“দুটি বিষয় আমাকে মুক্তি দিয়েছে—একটি হযরত জয়নাব কুবরা (সা.আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা এবং অন্যটি আমিরুল মু’মিনিন (আ.)-এর প্রতি সম্মান।”
রাসেল আহমেদ | প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫

“দুটি বিষয় আমাকে মুক্তি দিয়েছে—একটি হযরত জয়নাব কুবরা (সা.আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা এবং অন্যটি আমিরুল মু’মিনিন (আ.)-এর প্রতি সম্মান।”
মরহুম আয়াতুল্লাহ মুহাক্কিক দমাদ (রহ.) ছিলেন এক অনন্য, গভীর গবেষণাপ্রবণ ও নিরহংকারী ফকিহ। হাওজার শীর্ষস্থানীয় আলেমরাও তাঁর দার্সে বিনীত থাকতেন। তাঁর ইন্তেকালের পর এক আলেম স্বপ্নে তাঁকে দেখে জানতে পারেন—হযরত জয়নাব কুবরা (সা.আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা এবং আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.)-এর কুব্বা-বাইযার প্রতি সম্মানই তাঁর নাজাতের কারণ হয়েছে।
আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমুলি তাঁর এক নৈতিকতা বিষয়ক দার্সে মরহুম আয়াতুল্লাহ মুহাক্কিক দমাদ সম্পর্কে এভাবে স্মরণ করেন— মরহুম আয়াতুল্লাহ মুহাক্কিক দমাদ হাওজার বিরল ফকিহদের একজন ছিলেন। প্রকৃত অর্থেই তাঁর ছিল অসাধারণ বোধশক্তি ও গভীর উপলব্ধি। তাঁর দার্স বোঝা ছিল অত্যন্ত কঠিন। অনেকেই দার্সে উপস্থিত হতেন, কিন্তু বিষয়বস্তুর গভীরতা উপলব্ধি করতে না পেরে ফিরে যেতেন। তিনি ছিলেন শারীরিকভাবে সক্ষম, অন্য কোনো পেশা গ্রহণে অনাগ্রহী এবং অত্যন্ত দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একটি দার্স প্রস্তুতের জন্য তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অধ্যয়ন করতেন। এ কারণেই সে সময়ের বহু প্রসিদ্ধ ওস্তাদ ছিলেন তাঁরই ছাত্র।
হাওজায় মরহুম আয়াতুল্লাহ বুরুজের্দির পর—যাঁর একটি সামগ্রিক নেতৃত্ব ও মারজায়িয়্যাত ছিল—আয়াতুল্লাহ মুহাক্কিক দমাদের দার্সের মতো এতটা গবেষণামূলক ও আলেমসুলভ দার্স খুব কমই দেখা যেত। অবশ্য ইমাম খোমেনি (রহ.)-এর উসূলের দার্স ছিল স্বতন্ত্র মর্যাদার অধিকারী। তবে ফিকহের ক্ষেত্রে আয়াতুল্লাহ দমাদ ছিলেন সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রম। তদুপরি, তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ নিরহংকারী, আর তাঁর দার্সেও সেই বিনয় স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতো।
দুঃখজনকভাবে তিনি ইন্তেকাল করেন, যখনো তাঁর বয়স সত্তর বছর পূর্ণ হয়নি। অথচ হাওজার সকল শীর্ষস্থানীয় আলেম তাঁর সামনে বিনীত থাকতেন। যেসব আলেমদের নাম আমরা আজ শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ করি, তাঁরা সবাই সে সময়ের প্রথম সারির ব্যক্তিত্ব ছিলেন—এবং বর্তমানে আল্লাহর কৃপায়ও সেই অবস্থানেই রয়েছেন—তবুও সবাই তাঁর দার্সে গভীর শ্রদ্ধায় মাথা নত করতেন। তাঁর ইন্তেকাল আমাদের সকলকে শোকাহত করেছিল।
তাঁর ইন্তেকালের রাতে হাওজার একজন সুপ্রতিষ্ঠিত ওস্তাদ—যিনি তাঁর ছাত্রও ছিলেন (আল্লাহ তাঁকে হেফাজত করুন)—স্বপ্নে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্কও ছিল। তিনি জিজ্ঞেস করেন, “আপনার ওপর কী ঘটল?”
(এখানে আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমুলি উল্লেখ করেন— আহলে বাইতের প্রতি সম্মান, হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.আ.) ও অন্যান্য পবিত্র সত্তার প্রতি শ্রদ্ধা কেবল পার্থিব শিষ্টাচার বা সামাজিক ভদ্রতা নয়; বরং তা পরকালের সেই ভয়াবহ ও মহান সমাবেশেও কার্যকর ভূমিকা রাখে।)
তিনি বলেন, আমি দেখলাম তাঁর অবস্থা অত্যন্ত ভালো। যেদিন তিনি ইন্তেকাল করেন, আমরা তাঁর জানাজায় অংশ নিয়েছিলাম। ঠিক সেই রাতেই তাঁকে স্বপ্নে দেখলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনার সঙ্গে কী ঘটেছে?”
কারণ মানুষের জন্য প্রথমবার অন্য জগতে প্রবেশ করাটা সাধারণত অত্যন্ত কঠিন হয়।
তিনি উত্তরে বললেন, “দুটি বিষয় আমাকে মুক্তি দিয়েছে—একটি হযরত জয়নাব কুবরা (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, আর অন্যটি কুব্বা-বাইযার প্রতি সম্মান।” এই হলেন আয়াতুল্লাহ দমাদ।
ওই আলেম বলেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি ভাবলাম—হযরত জয়নাব কুবরা (সা.আ.)-এর প্রতি ভালোবাসার বিষয়টি তো স্পষ্ট, কিন্তু ‘কুব্বা-বাইযা’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, তা বুঝতে পারিনি। এরপর আমি অনুসন্ধান করি। জানতে পারি, আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.)-এর রওযার গম্বুজ একসময় স্বর্ণমণ্ডিত ছিল না; বরং তা ছিল সাদা রঙের। আরবি কবিরা যখন হযরত আলী (আ.)-এর প্রশংসায় কবিতা রচনা করতেন, তখন তাঁকে এভাবে সম্বোধন করতেন— “ইয়া সাহিবাল কুব্বাতিল বাইযা ফিন নাজাফি” অর্থ: হে নাজাফের সাদা গম্বুজের অধিপতি!
অতএব, ‘কুব্বা-বাইযা’ বলতে বোঝানো হয়েছে—স্বর্ণমণ্ডিত হওয়ার পূর্ববর্তী সেই উজ্জ্বল সাদা গম্বুজ, যা আমিরুল মু’মিনিন (আ.)-এর পবিত্র মাযারের ওপর অবস্থিত ছিল।
তিনি বলেছিলেন, “এই দুটি বিষয়ই আমাকে মুক্তি দিয়েছে।” এটি কোনো রূপক বক্তব্য নয়, কোনো সৌজন্যমূলক কথাও নয়—বরং একেবারেই বাস্তব ও সত্য ঘটনা।
সূত্র: দার্সে খারেজে উলুমুল কুরআন ,তারিখ: ০৩/০৮/১৪০২ হিজরি শামসি



