শিয়া: নবীর যুগ থেকে সাফাভী পর্যন্ত – ইরানের ধর্মীয় ইতিহাসের সত্য
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬
শিয়া: নবীর যুগ থেকে সাফাভী পর্যন্ত – ইরানের ধর্মীয় ইতিহাসের সত্য
মিডিয়া মিহির: শিয়া কোনো নতুন সৃষ্টি নয়। এটি নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর যুগ থেকেই বিদ্যমান একটি ধারাবাহিক ধর্মীয় ও রাজনৈতিক আন্দোলন। সাফাভী শাসকরা কেবল এই প্রাচীন ধারাটিকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা ও প্রসারিত করেছেন, কিন্তু এর ভিত্তি এবং মূল ধারক নবী মুহাম্মাদ (সা.) ও আল্লাহ।
ইসলামী ইতিহাসে অনেকেই মনে করেন শিয়া সাফাভী সময়ের নতুন সৃষ্টি। তবে এই ধারণা ইতিহাসের সত্যের সঙ্গে মিল নেই। বাস্তবে শিয়া নবী মুহাম্মাদের যুগ থেকেই একটি ধারাবাহিক ধারার অংশ হিসেবে বিদ্যমান ছিল, যা ধর্মীয় চিন্তাধারা ও রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে বিকশিত হয়।
নবীর যুগ থেকে শিয়ার উৎপত্তি
শিয়া শব্দের অর্থ হলো “অনুগামী বা অনুসারী। ইসলামী পরিভাষায় এটি সেই মানুষদের বোঝায় যারা ইমাম আলী(আ.)-কে নবী মুহাম্মাদ(সা.)র সরাসরি উত্তরাধিকারী মনে করে। এই নামকরণ এবং চিন্তাধারা নবী মুহাম্মদের ভাষা থেকে উদ্ভূত।
শিয়াদের বিষয়ে নবী মুহাম্মাদ (সা.)-র কিছু হাদিস রয়েছে, যা শিয়া এবং সুন্নী উভয় সূত্রে বর্ণিত। নবী আয়াত «إِنَّ الَّذِینَ آمَنُوا وَ عَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَئِکَ هُمْ خَیْرُ الْبَرِیَّةِ»-এর ব্যাখ্যা হিসাবে বলেছেন: হে আলী! তুমি এবং তোমার শিয়ারা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ।
আরেকটি হাদিসে বলা হয়েছে: আলী এবং তার শিয়ারা কিয়ামতের দিনে রক্ষা পাবেন।
নবীর সময়েই চারজনকে শিয়ার পথপ্রদর্শক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল: সালমান ফার্সী, আবুজর গফারি, মেকদাদ বিন আসওদ এবং আ’মার ইয়াসির। তারা শুধু আলীর অনুসারীই ছিলেন না, বরং মুসলিম সমাজে এই নামেই পরিচিত ছিলেন।
এই ইতিহাস প্রমাণ করে যে শিয়া নবীর যুগ থেকেই একটি ধারাবাহিক চিন্তাধারাগত ও ধর্মীয় আন্দোলন হিসেবে ইসলামে বিদ্যমান ছিল।
রাজনৈতিক-ধর্মীয় শিয়ার গঠন
নবীর মৃত্যুর পর সাকিফা ঘটনা ঘটে। এ সময় শিয়া একটি রাজনৈতিক-ধর্মীয় গোষ্ঠী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। অনেক সাহাবা আবু বকরকে খলিফা হিসেবে স্বীকৃতি দেননি এবং আলীকে রাজত্বের দাবি করেন। এই গোষ্ঠীর মধ্যে ছিলেন বনি হাশিমের সদস্যরা এবং অন্যান্য প্রভাবশালী সাহাবা যেমন: জাবির বিন আওয়াম, খালিদ বিন সাঈদ, আবি বিন কাব, খুজাইমা বিন থাবিত ইত্যাদি।
মরহুম সৈয়দ মোহসিন আমিন তার গ্রন্থ “আয়ানুশ শিয়া”-এ ৭৭ জন সাহাবার নাম তালিকাভুক্ত করেছেন যারা শিয়ার অনুসারী ছিলেন। আল্লামা শরফুদ্দিন “ফুসুলুল মূহিম্মা”-তে ২৫০ জন সাহাবাকে উল্লেখ করেছেন যারা শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত।
প্রথম থেকে নবম শতাব্দীর মধ্যে শিয়া সম্পর্কিত গ্রন্থের অস্তিত্ব এই ধর্মের গভীর ও প্রাচীন ইতিহাসের প্রমাণ।
ইরানে শিয়ার বিস্তার (সাফাভীর আগে)
ইসলামের আগমন থেকেই শিয়া ইরানে প্রবেশ করে। এর বিস্তারে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল:
১.আলী ও অন্যান্য ইমামদের ন্যায়পরায়ণ আচরণ: তারা সকলকে সমানভাবে দৃষ্টিভঙ্গি দেখাতেন, আরব ও অারবীজদের মধ্যে পার্থক্য করতেন না।
২.ইরাকের শিয়াদের প্রভাব: ইরান কুফার অন্তর্গত থাকায় ইরাকি শিয়াদের শক্তিশালী প্রভাব কার্যকর ছিল।
৩.আলী বংশের জনপ্রিয়তা ও সাদাতদের অভিবাসন: আলী বংশের সাদাতরা ইরানে এসে প্রচার ও প্রভাব বিস্তার করতেন।
৪.শান্তিপূর্ণ শিয়া-সমর্থক সুনী সম্প্রদায়ের উপস্থিতি: যা ইমামি শিয়ার প্রতি আকর্ষণ বাড়িয়েছিল।
ঐতিহাসিক প্রমাণও আছে। উদাহরণস্বরূপ:
১.ইসফাহানের কয়েনে ৮৭৩ হিজরিতে লেখা ছিল: “لا إله إلا الله علی ولی الله”
যা সাফাভীর আগের সময়ের।
২.কাশানে ৭৭০ হিজরিতে একটি মিহরাবে একই লেখা পাওয়া গেছে।
সাফাভীদের ভূমিকা
সাফাভীরা শিয়াকে নতুনভাবে তৈরি করেননি। তারা এটিকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন এবং এর শিক্ষা ও সম্প্রদায়কে সংগঠিত ও প্রসারিত করেছেন।
শাহ ইসমাইল ৯০৭ হিজরিতে দ্বাদশ ইমামি শিয়াকে ইরানের সরকারি ধর্ম হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি আলেমদের আমন্ত্রণ জানান, যেমন: আল্লামা মাজলিসি, শেখ বেহাই, মুল্লা সদরা ও ফেইজ কাশানি। এর ফলে কুম, মাশহাদ এবং ইসফাহানে ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিকশিত হয়। শিয়ার সম্প্রদায় বিচ্ছিন্ন থেকে একটি সংগঠিত প্রতিষ্ঠান আকারে গড়ে ওঠে।
এই পরিবর্তনগুলি শিয়ার উদ্ভব নয়, বরং প্রতিষ্ঠা ও সরকারি স্বীকৃতি।
উপসংহার
শিয়া নবীর যুগ থেকেই বিদ্যমান। এর প্রবর্তক ছিলেন আল্লাহ এবং প্রচারক নবী মুহাম্মাদ (সা.)। সাফাভিরা শুধুমাত্র এটি সরকারি স্বীকৃতি ও সংগঠন দিয়েছেন। শিয়া কোনো সাময়িক রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং ইসলামের একটি গভীর ও প্রাচীন ধারার অংশ।



