মরিয়মের কুরআনি পরিচয়: মর্যাদার মানদণ্ড হলো ঈমান ও পবিত্রতা, লিঙ্গ নয়
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির: কুরআনের ভাষায় মর্যাদার আসল মানদণ্ড হলো ঈমান ও চরিত্রের পবিত্রতা। সুরা তাহরীম-এ হযরত মরিয়ম (আ.)—নারী-পুরুষ সকল ঈমানদারের জন্য আদর্শ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছেন; এতে স্পষ্ট হয়, কুরআনের দৃষ্টি সংকীর্ণ লিঙ্গভিত্তিক নয়, বরং মূল্যনির্ভর।
আয়াত «وَمَرْیَمَ ابْنَتَ عِمْرَانَ الَّتِی أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا»-এর ভাষ্য স্পষ্ট করে যে মর্যাদার মানদণ্ড হলো ঈমান ও পবিত্রতা—লিঙ্গ নয়।
ধর্মীয় বিষয়ের গবেষক জাহরা দুস্ত-মোহাম্মদি বলেন—কুরআন যখন মানবিক আদর্শ উপস্থাপন করে, তখন তা কোনো সংকীর্ণ লিঙ্গভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে নয়। সুরা তাহরীম-এ আল্লাহ তায়ালা হযরত মরিয়মকে(আ.)নারী-পুরুষ সকল ঈমানদারের জন্য এক ঐশী আদর্শ হিসেবে পরিচিত করেছেন। উল্লেখিত আয়াতেই বিষয়টি পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে, যা দেখায়—করুণা ও মর্যাদার মূল ভিত্তি হলো ঈমান ও পবিত্রতা, লিঙ্গ নয়।
মোহাম্মদি শব্দ «أحصنت»-এর ব্যুৎপত্তি উল্লেখ করে বলেন—এটি এসেছে «حصن» শব্দ থেকে, যার অর্থ দুর্গ বা দূর্গপ্রাচীর। কুরআনের ভাষায় এ শব্দ পবিত্রতাকে নিছক বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং এক সক্রিয় ও সজাগ সুরক্ষা হিসেবে উপস্থাপন করে। অর্থাৎ কুরআনের দৃষ্টিতে পবিত্রতা হলো সচেতন নির্বাচন এবং বিচ্যুতির বিরুদ্ধে অন্তর্নিহিত দৃঢ় প্রতিরোধ।
এই কুরআনবিশারদ আরও বলেন—এই আয়াতে হযরত মরিয়মের(আ.)চারটি আলোকিত বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে: আত্মসংযম ও পবিত্রতা, ঐশী নিঃশ্বাস গ্রহণের যোগ্যতা, অহী ও আসমানি গ্রন্থসমূহে গভীর বিশ্বাস এবং পরম আরাধ্য আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি পূর্ণ সমর্পণ; যার চূড়ান্ত প্রকাশ «وَکَانَتْ مِنَ الْقَانِتِینَ»-এ দেখা যায়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন—কুরআনে হযরত মরিয়মের(আ.)নামের পুনরাবৃত্তি নজিরবিহীন; তাঁর নাম ৩১ বার এসেছে এবং তাঁর নামেই একটি স্বতন্ত্র সুরা নাজিল হয়েছে। এই বিস্তৃত উল্লেখ প্রমাণ করে যে তিনি সব যুগের মানুষের জন্য এক উজ্জ্বল আদর্শ—বিশেষত সেই সমাজগুলোতে, যেখানে নারীর মর্যাদা কখনও অবমূল্যায়িত হয়, কখনও ভোগের বস্তুতে পরিণত করা হয়। «إِنَّ اللَّهَ یُدَافِعُ عَنِ الَّذِینَ آمَنُوا» আয়াতের ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন—যখন শত্রুরা মরিয়মের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ ছড়ায়, তখন আল্লাহ স্বয়ং তাঁর পবিত্রতার পক্ষ নিয়ে প্রতিরক্ষা করেছেন। এর মাধ্যমে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ পবিত্র ও ঈমানদার বান্দাহদের মর্যাদা নিজেই রক্ষা করেন।
তিনি বলেন—কুরআন আসিয়া, মরিয়ম, খদিজা ও ফাতিমা (সা.)-এর মতো নারীদের উপস্থাপন করে দেখিয়েছে যে ঐশী আদর্শ সময়, স্থান বা নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নয়; তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ প্রেক্ষাপটে মানব–মহত্ত্বের শিখরে আরোহণ করেছেন।
শেষে বলেন—আজকের সমাজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন অনুভব করছে এমন আদর্শের, যারা স্লোগানে নয়, কর্ম ও ঈমানের দীপ্ততায় উন্নতির পথ দেখিয়েছে। হযরত মরিয়ম(আ.) নিঃসন্দেহে সেই উজ্জ্বল প্রদীপগুলোর একটি।



