বিবাহের পূর্ববর্তী বন্ধুত্ব সম্পর্কে ধর্মের দৃষ্টিকোণ কী?
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির: ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ অনুযায়ী বিবাহ-পূর্ব বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য নয়—কারণ এতে ধর্মীয় বিধিনিষেধ লঙ্ঘন, আইন-উপেক্ষা, অবাস্তব কল্পনা সৃষ্টি এবং পরিবারের ভিত্তি দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইসলাম বিবাহকেই মানবিক পূর্ণতার সঠিক পথ হিসেবে দেখায় এবং এর বাইরে গড়ে ওঠা যে কোনো সম্পর্ককে পাপ ও ক্ষতিকর বলে আখ্যায়িত করে।
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মোহাম্মদী শাহরূদি তাঁর এক বক্তব্যে «বিয়ের আগে বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক সম্পর্কে ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি কী?»—এই প্রশ্নের উত্তর দেন; সেটিই এখানে শ্রদ্ধেয় পাঠকদের জন্য উপস্থাপন করা হলো।
প্রশ্ন: বিবাহের পূর্ববর্তী বন্ধুত্ব সম্পর্কে ধর্মের দৃষ্টিভঙ্গি কী?
উত্তর
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
ধর্মের দৃষ্টিতে এ ধরনের সম্পর্ক সমর্থনযোগ্য নয়, এবং এর পেছনে সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানে উল্লেখযোগ্য।
প্রথমত, প্রত্যেক সমাজেই আইন মান্য করা আবশ্যক; আর ধর্মীয় সমাজে মূল মানদণ্ড হলো আল্লাহর আইন। ঐশী বিধানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, পরপুরুষ ও পরনারী পরস্পরের মাঝখানে সীমা ও শালীনতার পর্দা রক্ষা করতে হবে। অনিবার্য প্রয়োজনে—যেমন চিকিৎসা বা পেশাগত যোগাযোগের ক্ষেত্রে—যে পরিমাণ সম্পর্কের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তা-ই গ্রহণযোগ্য; এর বাইরে অতিক্রম করা নিষিদ্ধ ক্ষেত্রভুক্ত। এমন সম্পর্ক স্থাপিত হলে মানুষ ক্রমাগত পাপে জড়িয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, এ ধরনের সম্পর্ক সাধারণত এমন সময়ে গড়ে ওঠে যখন প্রকৃত দায়িত্ববোধ এখনো জন্ম নেয়নি—না ঘর-সংসারের দায়, না পরিবার পরিচালনার বাস্তব চাপ। এই পরিসরে উভয়েই একে অপরের জন্য রঙিন কল্পনার প্রাসাদ নির্মাণ করে, যা বাস্তব জীবনের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। যৌথ জীবনের প্রকৃত দায়িত্বের মুখোমুখি না হওয়ায় চাহিদা ও প্রত্যাশা ক্রমে বাড়তে থাকে। পরে যখন বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করে—সে একই ব্যক্তির সঙ্গে হোক বা অন্য কারও সঙ্গে—তখন বোঝা যায়, মানসিক কল্পনার সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক কত গভীর। এখান থেকেই অসন্তোষ ও দ্বন্দ্বের সূচনা হয় এবং পরিবারের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
তৃতীয়ত, প্রতিটি সমাজেরই নিজস্ব আইনব্যবস্থা রয়েছে; ইসলামও মানবজীবনের ব্যক্তিগত ও সামাজিক ক্ষেত্রে সুসংগঠিত একটি আইনি কাঠামো প্রদান করেছে। এই আইনের অবমাননা সমাজকে বিশৃঙ্খলা ও অধঃপতনের দিকে ঠেলে দেয়।
শেষত, মানুষের সৃষ্টিগত উদ্দেশ্যের সঙ্গেও বিষয়টি জড়িত। ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহ মানব-জীবনের পূর্ণতার অন্যতম প্রধান পথ। যে ব্যক্তি বিবাহ থেকে বিমুখ থাকে কিংবা আল্লাহ নির্ধারিত পন্থা পরিহার করে অন্য পথে হাঁটে, তার মধ্যে এক ধরনের অপরিপক্বতা বজায় থাকে। কেবল আল্লাহ নির্ধারিত পথেই প্রকৃত পূর্ণতা অর্জন সম্ভব; অন্য পথ মানুষকে লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে না।
বিবাহ-পূর্ব বন্ধুত্ব শুধু যে ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ তা-ই নয়; বরং এমন সম্পর্কের প্রতিটি পর্বে পাপ লিখিত হতে থাকে। আল্লাহর বিধানের ক্ষেত্রে কারও জন্য ছাড় বা রসিকতার স্থান নেই—স্বর্গীয় পর্যবেক্ষকরা মানুষের কর্মাবলি লিপিবদ্ধ করেন। এই অঙ্গনে আইনভঙ্গ অবশেষে গুরুতর সামাজিক ক্ষত তৈরি করে এবং সমাজের ভিত্তিকেও দুর্বল করে দিতে পারে।
অন্যদিকে, যদি ছেলে ও মেয়ে সঠিক পথে অগ্রসর হয় এবং বৈধভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়, তবে তারা স্বামী–স্ত্রী হিসেবে পরিগণিত হবে এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক হবে সম্পূর্ণ বৈধ ও নির্দোষ। কিন্তু ঐশী আইন উপেক্ষা করে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করা ধর্মবিধির পরিপন্থী, এবং ইসলাম এ ধরনের সম্পর্ককে স্বীকৃতি দেয় না।



