Uncategorizedবিশেষ সংবাদবিশ্ব

অবধারিত সেই ‘সুফিয়ানি’, না কি রুচিমতো গড়া এক ‘সুফিয়ানি’? এ বার সেই অভিযুক্ত আসনটি দখল করলেন ট্রাম্প

ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ৭ জানুয়ারি ২০২৬

অবধারিত সেই ‘সুফিয়ানি’, না কি রুচিমতো গড়া এক ‘সুফিয়ানি’এ বার সেই অভিযুক্ত আসনটি দখল করলেন ট্রাম্প

মিডিয়া মিহির: বিশ্বরাজনীতির বাড়তে থাকা সংকটের ভেতর আবারও তাড়াহুড়া করা ব্যাখ্যা-তুলনার ঢেউ উঠেছে। এইবার কিছু “তুলনামুখী ব্যাখ্যাকারী”-এর দাবি—ডোনাল্ড ট্রাম্পই নাকি সেই “সুফিয়ানি”! অথচ শিয়া ঐতিহ্যের নির্ভরযোগ্য বর্ণনাগুলো এমন ধারণার সঙ্গে সামান্যতম সামঞ্জস্যও রাখে না।

বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক সংকটের তীব্রতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এইবারও ট্রাম্পের গলায় “سفیانی”-র মেডেল ঝুলিয়ে দিলেন তুলনামুখী ব্যাখ্যাকারীরা।

ব্যক্তিনির্ভর এই ধরনের তুলনামুখী ব্যাখ্যার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো—এটি ব্যক্তিগত রুচি চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে এবং ধীরে ধীরে নতুন নতুন গোষ্ঠী ও উপধারার জন্ম দেয়। যে সব লক্ষণ মূলত অন্তর্দৃষ্টি জাগ্রত রাখা এবং সামষ্টিক প্রস্তুতির জন্য বর্ণিত হয়েছিল, সেগুলো যখন নিশ্চিতভাবে কোনো নির্দিষ্ট সমকালীন ব্যক্তি বা আন্দোলনের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয় এবং তা ভুল প্রমাণিত হয়, তখন পুরো সংকেতব্যবস্থার ওপরই মানুষের আস্থা নড়ে যায়; পরিণতিতে মাহদাবীয়াতের মূল বিশ্বাসের প্রতিই শিথিলতা ও নিরাশা তৈরি হয়।

এই ধরনের তুলনামুখী পদ্ধতি আরও একটি ক্ষতি করে—“অপেক্ষা”-র ধারণাটিকে ছোট ও স্বল্পমেয়াদি একটি ঘটনার স্তরে নামিয়ে আনে। চিহ্ন ও আলামত উল্লেখের উদ্দেশ্য ছিল বড় পরিবর্তনের প্রতি সতর্ক থাকা এবং ফিতনা থেকে দূরে থাকা; কিন্তু যখন সমগ্র মনোযোগ কেবল “একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তি” বা নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণে আবদ্ধ হয়, তখন সমাজ তার প্রকৃত দায়িত্ব—ব্যক্তিগত ও সামাজিক সংস্কার—থেকে বিমুখ হয়ে পড়ে এবং সমাধানের সমস্ত আশা একটি “বহিরাগত ত্রাণকর্তা”-র ওপর নিক্ষেপ করে, যিনি আমাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ীই আবির্ভূত হবেন—এমন ধরে নেয়। পরে যখন ওইসব অনুমান পূরণ হয় না, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গায়ব ও জুহুর সম্পর্কিত সমগ্র শিক্ষার প্রতিই বিশ্বাস দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিচ্যুত ধারার প্রবেশদ্বার খুলে যায়।

এ অবস্থায়, বৈশ্বিক রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খবরমাধ্যম ও সামাজিক নেটওয়ার্কে আবারও “হঠকারী তুলনামুখীতা”র ঢল নেমেছে। নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়েত ছাড়াই কেউ কেউ সমকালীন ব্যক্তিত্বদের—এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টও রয়েছেন—“সুফিয়ানি”র নমুনা হিসেবে উপস্থাপন করছেন। অথচ শিয়া রেওয়ায়েতগুলো “সুফিয়ানি” সম্পর্কে যে স্পষ্ট, সীমিত ও সময়বদ্ধ চিত্র দিয়েছে, তার সঙ্গে এই মিডিয়া-তুলনার কোনো মিল নেই। নির্ভরযোগ্য হাদিসে সুফিয়ানি কোনো প্রবহমান রাজনৈতিক উপাধি নয়; তিনি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন এক ব্যক্তিত্ব। ইমাম বাকির ও ইমাম সাদিক (আ.)-এর বর্ণনায় তাঁর বংশ, আবির্ভাবের ভৌগোলিক পরিসর, সময় এবং সীমিত শাসনকাল নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ আছে; তাঁর আবির্ভাবকে “নিশ্চিত” ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়েছে। এমন নির্ভুল বর্ণনা আসলে স্বেচ্ছাচারী ব্যাখ্যা ও মিডিয়াচালিত তুলনার সুযোগ রাখে না।

প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো সুফিয়ানির আবির্ভাবের ভূগোল। ‘আল-গায়বা নু‘মানি’র মতো গ্রন্থে স্পষ্ট বলা হয়েছে—তিনি শাম অঞ্চলে আবির্ভূত হবেন এবং তাঁর আন্দোলনের অর্থও ওই ভৌগোলিক সীমাতেই ধরা পড়ে। এমন কারও সঙ্গে সুফিয়ানি উপাধির যোগ স্থাপন করা, যিনি পৃথিবীর অন্য প্রান্তে অবস্থান করছেন, যার না বর্ণিত বংশের কোনো সম্পর্ক আছে, না উল্লেখিত ভূগোলের সঙ্গে কোনো সংযোগ—এ সবই স্পষ্ট রেওয়ায়েত অস্বীকারের শামিল। ইমাম বাকির (আ.)-এর বর্ণনায় বেদা অঞ্চলে তাঁর সেনাবাহিনীর ধ্বংস, আকাশি আহ্বান, এবং তিনজনের অলৌকিকভাবে বেঁচে থাকা—সবই এক বিশেষ ঐশ্বরিক ঘটনার অংশ হিসেবে বিবৃত হয়েছে; যা সাধারণ রাজনৈতিক পরাজয়ের সঙ্গে তুলনীয় নয়।

দ্বিতীয় সূচক সময়-নির্ধারণ। ইমাম সাদিক (আ.)-এর হাদিসে এসেছে—সুফিয়ানির আবির্ভাব রজব মাসে হবে এবং তাঁর সমগ্র অভিযান পনের মাস স্থায়ী হবে—ছয় মাস সংঘাত, তারপর পাঁচ অঞ্চলে প্রাধান্য পেয়ে নয় মাসের শাসন; এর বেশি একদিনও নয়। এই সীমাবদ্ধ সময়সীমা আধুনিক রাজনীতির দীর্ঘায়িত ক্ষমতা কাঠামোর সঙ্গে কোনোভাবেই খাপ খায় না এবং প্রমাণ করে—সুফিয়ানি কোনো স্থায়ী রাজনৈতিক প্রতীক নয়, বরং ইতিহাসের একটি স্বল্পমেয়াদি প্রকল্প।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো—সুফিয়ানির আবির্ভাব ও কায়েম (আ.)-এর কিয়াম একই বছরে সংঘটিত হবে—এই স্পষ্ট বয়ান। আজকের তাড়াহুড়া করা তুলনা এসব শর্তের কোনো সঙ্গেই মেলে না; এগুলো কেবল সমসাময়িক রাজনীতিতে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া।

বেদা অঞ্চলে ভূধসের ঘটনাটিও এ-সব ভুল তুলনার অসারতা দেখায়—এটি কোনো স্বাভাবিক সামরিক পরাজয় নয়, বরং ইতিহাসের বিশেষ অধ্যায়ে সংঘটিত এক অলৌকিক নিদর্শন।

গত বছরগুলোর অভিজ্ঞতাও বলে—যখনই কোনো রাজনীতিককে “সুফিয়ানি” হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং পরে দাবি ভেঙে পড়েছে, তখন সাধারণ মানুষের মনে মূল রেওয়ায়েত নিয়েই সন্দেহ জন্মেছে। ফলে বিশ্বাস দুর্বল হয়েছে, শক্তিশালী নয়। সার্বিকভাবে দেখা যায়—সুফিয়ানি-সংক্রান্ত হাদিসগুলোর সুনির্দিষ্ট পাঠ আমাদের জানায়: এটি সমসাময়িক রাজনীতি ব্যাখ্যার হাতিয়ার নয়; বরং ইতিহাসের অন্তিম পর্ব সম্পর্কে এক বুদ্ধিবৃত্তিক সতর্কবার্তা। সমকালীন ব্যক্তিদের সঙ্গে এই উপাধি হঠাৎ জুড়ে দেওয়া শুধু যে ভিত্তিহীন তাই নয়, বরং “তুলনামুখীতা”র পুরোনো ক্ষত আরও গভীর করে। এর নিরাময় একটাই—মূল গ্রন্থে প্রত্যাবর্তন, আবেগতাড়না থেকে বিরত থাকা এবং আহলে বাইত (আ.)-এর প্রজ্ঞাময় পদ্ধতির প্রতি আনুগত্য।

আরও পড়ুন 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button