ধর্ম ও বিশ্বাসকুরআনজীবনযাপনবিশেষ সংবাদবিশ্ব

সুন্নি গ্রন্থসমূহে হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর অমলিন মর্যাদা

ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৫

মিডিয়া মিহির: ফাতিমিয়াত্ত্বের গবেষণার এক দীপ্তিমান বৈজ্ঞানিক সভায়, হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ মোহাম্মদ হোসেইনি কাযভীনি হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর অতুলনীয় মর্যাদা, তাঁর আকাশীয় বিবাহ, ইমাম আলী (আ.)-এর নেতৃত্ব এবং শিয়া-সুন্নি উভয় ধারার প্রাচীন গ্রন্থসমূহে সংরক্ষিত দলিলের উজ্জ্বল নক্ষত্রমণ্ডলীকে উন্মোচিত করেন। এই সভা, কোমের পদ্রিসান অঞ্চলের মাদ্রাসা-এ ইলমিয়া হযরত ওলি-এ আসর (আ.ফা.)-এ অনুষ্ঠিত, যেন এক আলোকময় যাত্রা যা ইতিহাসের গভীরতায় প্রোথিত সত্যকে আলোকিত করে।

-শিয়া গ্রন্থে ফাতিমা (সা.আ.)-এর উজ্জ্বল বর্ণনা

হুজ্জাতুল ইসলাম কাযভীনি বলেন,শিয়া গ্রন্থসমূহেও হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর মর্যাদার দীপ্তিময় বর্ণনা অসংখ্য রূপে বিদ্যমান। এর মধ্যে সহিহ বুখারির চতুর্থ খণ্ডের ২০৯ পৃষ্ঠায়, হাদিস নম্বর ৩৭১১-এ প্রিয়নবী (সা.)-এর এই অমর বাণী স্থান পেয়েছে— «فاطمةُ سیدةُ نساءِ أهلِ الجنة» যার অর্থ: ফাতিমা জান্নাতের নারীদের নেত্রী। এই বাণী যেন এক চিরন্তন আলো, যা ফাতিমা (সা.আ.)-এর মহিমান্বিত স্থানকে আলোকিত করে।

আরও এক হাদিসে, সহিহ বুখারির চতুর্থ খণ্ডের ২১০ পৃষ্ঠায়, হাদিস নম্বর ৩৭১৪-এ প্রিয়নবী (সা.) সতর্কতার সাথে ঘোষণা করেন— «فمَن أغضبَها فقد أغضبَنی» অর্থ: যে তাঁকে কষ্ট দেয়, সে আমাকে কষ্ট দেয়। এই বাণী ফাতিমা (সা.আ.)-এর সাথে নবীর (সা.) অভেদ্য বন্ধনের সাক্ষ্য বহন করে, যেন এক অদৃশ্য সুতো যা হৃদয়কে হৃদয়ের সাথে যুক্ত করে।

আসমানী বিবাহ: আল্লাহর ফয়সালা

হযরত যাহরা (সা.আ.)-এর বিবাহ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চল্লিশাধিক রেওয়ায়েতে বর্ণিত যে অসংখ্য ব্যক্তি তাঁর প্রতি প্রস্তাব নিয়ে আগমন করেছিলেন; কিন্তু প্রিয়নবী (সা.) ঘোষণা করেছিলেন— «أمرُ فاطمةَ إلى الله» অর্থ: ফাতিমার বিবাহের সিদ্ধান্ত আল্লাহর হাতে ন্যস্ত।

মিম্বরের উচ্চতা থেকে নবী করিম (সা.) ঘোষণা করেন যে এই পবিত্র বিবাহ ছিল এক আকাশীয় ফয়সালা। তাঁর শব্দে— «ما زوجتُها ولکِنّ الله زوّجها فوقَ عرشِه» অর্থ: আমি তাঁকে বিবাহ দিইনি; আরশের উপর আল্লাহ নিজেই তাঁকে বিবাহ দিয়েছেন। এই রেওয়ায়েত সুন্নি সূত্রেও সংরক্ষিত, যেন এক স্বর্গীয় গান যা পৃথিবীর সীমানা অতিক্রম করে।

ইতিহাসের ভিত্তি নয়, যুক্তির প্রমাণ

তিনি ব্যাখ্যা করেন যে আমরা শিয়া ইতিহাস রচনায় সুন্নি গ্রন্থের ওপর নির্ভর করি না; তবে মাযহাবের সত্যতা ও ন্যায়শাসনের দলিল উপস্থাপনে সেগুলো অপরিহার্য। সূরা আলে ইমরানের ৯৩ নম্বর আয়াত স্মরণ করিয়ে দেন— «قُلْ فَأْتُوا بِالتَّوْرَاةِ فَاتْلُوهَا إِنْ کُنْتُمْ صَادِقِینَ» অর্থ: তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে তাওরাত আনো এবং পাঠ করো।

এই পদ্ধতি শেখায় যে আকীদাগত আলোচনায় প্রতিপক্ষের গ্রন্থও প্রমাণ হতে পারে। আহলে বায়ত (আ.)-এর ইমামগণও বহু ক্ষেত্রে এই পথ অনুসরণ করেছেন, যেন এক যুক্তির নদী যা সত্যের সাগরে মিলিত হয়।

ওযুর বর্ণনা: সাহাবাদের সাক্ষ্য

সহিহ বুখারির সৌদি সংস্করণে বহু হাদিসে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর বর্ণনা করেন— «فجعلنا نَمسحُ على أرجلِنا» অর্থ: আমরা পায়ের ওপর মাসেহ করতাম।

এই শব্দবন্ধ স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে ওযুতে ধোয়া নয়, বরং মাসেহই ছিল প্রকৃত রীতি। এই রেওয়ায়েত সহিহ মুসলিমের হাদিস নম্বর ২৪১-এও পুনরাবৃত্ত হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন—যদি পায়ের ওপর মাসেহ ‘অবৈধ’ হয়, তবে সাহাবারা কী করে প্রিয়নবীর (সা.) সন্ধানেই ‘অবৈধ’ ওযু করতেন? এই প্রশ্ন যেন এক দর্পণ, যা ঐতিহ্যের গভীরতাকে প্রতিফলিত করে।

ইমাম আলী (আ.)-এর বেলায়াত: সুন্নি তাফসিরে দীপ্ত ঘোষণা

ইমাম আলী (আ.)-এর বেলায়াত ও নেতৃত্ব বিষয়ে সুন্নি তাফসিরেও অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়। সূরা মায়েদার মহিমান্বিত আয়াত— «إِنَّمَا وَلِیُّکُمُ اللّهُ…»-এর ব্যাখ্যায় তাবারি, ইবনে আবি হাতিম এবং আলুসি একবাক্যে উল্লেখ করেছেন যে এ আয়াত আলী (আ.)-এর শানে নাযিল হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আয়াতুল বালাগ, আয়াতুল ইকমাল এবং হাদিসুল গাদির-এর প্রমাণ উপস্থাপনে সুন্নি সূত্র ব্যবহার করা এক বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিনির্ভর পদ্ধতি; যা কোরআন ও আহলে বায়তের (আ.) সুন্নতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেন এক সেতু যা ধর্মীয় ঐক্যের দিকে নিয়ে যায়।

হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-এর শাহাদাত: নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েত

হুজ্জাতুল ইসলাম কাজভীনি বলেন, আল-কুলাইনি বিশুদ্ধ সনদে ইমাম মূসা কাজিম (আ.)-এর বাণী লিপিবদ্ধ করেছেন— «إنّ فاطمةَ صدیقةٌ شهیدة» অর্থ: নিশ্চয়ই ফাতিমা সত্যবাদিনী ও শহীদা।

আল্লামা মাজলিসির «মিরআতুল উকুল»-এ ফাতিমা (সা.আ.)-এর শাহাদাতকে নিশ্চিত সত্য বলে উপস্থাপিত হয়েছে। এছাড়া আয়াতুল্লাহ খুই এবং আয়াতুল্লাহ তাবরিজি উভয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্রে ইমাম কাজিম (আ.)-এর ঘোষণা উল্লেখ করেছেন— «فاطمةُ مظلومةٌ شهیدة» অর্থ: ফাতিমা ছিলেন মাজলুমা ও শহীদা।

এই রেওয়ায়েতসমূহ যেন এক অমর গাথা, যা ফাতিমা (সা.আ.)-এর ত্যাগ ও সত্যের সাক্ষ্য বহন করে, ইতিহাসের পাতায় চিরকালীন আলো ছড়িয়ে।

এই বক্তৃতা যেন এক আধ্যাত্মিক যাত্রা, যা সুন্নি ও শিয়া গ্রন্থের মিলিত আলোয় হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর মহিমান্বিত স্থানকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে, ধর্মীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে।

আরও পড়ুন 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button