কিয়ামত: লেনদেনের দিন নয়, বরং ক্ষতির উন্মোচনের দিন
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির: মানুষের জীবন যেন এক নিরবচ্ছিন্ন লেনদেন—সময় যাচ্ছে, শক্তি ক্ষয় হচ্ছে, আর আয়ু নিঃশেষ হয়ে আসছে। কিন্তু এই দুনিয়াবি ব্যস্ততার আড়ালে মানুষ প্রায়ই ভুলে যায়, সে কী হারাচ্ছে এবং কী অর্জন করছে। নাহজুল বালাগার আলোকে জীবন ও পরিণতির এই গভীর সত্যই তুলে ধরেছেন প্রখ্যাত চিন্তাবিদ ও মুফাসসির হযরত আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলী। তাঁর বক্তব্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—কিয়ামত কোনো নতুন হিসাব শুরু হওয়ার দিন নয়; বরং দুনিয়ায় করা ভুল হিসাবের পর্দা সরে যাওয়ার দিন।
দুনিয়া: মৃত্যুর নিশানায় থাকা এক লক্ষ্যবস্তু
আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) দুনিয়ার বাস্তবতাকে এক সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর বাণীতে তুলে ধরেছেন—
«إِنَّمَا الْمَرْءُ فِی الدُّنْیَا غَرَضٌ تَنْتَضِلُ فِیهِ الْمَنَایَا…»
মানুষ এই দুনিয়ায় কেবল এক লক্ষ্যবস্তু, যার দিকে মৃত্যুর তীর নিক্ষিপ্ত হয়।
আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলী ব্যাখ্যা করেন, মানুষ দুনিয়ায় সর্বদা মৃত্যু ও নানা ঘটনার নিশানায় রয়েছে। কিন্তু কর্মব্যস্ততা, ভোগ-বিলাস ও দৈনন্দিন জীবনের মোহ তাকে এই নির্মম সত্য থেকে উদাসীন করে রাখে। বাস্তবতা হলো—মৃত্যু ধীরে ধীরে, নীরবে, অথচ অবিরাম এগিয়ে আসছে।
সময়ের মূল্য: জীবনই মূলধন
মানুষ সময় ব্যবহার করে, ভূমিতে বসবাস করে, প্রকৃতির নিয়ামত ভোগ করে—কিন্তু এর মূল্য কী? আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলীর ভাষায়, এই সবকিছুর বিনিময়ে মানুষ দেয় তার সবচেয়ে দামী সম্পদ—আয়ু।
দিন ও রাতের আবর্তনে মানুষ নিজের জীবন ব্যয় করে, অথচ বিনিময়ে পায় অস্থায়ী সুখ ও ক্ষণস্থায়ী স্বস্তি। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—মানুষ যখন একটি দিন লাভ করে বলে মনে করে, প্রকৃতপক্ষে সে আরেকটি দিন হারিয়ে ফেলে। অতএব, বয়স বাড়া কোনো লাভ বা মুনাফা নয়; বরং তা মূলধনের ক্রমাগত ক্ষয়।
দুনিয়ার সুখ ও দুঃখের বাস্তবতা
এই দুনিয়ায় এমন কোনো আনন্দ নেই, যা যন্ত্রণাহীন। প্রতিটি সুখের সঙ্গে কোনো না কোনো কষ্ট জড়িয়ে থাকে। দুঃখ ও বেদনা মানুষের জীবনে এমনভাবে প্রবেশ করে যে, অনেক সময় তা মন ও আত্মা থেকে সহজে দূর করা যায় না।
রোগব্যাধি, মানসিক চাপ, দুঃখ-কষ্ট এবং শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির ধীরে ধীরে অবক্ষয়—সবই মৃত্যুর নীরব সহায়ক। মানুষ ক্রমে স্মৃতি, প্রাণচাঞ্চল্য ও সক্ষমতা হারায়। এ যেন মৃত্যুর একটানা, নিঃশব্দ তীর নিক্ষেপ।
কিয়ামত: ক্ষতির দিন
কুরআন মাজিদ কিয়ামতের দিনকে স্পষ্ট ভাষায় পরিচয় করিয়ে দেয়—
يَوْمَ يَجْمَعُكُمْ لِيَوْمِ الْجَمْعِ ۚ ذَٰلِكَ يَوْمُ التَّغَابُنِ
যেদিন তিনি তোমাদের সবাইকে একত্র করবেন—সেই দিনই হবে প্রকৃত ক্ষতির দিন।”
এই আয়াতের ব্যাখ্যায় আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমোলী বলেন, কিয়ামত কোনো লেনদেনের দিন নয়। সেখানে নতুন করে কিছু কেনাবেচা বা হিসাব শুরু হবে না। বরং দুনিয়ায় মানুষ যে ক্ষতির শিকার হয়েছে—তা সেদিন প্রকাশ পাবে। দুনিয়ার প্রতারণামূলক লাভ-লোকসানের মুখোশ খুলে যাবে, আর প্রকৃত মুনাফা ও প্রকৃত ক্ষতি স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
সম্পদের মোহ ও প্রকৃত প্রয়োজন
আমিরুল মুমিনিন (আ.)-এর বাণীর আলোকে আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলী সতর্ক করেন—মানুষের উচিত নয় প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ সঞ্চয় করা। কারণ প্রয়োজনের বাইরে যে সম্পদ জমা হয়, তা মানুষকে মালিক বানায় না; বরং অন্যদের সম্পদের পাহারাদারে পরিণত করে। এ সম্পদ শেষ পর্যন্ত মানুষকে পরকালে কোনো উপকারে আসবে না।
হৃদয়ের উত্থান-পতন ও জ্ঞানার্জন
তিনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাণী স্মরণ করিয়ে দেন—
«إِنَّ لِلْقُلُوبِ إِقْبَالًا وَإِدْبَارًا» নিশ্চয়ই হৃদয়ের উত্থান ও পতন রয়েছে।
মানুষের হৃদয় সব সময় এক অবস্থায় থাকে না। যখন অন্তর সজাগ, আগ্রহী ও প্রশান্ত থাকে—তখনই জ্ঞান ও মারিফত অর্জনের সর্বোত্তম সময়। এই অবস্থায় অর্জিত জ্ঞান হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত হয় এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রাখে।
উপসংহার
এই দুনিয়া কোনো স্থায়ী আবাস নয়; এটি পরীক্ষার ক্ষেত্র। এখানে প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি দিন আমাদের মূলধনের অংশ। কিয়ামত সেই দিন, যখন এই জীবনের সব ভুল হিসাব প্রকাশ পাবে। তাই বুদ্ধিমানের কাজ হলো—মোহ ও প্রতারণার এই দুনিয়ায় সচেতনভাবে জীবন যাপন করা, প্রয়োজনের সীমা জানা, এবং হৃদয়ের জাগ্রত মুহূর্তগুলোকে জ্ঞান ও সত্যের পথে কাজে লাগানো।



