আল-সুদানি থেকে মুকতাদা সদর: ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিরুদ্ধে ইরাকিদের কঠোর অবস্থান
রাসেল আহমেদ | প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫

আল-সুদানি থেকে মুকতাদা সদর: ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিরুদ্ধে ইরাকিদের কঠোর অবস্থান
মিডিয়া মিহির: ইরাক ও বিশ্বের কালডিয়ান ক্যাথলিক চার্চের প্যাট্রিয়ার্ক লুইস রাফায়েল সাকোর একটি বক্তব্য, যা কিছু মহলে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের আহ্বান হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, দেশটিতে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই বক্তব্যের পর ইরাকের শীর্ষ নেতা, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এবং স্পষ্ট করেছেন যে, ইরাকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ আইনের পরিপন্থী এবং কঠোর শাস্তির আওতাধীন।
বড়দিন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্যাট্রিয়ার্ক সাকোর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ইরাকের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বরা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ইরাকি আইনে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে ধরা হয়, যার শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
বাগদাদের মার ইউসুফ কালডিয়ান ক্যাথলিক চার্চে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি উপস্থিত ছিলেন। প্যাট্রিয়ার্ক সাকো তার ধর্মোপদেশের একাংশে ধর্মীয় পর্যটন এবং ইরাকের ঐতিহাসিক গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, “স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে কথা হচ্ছে। আমি আশা করি এটি ইরাকের সঙ্গে হবে—নবীদের ভূমিতে। বিশ্বকে ইরাকে আসা উচিত, অন্য কোথাও নয়।”
প্যাট্রিয়ার্কেটের ব্যাখ্যা
কালডিয়ান প্যাট্রিয়ার্কেট এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বিষয়টি পরিষ্কার করে জানায়, সাকো কোনো দেশের সঙ্গে নয়, বরং “ইরাকের সঙ্গে স্বাভাবিকীকরণ” প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন। এতে বলা হয়েছে,
“ইরাক বহু নবী ও ধর্মের জন্মভূমি। দেশটিকে সভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরে দেশগুলোকে ইরাকের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে উৎসাহিত করা উচিত।”
প্যাট্রিয়ার্কেট আরও জানায়, একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে সাকো ব্যাখ্যা করেছিলেন যে, ইরাককে সভ্যতার কেন্দ্র ও হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর জন্মভূমি হিসেবে তুলে ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো গেলে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পর্যটনের উন্নয়ন সম্ভব।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া
প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি অনুষ্ঠানে প্যাট্রিয়ার্ক সাকোর বক্তব্যের পরপরই বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেন। তিনি বলেন, “‘স্বাভাবিকীকরণ’ বা ‘সমঝোতা’ শব্দটি ইরাকের অভিধানে নেই। এটি এমন এক দখলদার শাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা ভূমি ও মানবতার পবিত্রতা লঙ্ঘন করেছে।”
মুকতাদা সদরের কড়া হুঁশিয়ারি
সাদর আন্দোলনের নেতা মুকতাদা সদরও কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, “ইরাকি আইনে স্বাভাবিকীকরণ একটি অপরাধ। যে-ই এটি প্রচার করবে, তার অবস্থান যা-ই হোক, আইনের আওতায় থাকবে। ইরাকে স্বাভাবিকীকরণের কোনো স্থান নেই।”
অন্যান্য রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতাদের প্রতিক্রিয়া
বাবিলিওন আন্দোলনের মহাসচিব এবং হাশদ আশ-শাবির সদস্য রিয়ান আল-কালদানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, “আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে লুইস সাকোর নামে প্রচারিত বক্তব্যগুলো পর্যবেক্ষণ করেছি, যেগুলোকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের প্রচার হিসেবে দেখানো হয়েছে। এসব বক্তব্য ইরাকি আইনের পরিপন্থী।”
সাবেক সংসদ সদস্য হাসান সালেম বলেন, “লুইস সাকো বা যে কেউ স্বাভাবিকীকরণের ডাক দেয় বা এতে সম্মতি জানায়, তাকে অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এটি জাতীয় নীতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা।”
এ ছাড়াও আরও অনেক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতারাও স্পষ্টভাবে ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা বা সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
উল্লেখ্য, ইরাকি পার্লামেন্ট ২০২২ সালে পাস করা আইনে ইসরায়েলের সঙ্গে যেকোনো কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে এবং এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রেখেছে।



