জীবনযাপনধর্ম ও বিশ্বাসবিশেষ সংবাদবিশ্ব

জনআস্থা অর্জনের নীতি: মানুষের হৃদয়ে শাসনের প্রতি সুদৃষ্টি জাগ্রত করার পথ

ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫

মিডিয়া মিহির: জনগণের আস্থা কোনো শাসনের সবচেয়ে বড় পুঁজি। ইমাম আলী (আ.) মালিক আসতারের উদ্দেশে লিখিত ঐতিহাসিক চিঠিতে শাসকদের জন্য এমন নীতি শিক্ষা দিয়েছেন, যা ক্ষমতার নয়—দায়িত্ব ও সেবার দর্শনকে সামনে আনে। মানুষের উপর বোঝা লাঘব করা, অনাবশ্যক চাপ না দেওয়া এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার—এসবই নাগরিকদের বিশ্বাস ও ভালোবাসা অর্জনের মূল চাবিকাঠি।

সারসংক্ষেপমূলক উত্তর

ইমাম আলী (আ.) মালিক আসতারকে লেখা বিখ্যাত পত্রে লিখেছেন:

জেনে রাখো—শাসক তার প্রজাদের প্রতি যে সুপ্রসন্ন ধারণা ও আস্থা লাভ করে, তার জন্য সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে মানুষের প্রতি সদ্ব্যবহার করা, তাদের বোঝা হালকা করা এবং যেসব কাজ তাদের দায়িত্ব নয় সে কাজে তাদেরকে জবরদস্তি না করা। তাই এই পথে তুমি এমনভাবে চেষ্টা করো, যাতে তুমি তোমার জনগণের বিশ্বস্ততা সম্পর্কে আশ্বস্ত হতে পারো। কারণ এই আশ্বাস তোমার বহু ক্লান্তি ও উদ্বেগ দূর করে দেবে। যে মানুষের সাথে তুমি বেশি কল্যাণ করেছ, তার প্রতিই তোমার সুদৃঢ় সুদৃষ্টি রাখার অধিকার বেশি; আর যার সঙ্গে তোমার আচরণ কঠোর হয়েছে, তার প্রতিই সন্দেহ জন্মানোর সম্ভাবনা অধিক।

বিস্তারিত উত্তর

ইমাম আলী (আ.) তাঁর পত্রে বলেন:

وَ اعْلَمْ أَنَّهُ لَيْسَ شَيْ‏ءٌ بِأَدْعَى إِلَى حُسْنِ ظَنِّ رَاعٍ بِرَعِيَّتِهِ مِنْ إِحْسَانِهِ إِلَيْهِمْ وَ تَخْفِيفِهِ الْمَئُونَاتِ عَلَيْهِمْ وَ تَرْكِ اسْتِكْرَاهِهِ إِيَّاهُمْ عَلَى مَا لَيْسَ لَهُ قِبَلَهُمْ، فَلْيَكُنْ مِنْكَ فِي ذَلِكَ أَمْرٌ يَجْتَمِعُ لَكَ بِهِ حُسْنُ الظَّنِّ بِرَعِيَّتِكَ، فَإِنَّ حُسْنَ الظَّنِّ يَقْطَعُ‏ عَنْكَ‏ نَصَباً طَوِيلًا، وَ إِنَّ أَحَقَّ مَنْ حَسُنَ ظَنُّكَ بِهِ لَمَنْ حَسُنَ بَلَاؤُكَ عِنْدَهُ، وَ إِنَّ أَحَقَّ مَنْ سَاءَ ظَنُّكَ بِهِ لَمَنْ سَاءَ بَلَاؤُكَ عِنْدَه

জেনে রেখো—শাসকের মনে তার প্রজাদের প্রতি সুসন্দেহ ও আস্থার সৃষ্টি করার জন্য এর চেয়ে অধিক কার্যকর কিছু নেই যে, সে তাদের প্রতি দয়া ও উপকার করবে, তাদের জীবনের ব্যয় ও কষ্ট কমাবে এবং এমন কাজের জন্য তাদেরকে বাধ্য করবে না যার দায়িত্ব তাদের ওপর নেই বা যা তারা বহন করতে অক্ষম।

সুতরাং তোমার নীতিনির্ধারণ এমন হোক যাতে জনগণের প্রতি তোমার সুদৃষ্টি ও আস্থা দৃঢ় হয়। কেননা মানুষের প্রতি এই সদ্ভাব তোমার জন্য দীর্ঘ ক্লান্তি ও মানসিক দুঃখ-ভোগ থেকে মুক্তির উপায় হয়ে উঠবে।

আর মনে রেখো—যার প্রতি তুমি সবচেয়ে বেশি কল্যাণ ও সেবা প্রদান করেছ, সে-ই তোমার সর্বাধিক সুসন্দেহের যোগ্য; আর যার কাছে তোমার আচরণ কঠোর ও কষ্টদায়ক হয়েছে, তার প্রতিই সন্দেহ জাগার অধিকার বেশি।

এ কথাটি বাস্তবতার পরীক্ষায় বহুবার সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে: যখন শাসক জনগণের কথা ভাবে, তাদের কষ্ট হালকা করে এবং এমন দায়িত্ব চাপিয়ে দেয় না যা তাদের ক্ষমতার বাইরে—তখন শাসক ও জনগণের মধ্যে গভীর আবেগময় বন্ধন সৃষ্টি হয়। এই বন্ধনই কঠিন সময়, বিপদ ও সংকটে শাসককে জনগণের অকৃত্রিম সমর্থন এনে দেয়।

এখানে আরও একটি সূক্ষ্ম বিষয় রয়েছে—ইমাম আলী (আ.) মূলত শাসকের জনগণের প্রতি সুদৃষ্টি অর্জনের কথা বলেছেন, জনগণের শাসকের প্রতি সুদৃষ্টি নয়। অর্থাৎ শাসক এতটাই সদাচরণ করুক, এতটাই ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু হোক যে, নিজেই জনগণের বিশ্বস্ততা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে যায়।

অন্যদিকে, যদি শাসকের মনে জনগণের প্রতি অবিশ্বাস জন্ম নেয়, তবে সে সর্বদা আশঙ্কায় ভুগবে—কোথাও বিদ্রোহ শুরু হবে কি না, কেউ তাকে ছলনা করছে কি না, কিংবা তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র রচিত হচ্ছে কি না। এই ভীতি তার চিন্তা ও স্নায়ুকে সর্বদা ক্লান্ত করে রাখবে। কিন্তু যখন সে জনগণের বিশ্বস্ততার বিষয়ে আশ্বস্ত হবে, তখন স্বস্তি ও স্থিরচিত্তে সে শৃঙ্খলা, উন্নয়ন এবং শত্রুর অনিষ্ট প্রতিরোধে মনোনিবেশ করতে পারবে।

রেফারেন্স

১)শরীফ রাযী, মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন (সংকলক)।নাহজুল বালাগা। সম্পাদনা: সুবহী সালেহ।কোম: নশর-এ হিজরাত, ১৪১৪ হিজরি ক্বামারী, প্রথম মুদ্রণ। পত্র: ৫৩, পৃষ্ঠা: ৪৩১।— ইমাম আলী (আ.) যখন মালিক আল-আশতার নাখাঈ (রহ.)-কে মিসরের শাসনভার অর্পণ করেন, তখন প্রেরিত পত্রের অন্তর্ভুক্ত অংশ।

২)নাসের মাকারেম শিরাজী।পায়াম-ই ইমাম আমীরুল মু’মিনীন (আ.)। তেহরান: দারুল কুতুবুল ইসলামিয়্যা, ১৩৮৬ হিজরি শামসী, প্রথম মুদ্রণ।  খণ্ড: ১০, পৃষ্ঠা: ৪৩৪–৪৩৬।

আরও পড়ুন 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button