বিশেষ সংবাদবিশ্বসংবাদ বিশ্লেষণ

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি এখনও ব্যবহার হয়নি, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত: জেনারেল শেখারচি

রাসেল আহমেদ | প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর, ২০২৫

মিডিয়া মিহির: ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের সাংস্কৃতিক ও সফট যুদ্ধবিষয়ক উপপ্রধান এবং সশস্ত্র বাহিনীর জ্যেষ্ঠ মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল শেকারচি বলেছেন, দেশটির নৌ, স্থল ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা যেকোনো সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান এখনও তার প্রকৃত ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি পুরোপুরি ব্যবহার করেনি।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবুল ফজল শেকারচি মঙ্গলবার শরিফ ইউনিভার্সিটিতে ইসলামী অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিপেনডেন্ট স্টুডেন্টসের সঙ্গে এক বৈঠকে এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি THAAD (টার্মিনাল হাই অলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স) ব্যবস্থা— যাকে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে প্রচার করা হয়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়েছে। জেনারেল শেকারচির মতে, এই ব্যবস্থার প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মূল্য ১ কোটি থেকে ১ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলারের মধ্যে।

এর বিপরীতে, ইরানের তৈরি ফাত্তাহ ক্ষেপণাস্ত্র, যা একটি THAAD ইন্টারসেপ্টরের তুলনায় অনেক কম খরচে উৎপাদিত, বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও ভেদ করতে সক্ষম হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

জেনারেল  শেকারচির বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরাইলের সঙ্গে ১২ দিনের সংঘাতে ব্যবহৃত ফাত্তাহ ক্ষেপণাস্ত্রগুলো উচ্চ প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর আঘাত ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত ও নির্ভুল, যা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির কার্যকারিতা স্পষ্ট করে। তার ভাষায়, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে সরাসরি আঘাত করেছে, যা তাদের কার্যকারিতা ও নির্ভুলতার স্পষ্ট প্রমাণ।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও সংঘর্ষের সর্বোচ্চ পর্যায়েও ইরানের সামরিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়নি। বরং এই ১২ দিনের মধ্যে দেশটির সামরিক সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বাস্তব ফলাফল অর্জিত হয়েছে। জেনারেল শেকারচির মতে, বহু ক্ষেত্রে সরাসরি সামরিক সংঘর্ষের প্রয়োজন হয়নি, অথচ ইরানের ব্যাপক নৌ, স্থল ও আধাসামরিক সক্ষমতার বড় একটি অংশ এখনও অব্যবহৃত রয়েছে।

তিনি জানান, বাসিজ বাহিনীর উল্লেখযোগ্য অংশ, পাশাপাশি নৌ ও স্থল বাহিনী এখনও সম্পূর্ণভাবে মোতায়েন করা হয়নি, যদিও ইরানের সেই সক্ষমতা বিদ্যমান। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি সম্পূর্ণ প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে, তবে এখনো তা পূর্ণমাত্রায় প্রয়োগ করা হয়নি

জেনারেল  শেকারচি দাবি করেন, ইরানের প্রতিপক্ষরা সরাসরি সামরিক সংঘর্ষ থেকে সরে এসে এখন সফট যুদ্ধের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে— যার মধ্যে রয়েছে গণমাধ্যম, মনস্তাত্ত্বিক ও প্রচারণাভিত্তিক কার্যক্রম, যার মূল লক্ষ্য জনগণের মনোবল দুর্বল করা।

২০২৫ সালের ১৩ জুন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পারমাণবিক আলোচনার মধ্যেই ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে এক উসকানিমূলক ও বিনা প্ররোচনার সামরিক আগ্রাসন চালায়। এই হামলার ফলে ১২ দিনের যুদ্ধ শুরু হয়, যাতে কমপক্ষে ১,০৬৪ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন সামরিক কমান্ডার, পারমাণবিক বিজ্ঞানী এবং সাধারণ নাগরিক।

পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন করে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালিয়ে যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে।

এর জবাবে, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী অধিকৃত ভূখণ্ডজুড়ে কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুতে এবং কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিতে (যা পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি)—নির্ভুল হামলা চালায়। ২৪ জুন, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সফল পাল্টা অভিযানের মাধ্যমে ইরান আগ্রাসন বন্ধ করতে বাধ্য করতে সক্ষম হয়।

ইরান ও ইসরাইলের মধ্যকার এই ১২ দিনের যুদ্ধকে জায়নিস্ট শাসনের ইতিহাসে অন্যতম ব্যয়বহুল ও ব্যর্থ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইসরাইলি সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটির অর্থনৈতিক ক্ষতি ছিল ১২ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার। তবে সামগ্রিক বিশ্লেষণে এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রধান ক্ষতির খাতগুলো ছিল—

  • সরাসরি সামরিক ব্যয়: ১২.২ বিলিয়ন ডলার

  • অর্থনৈতিক অচলাবস্থা ও ব্যবসা বন্ধ: ২১.৪ বিলিয়ন ডলার

  • ইরানি হামলায় অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি: ৪.৫ বিলিয়ন ডলার

  • বাসিন্দা স্থানান্তর ও পুনর্গঠন ব্যয়: ২ বিলিয়ন ডলার

এমনকি ইসরাইলের সরকারি পরিসংখ্যান বিবেচনায় নিলেও, এই যুদ্ধ দেশটির ওপর গুরুতর অর্থনৈতিক, সামরিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হিসেবে বাজেট ঘাটতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস, পর্যটন খাতের ক্ষতি, দক্ষ জনশক্তির দেশত্যাগ এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সামগ্রিকভাবে, এই ১২ দিনের যুদ্ধ প্রমাণ করেছে যে ইরানের মোকাবিলায় ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল ব্যর্থ হয়েছে। আরও ক্ষতি ও সম্ভাব্য অর্থনৈতিক বিপর্যয় এড়াতে তেল আবিবকে যুদ্ধবিরতিতে যেতে বাধ্য হতে হয়েছে। ইসরাইলি গণমাধ্যম ও কর্মকর্তাদের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে স্পষ্ট হয়, সকল দাবি ও প্রচারণা সত্ত্বেও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের চাপের মুখে জায়নিস্ট শাসন কার্যত অচল অবস্থায় পৌঁছেছিল।

আরও পড়ুন 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button