (রহ.) যুদ্ধের বাস্তবতা ব্যাখ্যা করে ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন: “আজ যুদ্ধই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।”
এই ঘোষণার গভীরতা হয়তো সে সময়ের কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তি পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেননি। তবে যে ঐতিহাসিক বাস্তবতা এই ঘাটতি পূরণ করেছিল, তা হলো— ইমাম ও জনগণের মধ্যকার গভীর, দৃঢ় ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের সৃষ্টি।
‘ইমাম ও উম্মাহ’র সম্পর্ক: বিপ্লবের চালিকাশক্তি
বিপ্লব-পূর্ব সময়ে জনগণ প্রথমে ‘নায়েবে ইমাম খোমেনি’ স্লোগান ব্যবহার করলেও ধীরে ধীরে তারা আরও গভীর উপলব্ধিতে পৌঁছে যায়। তারা বুঝতে পারে, গায়েবতের যুগে তিনি কেবল ইমামের প্রতিনিধি নন; বরং নেতৃত্ব, দিকনির্দেশনা ও কর্তৃত্বের দিক থেকে ইমামতসুলভ অবস্থানেই অধিষ্ঠিত— যেমন মুসলিম ইবনে আকিল (রা.) কুফায় ইমামের প্রতিনিধি হিসেবে ছিলেন।
এই উপলব্ধিকে সামাজিকভাবে চর্চা ও প্রাতিষ্ঠানিক করতে ‘ইমাম খোমেনি’ শব্দবন্ধটি ধীরে ধীরে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। জনগণ এই শব্দ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে নেতৃত্বের সঙ্গে তাদের আধ্যাত্মিক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক সম্পর্ককে আত্মস্থ ও দৃঢ় করে।
কিন্তু ইমামের ইন্তেকালের পরপরই একধরনের বিকৃত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রবণতা দেখা দেয়। বলা হতে থাকে— “ইমাম খোমেনির উত্তরসূরিকে ‘ইমাম’ বলা যাবে না; বলতে হবে ‘মহামান্য’ বা ‘সম্মানিত’।”
দুঃখজনকভাবে এই প্রবণতা সমাজে প্রভাব বিস্তার করে। এর ফলে নেতৃত্ব ও জনগণের সম্পর্ক ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়; আত্মিক ও আন্দোলনমুখী চরিত্র অনেকাংশে ক্ষীণ হয়ে পড়ে। আজ আমরা দেখি, জনগণ নেতৃত্বকে সম্মান করে, কিন্তু অতীতের সেই শক্তিশালী ইমাম–উম্মাহ সম্পর্ক পূর্ণতা পায় না। এর ফলেই সেই ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ, ঐক্য ও যুগান্তকারী গণজাগরণের পুনরাবৃত্তি বর্তমান সময়ে আর দেখা যায় না।
আজকের যুদ্ধ: সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম ফ্রন্ট
অথচ গত প্রায় দুই দশক ধরে সমাজের ইমাম ধারাবাহিকভাবে ‘সাংস্কৃতিক ন্যাটো’, ‘নরম যুদ্ধ’, ‘সাংস্কৃতিক যুদ্ধ’ ও ‘গণমাধ্যম যুদ্ধ’-এর বিষয়ে সতর্ক করে আসছেন। তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তি— “আমি যদি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বে না থাকতাম, তবে ভার্চুয়াল স্পেসের দায়িত্ব নিতাম”— এই ফ্রন্টের গুরুত্ব কতটা গভীর, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

এছাড়া তাঁর নির্দেশ— “সংগঠন ছড়িয়ে পড়েছে; তোমাদের আতশে বেখতিয়ার হতে হবে”— এ কথাই বোঝায় যে বিদ্যমান গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক কাঠামো কার্যকর সমন্বয় ও নেতৃত্বহীনতায় ভুগছে।
এখানে পূর্ববর্তী প্রচেষ্টা অস্বীকার করার কোনো উদ্দেশ্য নেই। তবে বাস্তবতা হলো— প্রতিরোধযুদ্ধের সময় যে নিষ্ঠা, ঐক্য ও আত্মত্যাগের চেতনা দেখা গিয়েছিল, বর্তমান সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম যুদ্ধের ক্ষেত্রে তা এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।
যদি ‘ইমাম ও উম্মাহ’র সম্পর্ক যথাযথভাবে পুনর্গঠিত হতো এবং নেতৃত্বের দিকনির্দেশনাকে সত্যিকার অর্থে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া যেত, তবে আজ আমরা এই ফ্রন্টে বিস্ময়কর সাফল্যের সাক্ষী হতে পারতাম। অন্তত এমন জনচাপ সৃষ্টি হতো, যার ফলে জাতীয় তথ্য নেটওয়ার্কসহ গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয়গুলো বাস্তবায়নে কেউ উদাসীন থাকতে পারত না।
গণমাধ্যম যুদ্ধ অতিক্রমের পূর্বশর্ত
হাওজা ও গণমাধ্যমকর্মীদের দায়িত্ব
এই পরিস্থিতিতে প্রথম ও মৌলিক দায়িত্ব হলো— ‘ইমাম ও উম্মাহ’র সম্পর্ককে নতুন করে জীবিত করা। হাওজা, আলেমসমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীদের উচিত গায়বাতের যুগে প্রকৃত বেলায়েত চর্চাকে তাত্ত্বিক আলোচনা থেকে বের করে সামাজিক ও সাংগঠনিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়া।
যখন সমাজের ইমাম একজন জ্ঞানী, দূরদর্শী, তাকওয়াবান ও বিশ্বস্ত পথপ্রদর্শক হিসেবে জনগণের হৃদয়ে স্থান করে নেন, তখন আনুগত্য কেবল আবেগ নয়; তা হয়ে ওঠে সচেতন ও দায়িত্বশীল অনুসরণ। এই অবস্থায় তাঁর দিকনির্দেশনা সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করে এবং বিপ্লব ও ইসলামের লক্ষ্য অর্জনের পথ সুগম করে।
সভ্যতার চূড়ান্ত সংঘর্ষ
আজ আমরা একটি পূর্ণাঙ্গ সভ্যতাগত সংঘর্ষের মুখোমুখি। একদিকে রয়েছে বস্তুবাদী, ভোগবাদী ও আল্লাহবিমুখ পশ্চিমা সভ্যতা— যার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু বিশ্ব সায়োনিজম। অন্যদিকে রয়েছে তাওহিদভিত্তিক সভ্যতা, যার পতাকাবাহক ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান এবং যার নেতৃত্বে রয়েছে বেলায়েতে ফকিহ।
এই দুই সভ্যতা আজ ইতিহাসের এক নির্ণায়ক পর্যায়ে এসে সরাসরি মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এই সংঘর্ষ কেবল সামরিক নয়; এটি চিন্তা, সংস্কৃতি, জীবনদর্শন ও মানবিক মূল্যবোধের সংঘর্ষ।
জনগণকে যুদ্ধের বাস্তবতা বোঝানো: গণমাধ্যমের মূল মিশন
এই প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রথম দায়িত্ব হলো জনগণকে বোঝানো যে— আমরা বাস্তবেই যুদ্ধে আছি। যেমনটি প্রতিরোধযুদ্ধের সময় জনগণ উপলব্ধি করেছিল।
আজ এই উপলব্ধি সমাজে ব্যাপকভাবে অনুপস্থিত। অথচ বাস্তবতা হলো— আমরা বহু বছর ধরে এক নরম, সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম যুদ্ধে জড়িয়ে আছি; যেখানে অনেক সময় অজান্তেই আমরা শত্রুর কাঙ্ক্ষিত আচরণই পুনরুৎপাদন করি।

শত্রু ‘জম্বি’–এর মতো প্রতীক ও রূপক ব্যবহার করে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ভীতি ও ঘৃণার বয়ান নির্মাণ করছে। অথচ আমরা এখনও সেই মাত্রার শক্তিশালী, সৃজনশীল ও আক্রমণাত্মক পাল্টা বয়ান গড়ে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছি।
সংগঠন, আক্রমণ ও উদ্যোগই বিজয়ের পথ
আজ সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো— ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম কার্যক্রমকে একটি সুসংগঠিত কাঠামোর আওতায় আনা। একটি কার্যকর গণমাধ্যম–সংস্কৃতি–সভ্যতা যুদ্ধকক্ষ গঠন করা সময়ের দাবি।
শহীদ হাসান বাঘেরির ঐতিহাসিক বক্তব্য আজও সমান প্রাসঙ্গিক— “তথ্যসংগ্রহের রাতে যত বেশি শহীদ, মূল যুদ্ধে শহীদ তত কম।”
আজ গণমাধ্যমই আমাদের ‘তথ্যসংগ্রহের রাত’। এখানে অবহেলা করলে ভবিষ্যতে তার মূল্য বহুগুণে দিতে হবে।
শুধু প্রতিরক্ষা নয়— বর্তমান বাস্তবতায় প্রয়োজন সক্রিয়, আক্রমণাত্মক ও সংগঠিত কৌশল। কারণ কেবল প্রতিরক্ষার ওপর নির্ভর করলে একসময় পরাজয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। অতএব, ইমাম ও উম্মাহভিত্তিক একটি সুসংগঠিত, সচেতন ও আক্রমণাত্মক গণমাধ্যম কাঠামো গড়ে তুললেই আমরা এই সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত যুদ্ধে সফলভাবে এগিয়ে যেতে পারব।



