ইয়া মান আরজুহু’ দোয়ায় আশা, করুণা ও ক্ষমার গভীর শিক্ষা
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির: রজব মাসের এই বিখ্যাত দোয়া মানুষকে শেখায়—আশার কেন্দ্র একমাত্র আল্লাহ, যিনি প্রার্থনাকারী তো বটেই, এমনকি ভুলে থাকা ও না-চেনা মানুষকেও সীমাহীন দয়া ও অনুগ্রহে ভরিয়ে দেন।
আল্লাহ শুধু প্রার্থনাকারীদেরই নয়, বরং যারা তাঁর থেকে গাফিল বা এখনো তাঁকে চিনে ওঠেনি—এমন মানুষদের প্রতিও নিজের স্বভাবগত স্নেহ ও করুণায় দান করেন জাগতিক ও আধ্যাত্মিক নানাবিধ নিয়ামত।
রজব মাসের প্রসিদ্ধ এই দোয়াটি ইমাম জাফর সাদিক(আ.)-এর থেকে বর্ণিত। মাসের প্রতিটি দিনে, সকাল-সন্ধ্যায় এবং দৈনিক ফরজ নামাজের পর এটি পড়ার ব্যাপারে বিশেষ তাগিদ এসেছে। এই দোয়া কেবল শব্দসমষ্টি নয়; রজবের তাওহীদি ও নৈতিক শিক্ষার সার্থক সঙ্কলন। এর বাণীতে আল্লাহর সান্নিধ্যপ্রত্যাশী মানুষের মৌলিক প্রয়োজনগুলোর প্রতিফলন দেখা যায়।
দোয়ার শুরুতেই আমরা পড়ি: «یَا مَنْ أَرْجُوهُ لِکُلِّ خَیْرٍ وَ آمَنُ سَخَطَهُ عِنْدَ کُلِّ شَرٍّ»
অর্থাৎ—হে সেই আল্লাহ, যাঁর কাছে আমি প্রত্যেক শুভের আশা রাখি এবং প্রতিটি অমঙ্গলের মুহূর্তে যাঁর ক্রোধ থেকে নিরাপত্তা প্রার্থনা করি।
এখানে আল্লাহকে জীবনের সর্বত্র একমাত্র আশ্রয় ও ভরসা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে—প্রতি কল্যাণের প্রত্যাশায় এবং প্রতিটি অশুভ থেকে পলায়ে মানুষের শেষ আশ্রয় তিনি-ই। এ বাক্য বিশ্বাসের ঘোষণা—দেয়া ও বারণ, সব ক্ষমতা কেবল তাঁরই হাতে।
এরপর দয়ালুতার অসীমতা উল্লেখ হয়: «یَا مَنْ یُعْطِی الْکَثِیرَ بِالْقَلِیلِ یَا مَنْ یُعْطِی مَنْ سَأَلَهُ»
অর্থ—হে সেই সত্তা, যিনি সামান্য কর্মের বিনিময়ে অফুরন্ত দান করেন; যিনি যা চাওয়া হয় তাই দিতে ভালোবাসেন।
এতে বোঝা যায়—বান্দার ক্ষুদ্র আমলও তাঁর কাছে অগাধ পুরস্কারে রূপ নেয়। তাঁর দানে কোনো শর্ত নেই; শুধু ডাকলেই তিনি সাড়া দেন। এতে মানুষ দোয়ায় উদ্দীপ্ত হয়, কারণ নিজের ক্ষুদ্র আবেদনকে সে দেখতে পায় তাঁর অসীম করুণার সমুদ্রে ক্ষুদ্র এক বিন্দু হিসেবে।
দোয়া এরপর আরও বিস্তৃত করুণার চিত্র আঁকে: «یَا مَنْ یُعْطِی مَنْ لَمْ یَسْأَلْهُ وَ مَنْ لَمْ یَعْرِفْهُ تَحَنُّناً وَ رَحْمَةً» অর্থ—হে সেই আল্লাহ, যিনি তাঁদেরও দান করেন যারা আপনাকে চায়নি বা চিনেওনি—নির্মল মমতা ও করুণার তাগিদে।
এটি দয়ার চূড়ান্ত প্রকাশ। প্রার্থনা না থাকলেও, এমনকি পরিচয়হীন হলেও, তাঁর রহমত সব সৃষ্টিকে ছায়ার মতো আচ্ছন্ন করে রাখে।
এরপর দোয়া পৌঁছে মূল আবেদনে: «أَعْطِنِی… جَمِیعَ خَیْرِ الدُّنْیَا وَ… الْآخِرَةِ… وَاصْرِفْ عَنِّی… شَرَّ الدُّنْیَا وَ… الْآخِرَةِ» অর্থ—হে প্রভু, আমাকে দাও দুনিয়া ও আখিরাতের সব কল্যাণ, আর দূরে রাখো দুই জগতের সব অকল্যাণ।
এটি সর্বাঙ্গীণ প্রার্থনা—কল্যাণের পূর্ণ দান এবং অকল্যাণের পূর্ণ রক্ষা—যেখানে বান্দা সম্পূর্ণভাবে তাঁর তত্ত্বাবধানে নিজেকে সমর্পণ করে।
শেষে আসে দৃঢ় বিশ্বাস ও চূড়ান্ত মিনতি: «فَإِنَّهُ غَیْرُ مَنْقُوصٍ مَا أَعْطَیْتَ… وَزِدْنِی مِنْ فَضْلِکَ… حَرِّمْ شَیْبَتِی عَلَى النَّارِ» অর্থ—তোমার দান কখনো অপূর্ণ হয় না; তাই তোমার অনুগ্রহ আরও বাড়িয়ে দাও। হে মহিমা ও করুণা-ধারক, আমার বার্ধক্যের এই সাদা চুল—আমার সমগ্র সত্তাকেই—দোজখের আগুনের জন্য হারাম করে দাও।
এখানে বান্দা স্বীকার করে—তাঁর অনুগ্রহ ক্ষয় হয় না। আর শেষ অনুরোধ—পরিণতি যেন ক্ষমা ও মুক্তিতে পর্যবসিত হয়।
সারবত্তা
১.আল্লাহই একমাত্র আশা ও আশ্রয়
২.তাঁর দয়া প্রার্থনার সীমা ছাড়িয়ে গাফিলদেরও আবরিত করে
৩.সামান্য আমলে অসীম পুরস্কার
৪.দুনিয়া–আখিরাতের সামগ্রিক কল্যাণ প্রার্থনা
৫.শেষ প্রার্থনা—মুক্তি ও ক্ষমা
‘ইয়া মান আরজুহু’ দোয়াটি তাই—আশা, করুণা ও ক্ষমার সমন্বয়ে মানুষের হৃদয়কে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের আহ্বান।



