জীবনযাপনধর্ম ও বিশ্বাসবিশেষ সংবাদবিশ্ব

দাজ্জাল কে? শিয়া প্রামাণ্য সূত্রে দাজ্জালের চরিত্র, চিহ্ন ও আবির্ভাবের বিশ্লেষণ

ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ৬ জানুয়ারি ২০২৬

দাজ্জাল কে? শিয়া প্রামাণ্য সূত্রে দাজ্জালের চরিত্র, চিহ্ন ও আবির্ভাবের বিশ্লেষণ

মিডিয়া মিহির: শেষ দিনের ঘটনাপ্রবাহে দজাল মানবজাতির জন্য অন্যতম বড় পরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হবেন। শিয়া প্রামাণ্য হাদিস অনুযায়ী, দজাল একজন প্রকৃত, জীবন্ত এবং শারীরিক ব্যক্তিত্ব, যিনি হযরত বাকি্যাতুল্লাহ আল-আযম (আ.)-এর আবির্ভাবের প্রাক্কালে প্রকাশ হবেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ব্যক্তি ও চিন্তাধারা দজালকে যুগোপযোগী সংস্কৃতিবাদ, পশ্চিমা সভ্যতা বা সায়োনিজমের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন, যা হাদিসের স্পষ্ট বর্ণনার বিপরীত।

১. দাজ্জালের শব্দতাত্ত্বিক অর্থ ও উৎপত্তি ‘দাজ্জাল’ শব্দটি আরবি ‘দাজল’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ—“সত্যের আড়ালে মিথ্যা ঢেকে দেওয়া,” “বিস্তৃত প্রতারণা,” বা “সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা ধোঁকা দিয়ে মুছে ফেলা।” প্রাচীন আরবরা এমন স্বর্ণকে ‘দাজ্জাল’ বলতেন, যা আংশিকভাবে অসৎ হলেও চকচকে দেখায়। সুতরাং, দাজ্জালকে বলতে বোঝায় এমন একজন, যে:

১.মিথ্যা কে সত্যের আড়ালে উপস্থাপন করে

২.মানুষকে বৃহৎ পরিসরে প্রতারণা করে

৩.বাহ্যিক শক্তি বা প্রভাব ব্যবহার করে সত্যকে লুকিয়ে রাখে

এই কারণে ‘দাজ্জাল’ খেতাবটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতারকের জন্য সর্বোত্তম।

২. প্রাচীন ধর্মে দাজ্জালের ধারণা ইসলামের আগেও কিছু আব্রাহামীয় ধর্মে ‘শেষযুগের প্রতারক’ সংক্রান্ত ধারণা ছিল। প্রাথমিক খ্রিষ্টধর্মে তাকে বলা হত ‘অ্যান্টিক্রাইস্ট’ বা খ্রিস্টবিরোধী, যিনি যুগশেষে প্রধান শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হবেন। কিছু গবেষক মনে করেন, এই ভাবনা ইসলামের আগমনের পরে হাদিসে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে শিয়া হাদিসবিদরা কঠোর যাচাইয়ের পর শুধুমাত্র বিশ্বাসযোগ্য ও প্রামাণ্য সূত্র গ্রহণ করেছেন।

৩. শিয়া হাদিসে দাজ্জাল শিয়া প্রধান গ্রন্থ যেমন কামালুদ্দিন, আল-গাইবাহ নুমানি, বিহারুল আনওয়ার, আল-ইরশাদ ও আল-মালাহিম ওয়াল-ফিতান এ দাজ্জালের সম্পর্কে বহু হাদিস বর্ণিত। যদিও সংখ্যা কম, তবে এই হাদিসগুলো প্রামাণ্য, সুসংগঠিত ও নির্ভরযোগ্য।

শিয়ার হাদিস অনুযায়ী:

১.দাজ্জাল একজন প্রকৃত ব্যক্তি

২.তিনি নারী নন

৩.শয়তান নন

৪.কেবল প্রতীক বা রূপক নন

৫.শারীরিক এবং মানবিক অস্তিত্বশীল

৬.শেষযুগে আবির্ভূত হবেন

৭.আবির্ভাবের সময় মানুষের ঈমানের প্রধান শত্রু হবেন

৪. দাজ্জালের মানবিক চরিত্র ইমাম সাদিক (আ.)-এর এক বিখ্যাত হাদিসে বলা হয়েছে: দাজ্জাল একজন মানুষ, আদমের সন্তান।এ থেকে বোঝা যায়, দাজ্জাল:

১.বাস্তব একটি মানুষ

২.নির্দিষ্ট শরীর, আত্মা ও জীবনকাল রাখেন

৩.দায়িত্ব ও স্বাধীনতা রয়েছে

৪.কেবল ধারণা বা রাজনৈতিক/সাংস্কৃতিক প্রবাহ নয়

৫. দাজ্জালের বাহ্যিক চিহ্ন – ‘অঔর দাজ্জাল’ হাদিসে তার চেহারার বিশেষ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ আছে:

১.এক চোখ অন্ধ (প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী ডান চোখ)

২.চোখটি তুলনামূলকভাবে “বাঁধা” বা “আঙ্গুরের মতো ফোলা”

৩.কপালে লেখা থাকে ‘কাফের’ বা ‘ক-ফ-র’

এই চিহ্নগুলো দাজ্জালের প্রতারণামূলক প্রকৃতি প্রকাশ করে—এক চোখ সত্যকে দেখবে না, আর অন্য চোখ দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত ও প্রলুব্ধ করবে।

১. দাজ্জালের আবির্ভাব শেষ যুগের প্রাথমিক লক্ষণ শিয়া হাদিসে দাজ্জালকে উদ্ভবের একটি নিশ্চিত লক্ষণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিখ্যাত হাদিসে বলা হয়েছে: কায়েমের আবির্ভাবের আগে পাঁচটি নিশ্চিত চিহ্ন থাকবে: সাফিয়ানি, ইয়েমানি, চিৎকার/আহ্বান, পবিত্র আত্মার হত্যা, এবং মরুভূমিতে ধ্বস। কিছু হাদিসে ‘পবিত্র আত্মা’ এর পরিবর্তে ‘দাজ্জালের আবির্ভাব’ উল্লেখ আছে। অনেক শিয়া আলেম এই দাজ্জালের আবির্ভাবকে কায়েমের আবির্ভাবের নিশ্চিত লক্ষণ হিসেবে গণ্য করেছেন।

২. দাজ্জালের আবির্ভাব ও সাফিয়ানি প্রচলিত হাদিস অনুযায়ী, দাজ্জালের আবির্ভাব সাধারণত সাফিয়ানি ওয়েলাফুল শৃঙ্খলের পর এবং ইমাম মাহদী(আ.)-এর পূর্ণ আবির্ভাবের আগে। অর্থাৎ:

১.সাফিয়ানি রাজনৈতিক ও সামরিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে

২.ইয়েমানি ধর্মীয় পথ প্রদর্শন করবে

৩.দাজ্জাল বিশ্বাস ও চিন্তার মাধ্যমে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করবে

এই তিনটি প্রক্রিয়া একসাথে বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা তৈরি করে এবং মানবজাতিকে আবির্ভাবের জন্য প্রস্তুত করে।

৩. দাজ্জালের আবির্ভাবের সম্ভাব্য স্থান শিয়া হাদিসে স্থানসমূহ সম্ভাব্যভাবে উল্লেখ আছে:

১-পূর্বাঞ্চল: কিছু হাদিসে খোরাসান বা পৃথিবীর পূর্ব থেকে আবির্ভাবের ইঙ্গিত।

২-ইসফাহান ও আশেপাশ: ‘ইসফাহানের ইহুদি’ প্রথম যারা দাজ্জালের প্রতি বিশ্বাসী হবে।

৩-আরব অঞ্চল: কিছু সুন্নি সূত্রে বলা হয়েছে শাম বা আরব দ্বীপপুঞ্জে। তবে শিয়াতে নির্দিষ্ট প্রমাণ নেই।

মৌলিক পর্যবেক্ষণ:

১.দাজ্জালের আবির্ভাবের নির্দিষ্ট স্থান নিশ্চিত নয়

২.গুরুত্বপূর্ণ হলো তাঁর সৃষ্টি করা বিশ্বব্যাপী বিভ্রান্তি

৩.আবির্ভাব হবে এমন সময়ে যখন মানুষ ধর্ম ও পরিচয়ের সংকটে থাকবে

৪. দাজ্জালের বৈশিষ্ট্য ও ক্ষমতা

ক. প্রলোভন ও প্রভাব

১.অসাধারণ প্রতারণার ক্ষমতা

২.মানুষকে জাদু বা বিস্ময়কর কৌশলে প্রলুব্ধ করা

৩.বাণী ও বক্তৃতা দ্বারা প্রভাব বিস্তার

৪.মিথ্যাকে সত্যের আড়ালে লুকানো

৫.ঈমানহীনদেরকে ধর্ম থেকে বিচ্যুত করা

খ. এলাহীত্ব দাবি

১.নিজেকে রক্ষা ও ন্যায়দাতা হিসেবে উপস্থাপন

২.জীবন ও মৃত্যু তাঁর নিয়ন্ত্রণে বলার দাবি

৩.সাধারণ মানুষ বিশ্বাসে বিভ্রান্ত হয়

গ. অসাধারণ ক্ষমতা (প্রতারণামূলক বা আপেক্ষিক) হাদিসে বর্ণিত:

১.পাহাড়কে নিক্ষেপ করা বা নদী চালনা করা

২.মৃতকে পুনরায় জীবিত করা নির্দেশ দেওয়া

৩.ধরণী ও আকাশে প্রভাব বিস্তার শিয়া পণ্ডিতরা এগুলোকে ‘অবাক করা’ নয়, বরং সন্ত্রাসী জাদু, প্রলুব্ধকরণ বা প্রযুক্তিগত প্রতারণা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।

৫. কি দাজ্জাল ইতিমধ্যেই আবির্ভূত হয়েছে? কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত হয়েছে:

১.দাজ্জাল ইতিমধ্যেই আবির্ভূত হয়েছে

২.দাজ্জাল হলো পশ্চিমা সভ্যতা বা প্রযুক্তি

৩.দাজ্জাল হলো গ্লোবাল মিডিয়া বা পুঁজিবাদ

শিয়া হাদিস অনুযায়ী:

১-দাজ্জাল মানব

২-তিনি ইমাম মাহদী (আ.) ও হযরত ঈসা (আ.)-এর সঙ্গে দ্বন্দ্ব করবেন

৩-ইলাহীত্ব দাবি করবেন, মিডিয়া বা সভ্যতার প্রতিনিধিত্ব নয়

৪-আবির্ভাব শেষ যুগে, ইমাম মাহদীর সময়, সীমিত সময়ে

৫-বাহ্যিক চিহ্ন যেমন এক চোখের অন্ধত্ব এখনও দেখা যায়নি

সুতরাং, “দাজ্জাল ইতিমধ্যেই আবির্ভূত হয়েছে” বিশ্বাসটি অহাদিসিক ও অশাস্ত্রীয়।

৬. দজালের অনুসারী ও লক্ষ্য সমাজ

১.যারা ধর্মের জ্ঞান কম,

২.যারা অনুভূতির উপর ভিত্তি করে বিশ্বাস করেন,

৩.পদার্থবাদী ও বাহ্যিক দৃষ্টিকোণবিশিষ্টরা,

৪.যাদের জন্য ধর্ম আনন্দ ও স্বাচ্ছন্দ্যের মাধ্যম, দায়িত্ব নয়

ইমাম বাকির(আ.)বলেছেন: দাজ্জালের অধিকাংশ অনুসারী নারী ও অজ্ঞ মানুষ।

৭. দাজ্জালের পরিণতি ও হযরত ঈসা (আ.)

১.দাজ্জাল হযরত ঈসা(আ.)-এর সঙ্গে মুখোমুখি হবেন

২.ঈসা(আ.)ইমাম মাহদী(আ.)-এর নির্দেশে দাজ্জালকে হত্যা করবেন

৩.এটি সত্যের বিজয় এবং বিশ্বের ন্যায়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতীক

৪.ঘটনা স্থান: কিছু হাদিসে লুদ্দ, ফিলিস্তিন উল্লেখ

এই মুহূর্তটি মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সময়, যা প্রতারণার যুগের সমাপ্তি এবং ন্যায়ের যুগের সূচনা নির্দেশ করে।

এই ফিতনার মোকাবিলায় শিয়া এবং অপেক্ষমানদের ভূমিকা

১.ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বস্ত রেওয়ায়াতসমূহের জ্ঞান, ইমাম যামান(আ.)-এর পরিচয় এবং মাহদীয় মারেফাতের গভীর অনুধাবন দাজ্জালের ফিতনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা ঢাল।

২. ব্যক্তিগত ও সামাজিক তাকওয়া যত বেশি একটি সমাজ আধ্যাত্মিক হবে, তত কম সে দাজ্জালের প্রতারণায় পড়বে।

৩. পাপ থেকে দূরত্ব পাপ মানুষের হৃদয়কে অন্ধকার করে, এবং দাজ্জাল অন্ধকার হৃদয়ে প্রবেশ করে।

৪.ইমাম যামান(আ.)-এর সাথে হৃদয়ের যোগসূত্র প্রকৃত অপেক্ষমান সেই ব্যক্তি যিনি:

১.ইমামকে মারেফাত করে

২.তাঁর প্রতি মহব্বত রাখে

৩.তাঁর পথে আমল করে

এমন মানুষ দাজ্জালের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে।

চূড়ান্ত সারাংশ

শিয়া বিশ্বস্ত রেওয়ায়াতসমূহের সংগ্রহের ভিত্তিতে: ১. দাজ্জাল একটি প্রকৃত এবং বাস্তব মানুষ। ২.তাঁর উপাধি «আওয়ার দাজ্জাল»। ৩.দাজ্জালের উত্থান যুহুরের নিশ্চিত নিদর্শনসমূহের একটি। ৪. দাজ্জাল পূর্বাঞ্চল বা ইহুদী অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে উত্থিত হবে, কিন্তু সঠিক স্থান নিশ্চিত নয়। ৫. তার প্রতারণার ক্ষমতা অত্যধিক উচ্চ। ৬. সে রুবুবিয়াতের দাবি করে। ৭. তার অনুসারীরা অধিকাংশই সরলমনা এবং কম দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি। ৮. «দাজ্জাল অনেকদিন আগেই যুহুর করেছে» এমন দাবি অবৈজ্ঞানিক এবং ভুল। ৯. দাজ্জাল শেষ পর্যন্ত হজরত ঈসা (আ.)-এর হাতে এবং ইমাম মাহদী(আ.)-এর আদেশে নিহত হবে। ১০. দাজ্জালের ফিতনা থেকে নাজাতের একমাত্র পথ হলো দৃষ্টিভঙ্গি, তাকওয়া, মারেফাত এবং ইমাম যামান (আ.)-এর সাথে হৃদয়ের যোগসূত্র।

আরও পড়ুন 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button