শাফিঈ হাদীসে হযরত আলী(আ.)-এর গুণকীর্তন: সাকীফা থেকে কারবালা
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ৪ জানুয়ারি ২০২৬
শাফিঈ হাদীসে হযরত আলী(আ.)-এর গুণকীর্তন: সাকীফা থেকে কারবালা
ইবনে মাঘাজলীর “মানাকিবুল ইমাম আলী(আ.)—ইসলামী ঐতিহ্যের এক অমূল্য রত্নভাণ্ডার, যেখানে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে হযরত আলী(আ.)-এর মহিমান্বিত জীবনের দীপ্তি, তাঁর চরিত্রের অপরূপ সৌন্দর্য, খিলাফতের প্রকৃত মর্যাদা এবং আল্লাহপ্রদত্ত অব্যর্থ নেতৃত্বের স্বরূপ। ইতিহাসের পাতায় সাক্ষ্য রয়েছে, কীভাবে ঈর্ষার কালো ছায়া এবং ক্ষমতার লোভ সত্যকে বারবার আড়াল করেছে, খিলাফতকে তার স্বাভাবিক ধারাপথ থেকে বিচ্যুত করে দিয়েছে। সাকীফার সেই প্রথম বিচ্যুতির ছায়া শেষ পর্যন্ত করবালার রক্তাক্ত প্রান্তরে পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়েছে, যেন এক দুঃখময় কাব্যের সমাপ্তি।
ইবনে মাঘাজলি—শাফিঈ মাজহাবের এক প্রখ্যাত আলেম—পঞ্চম হিজরী শতাব্দীর আলোকিত ব্যক্তিত্ব, যাঁর নাম আবু হোসেন আলী বিন মুহাম্মদ বিন আলী বিন মাঘাজলি। ইরাকের ওয়াসিতে জন্মগ্রহণ করে তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন বাগদাদ ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে, যেন এক নিরন্তর অনুসন্ধানের যাত্রায়। তিনি ছিলেন হাদিসের বিশ্বস্ত রাওয়ি, বিশেষত হযরত আলী(আ.)-এর ফাজাইল সংকলনে সুপরিচিত, যাঁর কলম যেন সত্যের আলো ছড়িয়েছে অন্ধকারের বিরুদ্ধে।
“মানাকিবুল ইমাম আলী(আ.)গ্রন্থে তিনি হযরত আলী(আ.)-এর সাহসের মহাকাব্য, জ্ঞানের অমিয় ধারা, ন্যায়পরায়ণতার অটুট প্রতিফলন, আধ্যাত্মিক উচ্চতার শিখর এবং কুরআনীয় মর্যাদার সৌন্দর্যকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে উপস্থাপন করেছেন। গাদির খুমের ঐতিহাসিক ঘোষণা, খিলাফত ও ওসায়াতের স্বীকৃতি—সবকিছু যেন এক সুন্দর তুলির আঁকায় ফুটে উঠেছে। গ্রন্থে উঠে এসেছে—
১.হযরত আলী (আ.)-এর বীরত্ব, প্রজ্ঞা ও ন্যায়ের জীবন, যেন এক অমর কাহিনী।
২.তাঁর ইলাহী মর্যাদা ও কুরআনে বর্ণিত স্থান, যা আলোকিত করে আত্মার গভীরতা।
৩.গাদির খুমের ঐতিহাসিক ঘোষণা, যেন সত্যের এক চিরন্তন প্রতিধ্বনি।
৪.খিলাফত ও ওসায়াত সম্পর্কিত হাদিস, যা নেতৃত্বের প্রকৃত স্বরূপ উন্মোচন করে।
৫.এবং অন্যান্য সাহাবীর তুলনায় তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের দলিল, যেন আলোর রশ্মি অন্ধকার ছিন্ন করে।
এই রেওয়ায়াতগুলোর অধিকাংশই শিয়া সূত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার ফলে ইমামীয়া পণ্ডিতরা—বিশেষত আল্লামা আমিনী তাঁর “আল-গাদির” গ্রন্থে—ইবনে মাঘাজলীর উদ্ধৃতি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন, যেন এক সেতুবন্ধন সত্যের ধারায়।
গ্রন্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে আলোচিত হয়েছে সূরা নিসা, আয়াত ৫৪: «أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَىٰ مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ …» অর্থাৎ, “তারা কি ঈর্ষা করে সেই মানুষের প্রতি, যাদেরকে আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন?(বাসায়েরুদ্দারজাত ফি ফাযাইলে আলে মুহাম্মদ (সা.), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৫।)
ইবনে মাঘাজলি এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বাকের(আ.)-এর রেওয়ায়াত উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছে— “আমরাই সেই মানুষ, যাদেরকে আল্লাহ তাঁর বিশেষ অনুগ্রহে ইমামত ও নেতৃত্বের মর্যাদা দান করেছেন; আর এ কারণেই আমরা ঈর্ষার লক্ষ্যবস্তু। অনুরূপ বর্ণনা পাওয়া যায় “আল-ঘারাত” ও “বসায়েরুদ দারাজাত” গ্রন্থেও— “نَحْنُ النَّاسُ الْمَحْسُودُونَ عَلَى مَا آتَانَا اللَّهُ الْإِمَامَةَ” অর্থাৎ, “আমরাই সেই ঈর্ষিত মানুষ, যাদেরকে আল্লাহ ইমামতের মর্যাদা দিয়েছেন।”
ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে স্পষ্ট হয়—খিলাফত ও রাজতন্ত্রের সঙ্গে আহলুল বাইতের বিরোধের মূলে ছিল আল্লাহ প্রদত্ত নেতৃত্বের স্বীকৃতি। ঈর্ষা ও ক্ষমতালোভ সেই অধিকারকে প্রকৃত উত্তরাধিকারীর হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল, যেন এক ছায়াময় ষড়যন্ত্রের ছবি। সাকীফার সেই বিচ্যুতি করবালায় এসে রক্তে লেখা সত্যে পরিণত হয়েছে—ইমাম হাসান (আ.)ও ইমাম হুসাইন(আ.)-এর শাহাদতের মধ্য দিয়ে, যেন এক চিরন্তন কাহিনীর দুঃখান্ত।
ইমাম হুসাইন(আ.)যখন ইয়াজিদের মুখোমুখি হন, তিনি ঘোষণা করেন— “আমরা নবুতের পরিবার, ওহীর উৎস, ফেরেশতাদের আগমনস্থল। আল্লাহ আমাদের দিয়ে শুরু করেছেন এবং আমাদের দিয়েই সমাপ্ত করবেন। আর ইয়াজিদ—একজন ফাসেক, মদ্যপ, নিষ্পাপ মানুষের হত্যাকারী। আমার মতো কেউ তার মতো ব্যক্তির কাছে বায়আত দিতে পারে না। কাল আমরা এবং তোমরা দেখব—খিলাফতের যোগ্যতা কার।
এই ঘোষণা শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়—এ ছিল খিলাফতের প্রকৃত স্বরূপের এক কাব্যিক উন্মোচন: খিলাফত কোনো মানবিক পদ নয়; এটি আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব, নবুয়তের ধারাবাহিকতা, যেন এক অমর প্রবাহ।
শেষ পর্যন্ত ইমাম হুসাইন(আ.)-এর এই অবস্থান মানবতার ইতিহাসে এক চিরন্তন সত্য প্রতিষ্ঠা করে—ন্যায়, জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বই প্রকৃত খিলাফত। অন্যায় ও প্রতিহিংসা যতই প্রবল হোক, আল্লাহর নির্ধারিত সত্য একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেই—এই আশাই তাঁর শাহাদতের অন্তর্নিহিত বার্তা, যেন এক উজ্জ্বল প্রভাতের প্রতিশ্রুতি।



