ইতিহাসজীবনযাপনধর্ম ও বিশ্বাসবিশেষ সংবাদবিশ্বহাদিস

জুহুরের আগমনের নিশ্চিত আলামতসমূহ

ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৫

মিডিয়া মিহির: ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর আবির্ভাবের পূর্বে পাঁচটি নিশ্চিত লক্ষণ রয়েছে, যা মাসুম ইমামদের হাদিসে উল্লেখিত। এগুলো হলো: আকাশ থেকে ধ্বনি, সুফিয়ানির আবির্ভাব, ইয়ামানির কিয়াম, নফসে জাকিয়ার শাহাদাত এবং বেদায়ে সুফিয়ানির সেনাবাহিনীর ধ্বংস—হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।এই লক্ষণগুলো কোনো শর্তের সাথে যুক্ত নয় এবং ইমামের আবির্ভাবের ঠিক পূর্বে ঘটবে। নিবন্ধে এই লক্ষণগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, সাথে আরমাগেডনের ধারণা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যা ইহুদি-খ্রিস্টান ঐতিহ্যে শেষ যুদ্ধের স্থান হিসেবে পরিচিত।

প্রাচীন রিওয়ায়াতের পাতায় সোনালি অক্ষরে লিপিবদ্ধ আছে যে, ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর পবিত্র আবির্ভাবের পূর্বে পাঁচটি অটল, নিশ্চিত আলামত প্রকাশিত হবে। এই আলামতসমূহ এমন অলৌকিক ঘটনা, যা কোনো শর্ত বা বাধ্যবাধকতার উপর নির্ভরশীল নয়; বরং তা আবির্ভাবের ঠিক পূর্বমুহূর্তে অবশ্যই সংঘটিত হয়ে বিশ্বকে জাগ্রত করবে, যেন অন্ধকারের পর্দা ছিন্ন করে আলোর প্রভাত আসার ঘোষণা।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.), যাঁর বাণী আলোকিত তারকার ন্যায়, বলিয়াছেন: “কায়েম (আ.ফা.)-এর আবির্ভাবের পূর্বে পাঁচটি অবশ্যম্ভাবী নিদর্শন প্রকাশ পাইবে: ইয়ামানির উত্থান, সুফিয়ানির বিদ্রোহ, আকাশ হইতে নেমে আসা অলৌকিক ধ্বনি, নফসে যাকিয়ার শাহাদত এবং বায়দা উপত্যকায় ধ্বংসের ঘটনা।

অন্য একটি পবিত্র রিওয়ায়াতে তিনি যেন হৃদয়ের গভীরতা থেকে উচ্চারণ করিয়াছেন: আকাশের ধবনি অটল সত্য, সুফিয়ানির উত্থান অটল সত্য, ইয়ামানির বিদ্রোহ অটল সত্য, নফসে যাকিয়ার হত্যা অটল সত্য, এবং আকাশের দিগন্তে উদ্ভাসিত সেই পবিত্র হাতও অটল সত্য।

এবং তিনি আরও যোগ করিয়াছেন, যেন রাতের নীরবতায় একটি ঝড়ের সতর্কবাণী: রমজানের পবিত্র মাসে এমন এক ভয়াবহ, হৃদয়কম্পক ঘটনা সংঘটিত হইবে, যাহা নিদ্রিতকে জাগ্রত করিয়া তুলিবে, জাগ্রতকে আতঙ্কের ছায়ায় আচ্ছন্ন করিবে, এবং পর্দানশীন কুমারীদিগকেও তাদের পর্দার আড়াল হইতে বাহিরে আনিয়া ফেলিবে—যেন সমগ্র সৃষ্টি একসাথে কাঁপিয়া উঠিবে আসন্ন মহান পরিবর্তনের আভাসে।

এই নিদর্শনসমূহ যেন আকাশের তারকারাজির মতো, যাহা অন্ধকারের মধ্যে পথ দেখায় এবং বিশ্বাসীদের হৃদয়ে আশার আলো জ্বালায়। এগুলি শুধু ঘটনা নয়, বরং ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতির প্রতীক, যাহা সময়ের স্রোতে অপরিবর্তিত রহিয়াছে, অপেক্ষা করিতেছে সেই মহান মুহূর্তের, যখন ন্যায়ের সূর্য উদিত হইবে।

১. আকাশ থেকে ধ্বনি

পুরনো হাদিসে লুকানো আছে সেই বড় রহস্য, যা ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর আবির্ভাবের নিশ্চিত লক্ষণগুলোর একটা। এটা হলো আকাশ থেকে আসা সেই অলৌকিক শব্দ—একটা শক্তিশালী, সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়া আহ্বান, যেন পুরো দুনিয়ার প্রত্যেকটা গলায় প্রতিধ্বনিত হয়। পৃথিবীর সব মানুষ, যারা বিভিন্ন ভাষায় কথা বলে, তারা এই শব্দটা নিজের ভাষায় শুনে অবাক হয়ে যাবে, যেন আকাশের অসীমতা থেকে একটা পবিত্র বার্তা সোজা হৃদয়ে ঢুকে গেছে।

এই শব্দটা, যেন একটা ঐশ্বরিক ঘোষণা, মানুষকে অত্যাচারের অন্ধকার থেকে, কুফরের বিষাক্ত ছায়া থেকে, যুদ্ধের রক্তাক্ত পথ থেকে আর রক্তপাতের নিষ্ঠুর চক্র থেকে দূরে থাকতে বলবে। এটা হবে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর অনুসরণের পবিত্র ডাক, যাতে তার পবিত্র নাম আর তার মহান বাবার নাম স্পষ্ট করে বলা হবে—যেন পুরো সৃষ্টি একসাথে সাক্ষ্য দেবে সেই মহান ব্যক্তিত্বের।

এই অলৌকিক ঘটনার পর, দুনিয়ার প্রত্যেক কোণে, প্রত্যেক হৃদয়ে একটা অসীম অস্থিরতা জাগবে। মানুষরা, যেন ঝড়ের পর শান্ত সমুদ্রের মতো অস্থির, একটা মাত্র প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে: এই মহান ব্যক্তিত্ব, এই মাহদী কে? তিনি কোথায় লুকিয়ে আছেন, যার আসা দুনিয়াকে ন্যায়ের আলোয় ভরিয়ে দেবে?

এই নেো (শব্দ-ধ্বনি) যেন আকাশের তারার মধ্যে একটা উজ্জ্বল তারা, যা অন্ধকারের পর্দা ছিঁড়ে আশার সকালের শুরু করবে। এটা শুধু একটা শব্দ নয়, বরং ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতির প্রতীক, যা বিশ্বাসীদের হৃদয়ে অপেক্ষার আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে, অপেক্ষা করছে সেই মহান মুহূর্তের, যখন ন্যায়ের সূর্য পুরো দুনিয়াকে আলোকিত করবে।

২. সুফিয়ানির উত্থান (খুরুজ সুফিয়ানি)

পুরনো হাদিসের পবিত্র পাতায়, যেন অন্ধকারের সবচেয়ে গভীর গর্ত থেকে উঠে আসা একটা ভয়ংকর ছায়া, সুফিয়ানির আবির্ভাবকে খুব স্পষ্ট আর অটল নিশ্চিত লক্ষণ হিসেবে বলা হয়েছে। এই অশুভ লোকটা, যেন পাপের কালো মেঘের মতো, উমাইয়া বংশের অভিশপ্ত শাখা থেকে এসেছে—ইয়াজিদের দূষিত বংশধর, যার চরিত্রে পাপের বিষাক্ত স্রোত বয়ে চলেছে, অত্যাচারের আগুন জ্বলছে আর নিষ্ঠুরতার ছুরি ধারালো। তার নাম ‘উসমান ইবন আনবাসা’, যেন একটা অভিশাপের মন্ত্র, যা শত্রুতার অন্ধকারে লুকিয়ে আছে।

তিনি সিরিয়ার ধুলোমাখা জমি থেকে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে উঠবেন, যেন একটা ঝড়ের মতো দ্রুত দামেস্কের দেয়াল ভেদ করে, ফিলিস্তিনের পবিত্র জমি দখল করে, জর্ডানের নদীর তীর পার হয়ে, হমসের দুর্গ আর কিনসরিনের দরজা খুলে ফেলবেন। এই অভিযান যেন অন্ধকারের তলোয়ার, যা পাঁচটা এলাকাকে রক্তাক্ত করে ফেলবে।

তারপর, বিশাল সেনাবাহিনীর সাথে—যেন অগণিত পাপের ছায়াসেনা—তিনি ইরাকের দিকে ধেয়ে যাবেন, কুফার পবিত্র মাটিতে আর নজফের আলোকিত জমিতে ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড চালাবেন। রক্তের নদী বইবে, অশ্রুর বন্যা আসবে, আর নিরপরাধদের চিৎকার আকাশে প্রতিধ্বনিত হবে—যেন পুরো দুনিয়ার অত্যাচারের একটা জীবন্ত ছবি।

কিন্তু এই অন্ধকারের যাত্রা থামবে না; তিনি মদিনার পবিত্র দরজা আক্রমণ করে, মক্কার দিকে এগিয়ে যাবেন, যেন পাপের ছায়া পবিত্রতার উপর ছড়িয়ে পড়তে চায়। তবু, ঐশ্বরিক ভাগ্যের অটল লেখায়, তার শেষ গন্তব্য হবে বাইতুল মুকাদ্দাসের পবিত্র জমি, যেখানে ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর ন্যায়ের সেনাবাহিনী তাকে পরাজিত করবে। তার অশুভ মাথা কেটে ফেলা হবে, যেন অন্ধকারের মেঘ ছিঁড়ে ন্যায়ের সূর্য উদয় হবে।

এই সুফিয়ানির উত্থান যেন একটা অন্ধকারময় অধ্যায়, যা শুধু আলোর আসার আগের ইঙ্গিত—যেন ঝড়ের পর শান্তির সকাল, অত্যাচারের পর ন্যায়ের জয়। এটা বিশ্বাসীদের হৃদয়ে সতর্কতার আলো জ্বালায়, অপেক্ষা করতে শেখায় সেই মহান মুহূর্তের, যখন পাপের ছায়া চিরকালের মতো অদৃশ্য হয়ে যাবে।

৩. বেদায় ধ্বংস (খসফ বিদা)

হাদিসে বলা হয়েছে, সুফিয়ানির সেনাবাহিনী মদিনা থেকে মক্কায় যাওয়ার পথে বেদা মরুভূমিতে আল্লাহর হুকুমে ভূমিধসে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। ইমাম সাদিক (আ.) বলেন, এটি একটি অপরিবর্তনীয় নিশ্চিত ঘটনা—কোনো পরিবর্তন বা দেরি হবে না।

৪. নফসে যাকিয়ার শাহাদাত

ইমাম সাদিক (আ.) বলেন, আবির্ভাবের আরেক লক্ষণ হলো নফসে যাকিয়ার হত্যা—আহলে বাইতের এক পবিত্র যুবক, যিনি রুকন ও মাকামের মাঝখানে শহীদ হবেন। হাদিসে এসেছে, এই হত্যার মাত্র ১৫ দিন পরেই ইমাম মাহদী (আ.ফা.) আবির্ভূত হবেন।

৫. ইয়ামানির কিয়াম

ইয়ামানির উত্থান রজব মাসে সুফিয়ানির বিদ্রোহের সাথে সাথে ঘটবে, স্থান সানা। হাদিসে তার পতাকাকে সবচেয়ে পথপ্রদর্শক বলা হয়েছে, কারণ এটি সরাসরি ইমাম মাহদী (আজ.)-এর দিকে আহ্বান করে। ইমাম রেজা (আ.) বলেন: “সুফিয়ানি, ইয়ামানি ও খোরাসানির উত্থান একই বছর, মাস এবং দিনে হবে—যেন মালার দানা একের পর এক।” কিছু হাদিসে এটি সুফিয়ানির আগে, অন্যগুলোতে ইমামের সাথে যুক্ত।

সাইয়্যেদ হাসানির আবির্ভাব

হাদিসে সাইয়্যেদ হাসানির উত্থানকেও আবির্ভাবের লক্ষণ বলা হয়েছে। ইমাম মাহদী (আজ.)-এর সাথে সাক্ষাতে তিনি ইমামতের প্রমাণ, মুজিযা ও নবীদের উত্তরাধিকার দেখতে চান। ইমাম (আজ.) তা দেখালে তিনি ও তার অনুসারীরা বায়াত করেন, যদিও কয়েকজন প্রত্যাখ্যান করে।

মিথ্যা মাহদিয়তের অস্বীকৃতি

হাদিস স্পষ্ট করে যে মিথ্যা মাহদিয়তের দাবি কখনো সফল হয় না। যদি সম্ভব হতো, তাহলে ইতিহাসে তার চিহ্ন থাকত। সত্যিকারের ন্যায়, শান্তি ও মানবতা শুধু ইমাম মাহদী (আজ.)-এর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হবে।

আরমাগেডন

“আরমাগেডন” একটা হিব্রু শব্দ, যার মানে পবিত্র পাহাড় বা সম্মানিতদের টিলা। এটা ফিলিস্তিনের উত্তরে হাইফার দক্ষিণ-পূর্বে একটা টিলা, যা জর্ডান নদীর পশ্চিম তীরের অংশ।

বলা হয় যে অতীতে এটা উত্তর-দক্ষিণ আর পূর্ব-পশ্চিমের গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার সংযোগে একটা কৌশলগত জায়গা ছিল। লক্ষ করার মতো যে এই এলাকা আয়তনে খুব ছোট আর সীমিত। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা, আজকের দিনে এই জায়গাটাকেই চরমপন্থী এন্ড-টাইমস বিশ্বাসীরা শেষ যুদ্ধের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে।

আরমাগেডন এলাকা জর্ডান নদীর পশ্চিমে, গালিল আর সামারিয়ার মাঝে ইজরেল উপত্যকায়। এমনকি নেপোলিয়ন বোনাপার্টও একবার বলেছিলেন যে এখানেই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হবে।

পাদটীকা

১.শাইখ সাদুক (মুহাম্মদ ইবনে আলী), কামালুদ্দিন ও তামামুন্‌ নি‘মাহ, পৃষ্ঠা ৬৫০; কোম: ইসলামিক পাবলিকেশনস অফিস, হাওজা ইলমিয়া কোমের শিক্ষক পরিষদের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত।

২.নু‘মানি, মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহিম ইবনে আবি জয়নাব, গাইবাতুন্‌ নু‘মানি, পৃষ্ঠা ৩৬৫, অধ্যায় ১৪।

৩.কুরানি,আলী,আসর-ই জুহুর(জুহুরের যুগ)।

৪.তাহেরি,হাবিবুল্লাহ,সিমায়ে আফতাব, কোম:আস্তানে মুকাদ্দাসা প্রকাশনী।

৫.একই গ্রন্থ।

৬.মজলিসি,মুহাম্মদ বাকির,বিহারুল আনওয়ার,খণ্ড ৫২,পৃষ্ঠা ২৩২।

৭. বিশারাতুল ইসলাম,পৃষ্ঠা ৯৩।

৮. বিহারুল আনওয়ার,খণ্ড ৫২,পৃষ্ঠা ২৩২।

৯. তাহেরি, হাবিবুল্লাহ, সিমায়ে আফতাব(পূর্বোল্লিখিত),পৃষ্ঠা ২৭৮।

আরও পড়ুন 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button