ইসলামী ধর্মের একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে (আদল) ন্যায়ের স্থান কেন নির্ধারিত?
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ৮ জানুয়ারি ২০২৬
ইসলামী ধর্মের একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে (আদল) ন্যায়ের স্থান কেন নির্ধারিত?
মিডিয়া মিহির: ইসলামী ধর্মে আল্লাহর ন্যায়পরায়ণতা(আদল)একটি অপরিহার্য ধারণা, যা শিয়া ইমামিয়া (দ্বাদশী) মতবাদে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এটি কেবল আল্লাহর একটি গুণ নয়, বরং তাওহীদ, নবুয়ত, কিয়ামত এবং মানব-দায়িত্ববোধের মতো মূল বিশ্বাসগুলোকে সঠিকভাবে বোঝার জন্য একটি ভিত্তিমূলক নীতি। নীচে এই বিষয়টিকে ইসলামী চিন্তাধারা অনুসারে সুন্দরভাবে সংগঠিত করে উপস্থাপন করা হলো, যাতে কুরআনীয় ও হাদিসভিত্তিক যুক্তি, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং ব্যবহারিক প্রভাব স্পষ্ট হয়।
১. ন্যায়ের সংজ্ঞা ও গুরুত্ব শিয়া মতবাদে
শিয়া দ্বাদশী মতবাদে ‘ন্যায়’ (আদল) কেবল একটি নৈতিক গুণ বা আল্লাহর গৌণ বৈশিষ্ট্য নয়। এটি আল্লাহর কর্মগত গুণাবলির (صفات فعل) অন্তর্ভুক্ত হলেও, তার বিশেষ গুরুত্বের কারণে এটিকে স্বতন্ত্র নীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
১.মূল ধারণা: ন্যায় মানে “প্রত্যেক কিছুকে তার উপযুক্ত স্থানে স্থাপন করা”। এটি আল্লাহর প্রজ্ঞা, দয়া, রিজিক দান এবং শাসনের মতো গুণগুলোর বিস্তৃত প্রকাশ।
২.কুরআনীয় ভিত্তি: কুরআনে বলা হয়েছে, اِنَّ اللّٰهَ لَا یَظۡلِمُ مِثۡقَالَ ذَرَّۃٍ ۚ (সূরা নিসা: ৪০) – “নিশ্চয়ই আল্লাহ অণুমাত্রও জুলুম করেন না।” এটি আল্লাহর ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত করে।
৩. ন্যায় তাওহীদ, কিয়ামত, নুবুয়ত এবং মানব-দায়িত্ববোধ সঠিকভাবে বোঝার জন্য অপরিহার্য। এটি ঈশ্বরের কার্যকলাপ বোঝার নির্ধারক ভূমিকা রাখে এবং শিয়াদের দৃষ্টিভঙ্গিকে অন্যান্য মতবাদ থেকে পৃথক করে।
২. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: মতপার্থক্যের উৎস
ইসলামী চিন্তার ইতিহাসে ন্যায় নিয়ে তীব্র বিতর্ক হিজরির প্রথম ও দ্বিতীয় শতক থেকে শুরু হয়। এটি মুসলিম কালামবিদদের মধ্যে আল্লাহর কার্যাবলি নিয়ে মৌলিক মতভেদ তৈরি করে।
১.আশআরী মতবাদ: তারা বিশ্বাস করেন যে মানববুদ্ধি আল্লাহর কাজকে ন্যায়-অন্যায়ের ধারণা দিয়ে বিচার করতে অক্ষম। আল্লাহ যা করেন, তাই ন্যায় – এমনকি তা মানুষের বিবেকের সাথে সাংঘর্ষিক হলেও। উদাহরণ: আল্লাহ চাইলে সৎ ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে পারেন এবং পাপীকে পুরস্কৃত করতে পারেন।
২.আদলিয়া মতবাদ (শিয়া ইমামিয়া ও মুতাজিলা): তারা বিশ্বাস করেন যে আল্লাহ প্রজ্ঞাবান ও ন্যায়পরায়ণ। তাঁর পক্ষ থেকে কোনো অন্যায়, অশোভন বা উদ্দেশ্যহীন কাজ সংঘটিত হওয়া অসম্ভব। মানববুদ্ধি অনেক কাজের ভালো-মন্দ উপলব্ধি করতে সক্ষম, কিন্তু এটি আল্লাহর ওপর বিধান জারি করে না – বরং আল্লাহর পরিপূর্ণ সত্তা অন্যায়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
উদাহরণ: নিরপরাধকে শাস্তি দেওয়া, অসম্ভব কাজে বাধ্য করা বা এলাহী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা – এসব আল্লাহর ন্যায় ও প্রজ্ঞার পরিপন্থী।
পার্থক্যের ফলাফল: এই মতভেদ শিয়া ও আশআরীদের মধ্যে বিশ্বাসগত সীমানা নির্ধারণ করে। শিয়া মতবাদে ন্যায়কে স্বতন্ত্র নীতি হিসেবে স্থাপন করা হয় বিভ্রান্তি এড়াতে, এবং এটি ইমামতের পাশাপাশি শিয়া ইমামিয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
৩. ন্যায়ের সাথে অন্যান্য বিশ্বাসের সম্পর্ক
ন্যায় কেবল তাত্ত্বিক নয়, এটি ইসলামের মূলনীতিগুলোর সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত:
১.তাওহীদ (একত্ববাদ): আল্লাহর পরিপূর্ণতা অন্যায়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
২.কিয়ামত (পরকাল): ন্যায় না থাকলে পরকালীন প্রতিফল ও শাস্তির ধারণা অর্থহীন। কুরআনে বলা হয়েছে, “মালিক ইয়াওমিদ্দিন” (সূরা ফাতিহা: ৪) – কিয়ামতের দিনের মালিক, যেখানে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে।
৩.নবুয়ত (নবীত্ব): নবীগণ আল্লাহর ন্যায়পরায়ণতার প্রতিনিধি।
৪.ইমামত: শিয়া মতবাদে ন্যায় ও ইমামত স্বতন্ত্র নীতি, কারণ এগুলো বিশ্বাসগত সীমানা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
৫.মানব-দায়িত্ববোধ: মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও জবাবদিহিতা ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
৪. ন্যায়ের ব্যবহারিক প্রভাব: নৈতিকতা ও সমাজ
ন্যায় কেবল কালামশাস্ত্রের আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়; এটি ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে।
১-ব্যক্তিগত নৈতিকতা: আল্লাহর ন্যায়বোধে বিশ্বাস মানুষকে ন্যায়পরায়ণতা, দায়িত্বশীলতা, অন্যায়বিরোধিতা এবং স্বাধীন ইচ্ছা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে।
২-সামাজিক ব্যবস্থা: এটি নৈতিকতা ও সমাজের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। উদাহরণ: অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, যেমন ইমাম হুসাইন (আ.)-এর কারবালা ঘটনা, যা ন্যায়ের প্রতীক।
৩-হাদিসভিত্তিক উদাহরণ: ইমাম আলী (আ.) বলেছেন, “ন্যায়ই সকল কল্যাণের মূল।(নাহজুল বালাগাহ)। এটি মানুষকে ইসলামী আদর্শ অনুসরণে অনুপ্রাণিত করে।
৫. উপসংহার: ন্যায়ের মৌলিকতা ইসলামে
ইসলামের সাধারণ মূলনীতি হলো তাওহীদ, নবুয়ত ও কিয়ামত; কিন্তু শিয়া ইমামিয়া মতবাদে ন্যায় ও ইমামতকে স্বতন্ত্র নীতি হিসেবে ধরা হয়, কারণ এগুলো বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক ও বিশ্বাসগত পরিণতিতে গুরুত্বপূর্ণ। ন্যায়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ কোনো অতিরিক্ত বিষয় নয়; বরং এটি আল্লাহ ও তাঁর কার্যাবলি সম্পর্কে মানবজাতির মৌলিক প্রশ্নের যুক্তিসঙ্গত উত্তর।
আল্লাহ আমাদের সকলকে ন্যায়ের পথে চলার তৌফিক দান করুন।



