হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর পুত্র ইব্রাহিম কত বয়সে এবং কোন কারণে মৃত্যুবরণ করেছিলেন?
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ৮ জানুয়ারি ২০২৬
হযরত মুহাম্মাদ(সা.)-এর পুত্র ইব্রাহিম কত বয়সে এবং কোন কারণে মৃত্যুবরণ করেছিলেন?
নবী মুহাম্মদ(সা.)-এর কনিষ্ঠ পুত্র ইব্রাহিম মাত্র ষোলো মাসের সংক্ষিপ্ত জীবনে জন্ম, শৈশব ও মৃত্যু—সবকিছুই ইতিহাসে গভীর আবেগ ও শিক্ষার প্রতীক হয়ে আছে। তাঁর জীবন কাহিনি নবীর মানবিক দিক, করুণা, ধৈর্য ও আল্লাহপ্রদত্ত প্রজ্ঞার এক অনন্য প্রতিফলন।
ইব্রাহিম, নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর পুত্র: প্রেম, বেদনা ও শিক্ষার গল্প
ইব্রাহিম ছিলেন রাসূলুল্লাহ(সা.)-এর সবচেয়ে ছোট সন্তান। যদিও তাঁর জীবন ছিল অতি সংক্ষিপ্ত, তবু জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত ইসলামের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। তাঁর কাহিনি নবীর মানবিক অনুভূতি ও আধ্যাত্মিক দিককে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
জন্ম ও মাতৃত্ব
ইব্রাহিম হিজরির অষ্টম বছরে মদিনায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা ছিলেন মারিয়া কিবতিয়া, যিনি ইসলাম গ্রহণের পর নবীর গৃহে আসেন এবং “মাশরাবা উম্মে ইব্রাহিম” নামে পরিচিত বাগানে বসবাস করতেন। নবী(সা.) তাঁর পুত্রের নাম রাখেন ইব্রাহিম, পূর্বপুরুষ হজরত ইব্রাহিম(আ.)-এর স্মরণে। জন্মের পর নবী (সা.) আনন্দে আকিকা করেন এবং দরিদ্রদের মাঝে দান করেন, যা পরবর্তীতে ইসলামী ঐতিহ্যে রূপ নেয়।
শৈশব
ইব্রাহিমের শৈশব কেটেছে নবীজির অসীম স্নেহের ছায়ায়। নবী (সা.) প্রায়ই তাঁর মুখশ্রীর সাদৃশ্যের কথা উল্লেখ করে গর্ব করতেন। তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব সঁপে দেওয়া হয়েছিল আনসার গোত্রের একজন নারী, উম্মে বুরদাহর হাতে। নবীজি প্রতিদিন তাঁকে দেখতে যেতেন এবং মাঝেমধ্যে তাঁর পাশে বিশ্রাম নিয়ে সময় কাটাতেন।
মৃত্যু ও নবীর প্রতিক্রিয়া
মাত্র ষোলো মাস বয়সে, হিজরির দশম বছরে ইব্রাহিম অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। নবী (সা.) গভীর শোকে অশ্রু বিসর্জন দেন এবং বলেন: “চোখে অশ্রু আসে, হৃদয় ব্যথিত হয়, তবে আমরা এমন কিছু বলব না যা আল্লাহকে অসন্তুষ্ট করে।” এ উক্তি মুসলমানদের জন্য শিক্ষা হয়ে দাঁড়ায়—শোক স্বাভাবিক, তবে তা আল্লাহর সন্তুষ্টির সীমার মধ্যে থাকা উচিত।
দাফন ও রীতি
নবীজি (সা.) ইমাম আলী (আ.)-কে নির্দেশ দিলেন ইব্রাহিমকে গোসল ও কাফন পরানোর। তাঁকে জান্নাতুল বাকি’ কবরস্থানে, নবীজির সাহাবি উসমান ইবন মাজউনের পাশে সমাহিত করা হলো। দাফনের সময় নবীজি (সা.) কবরের ওপর পানি ছিটানোর নির্দেশ দিলেন, যা পরবর্তীকালে মুসলিম সমাজে একটি প্রচলিত রীতিতে পরিণত হয়।
সূর্যগ্রহণ ও নবীর শিক্ষা
ইব্রাহিমের মৃত্যুর দিনে সূর্যগ্রহণ ঘটে। মানুষ মনে করেছিল এটি নবীর পুত্রের মৃত্যুজনিত। কিন্তু নবী(সা.)স্পষ্টভাবে বলেন: “সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর নিদর্শন। কারও জন্ম বা মৃত্যুতে তারা গ্রহণ করে না।” এ বক্তব্য ছিল কুসংস্কার ভাঙার এক শক্তিশালী শিক্ষা।
সমাধি
ইব্রাহিমের কবর বাকি’ কবরস্থানে অবস্থিত। একসময় এর উপর গম্বুজ নির্মিত হয়েছিল, যা অটোমান আমলে সংস্কার করা হয়। তবে আধুনিক যুগে ওয়াহাবি শাসনকালে তা ভেঙে ফেলা হয়।



