কেন ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর জন্মকে সর্বাধিক বরকতময় বলা হয়?
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫
কেন ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর জন্মকে সর্বাধিক বরকতময় বলা হয়?
মিডিয়া মিহির: ইমাম রেজা (আ.) ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর জন্মকে “সর্বাধিক বরকতময় জন্ম” বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর জন্ম শুধু একটি সন্তান গ্রহণের ঘটনা ছিল না—বরং এটি ইমামতের ধারাবাহিকতা নিয়ে তৈরি হওয়া ভয়াবহ সংকট ও ওয়াকিফিয়া ফেরকার সন্দেহচক্রকে ভেঙে সত্যকে সুস্পষ্ট করে দেয় এবং উম্মাহকে নতুন আস্থার আলো উপহার দেয়।
ইমাম রেজা (আ.)-এর ইমামত অস্বীকারকারী ‘ওয়াকিফিয়া’ নামক ফেরকা দাবি উঠিয়েছিল যে, তাঁর কোনো পুত্রসন্তান নেই; ফলে ইমামতের সোনালি শৃঙ্খল এখানেই থেমে যাবে। তাঁদের এই দাবি মুসলিম সমাজে গভীর সন্দেহের ঝড় তোলে। ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর জন্ম সেই ঝড় থামায়, সন্দেহের দ্বার বন্ধ করে দেয় এবং ইমামতের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করে। এ কারণেই ইমাম রেজা (আ.) তাঁকে ঘোষণা করেন—“সবচেয়ে বরকতময় সন্তান”।
এই বিষয়ে ধর্মীয় প্রশ্ন ও মতবিভ্রান্তি সংশ্লিষ্ট গবেষক হুজ্জাতুল ইসলাম মোহাম্মদ আব্বাসির সাথে আলোচনায় এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, বর্ণনাভিত্তিক ব্যাখ্যা এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে।
প্রশ্ন: ইমামদের মধ্যে কেন ইমাম জাওয়াদ (আ.)-কে সবচেয়ে কল্যাণময় ও বরকতময় নবজাতক বলা হয়?
হুজ্জাতুল ইসলাম মোহাম্মদ আব্বাসির উত্তর
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
ইমাম রেজা (আ.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে—তিনি তাঁর সন্তান ইমাম জাওয়াদ (আ.) সম্পর্কে বলেন: এর চেয়ে বরকতময় সন্তান আর জন্ম নেয়নি; বরং আমাদের শিয়া সম্প্রদায়ের জন্য তাঁর মতো বরকতময় সন্তান আর জন্মই হয়নি।
প্রশ্ন ওঠে—ইমাম কেন তাঁর সন্তানকে এমন মহিমাময় উপাধিতে ভূষিত করলেন?
এটি শুধু তাঁর আধ্যাত্মিক মর্যাদার প্রশংসা নয়; বরং এর পেছনে আছে এক গভীর ঐতিহাসিক সত্য।
প্রথম প্রেক্ষাপট
রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর সুপরিচিত হাদিসে ঘোষণা করা হয়েছিল—
ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বংশধরদের মধ্য থেকে নয়জন ইমাম আসবেন এবং দ্বাদশ ইমামত-এর ধারাবাহিকতা এভাবেই পূর্ণতা পাবে।
এ কথা মুসলিম সমাজে প্রচলিত ও সুবিদিত ছিল।
দ্বিতীয় প্রেক্ষাপট
ইমাম মুসা কাজিম (আ.)-এর ইন্তেকালের পর কিছু স্বার্থান্ধ লোক ওয়াকিফিয়া নামে বিভ্রান্ত দল গঠন করে ঘোষণা দিল:
ইমামত এখানেই শেষ, আর এগোবে না। তারা ইমাম রেজা (আ.)–এর ইমামত অস্বীকার করলো। এই অস্বীকারের বড় অজুহাত ছিল—তাঁর কোনো পুত্র নেই।
ইমাম রেজা (আ.)-এর বয়স তখন প্রায় ৪৭ বছর। ঠিক এই বিষয়টিই বিরোধীদের হাতে অস্ত্র হয়ে দাঁড়ায়। তারা বলতে লাগল:
যদি ইমামতের ধারা সত্য হয়, তবে পরবর্তী ইমাম কোথায়? যাঁর উত্তরাধিকারী নেই, তাঁর ইমামতও নেই। অনেকের মনে সংশয় জন্মাল— নাকি সত্যিই ওয়াকিফিয়াদের কথাই ঠিক?
সংকটময় সেই মুহূর্তে
ইমাম জাওয়াদ (আ.) জন্ম নিলেন। তার সঙ্গে সঙ্গে:
- সব অভিযোগ ধূলিসাৎ হয়ে গেল
- দ্বাদশ ইমামত–ধারার স্বপ্ন দৃশ্যমান হলো
- নবী (সা.)–এর ভবিষ্যদ্বাণী দৃঢ়ভাবে সত্য প্রমাণিত হলো
ইমামতের পথ থামেনি—বরং আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। এই কারণেই ইমাম রেজা (আ.) বলেছিলেন: এর চেয়ে বরকতময় সন্তান আর জন্ম নেয়নি।
তবুও বিদ্বেষ থামেনি
ওয়াকিফিয়া গোষ্ঠী আবার কুৎসা রটালো: এই সন্তান হয়তো ইমাম রেজা (আ.)–এর প্রকৃত সন্তানই নন! তখন কিয়াফা বিদদের—যাঁরা চেহারা ও অঙ্গভঙ্গি দেখে বংশ চিনত—ডাকা হলো। তারা সভায় উপস্থিত সবাইকে পর্যবেক্ষণ করে বলল:
- এই সন্তানের পিতা উপস্থিতদের কেউ নন
- বাইরে বাগানে কৃষিকাজরত মহান ব্যক্তিটিই তাঁর পিতা
অর্থাৎ—ইমাম রেজা (আ.)-ই তাঁর প্রকৃত পিতা।
তাই এই জন্ম বরকতময় কেন?
১. নবী (সা.)–এর হাদিস ও ইমামতের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করেছিল
২. ইমাম রেজা (আ.)-এর ইমামত নিয়ে সকল সন্দেহ ভেঙে দিয়েছিল
৩. শিয়াদের মানসিক সংকট ও ঐতিহাসিক বিভ্রান্তি দূর করেছিল
৪. ওয়াকিফিয়া বিভ্রান্ত গোষ্ঠীর ভিত্তি নড়বড়ে করে দেয়
সারসংক্ষেপে
ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর জন্ম শুধু একটি জন্ম ছিল না— এটি ছিল ইতিহাসের এক মোড় ঘোরানো অলৌকিক বরকত।
এই জন্মের মাধ্যমে:
১. ইমামত রক্ষা পেল
২. সত্যের পথ সুদৃঢ় হলো
৩. সন্দেহের দরজা বন্ধ হলো
৪. উম্মাহ নতুন আশার আলো পেল



