জীবনযাপনধর্ম ও বিশ্বাসবিশেষ সংবাদবিশ্ব

জিয়ারাতে জামেয়া কাবীরায় ইমাম হাদী (আ.): ইমামদের পুনরাগমন হইতে বিশ্বব্যাপী ন্যায়শাসনের প্রতিষ্ঠা

ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২৫

মিডিয়া মিহির: রাজ’আত বা পুনরাগমনের বিশ্বাস—যেন একটি অন্ধকার রাত্রির পর উজ্জ্বল ভোরের প্রতিশ্রুতি—ইসলামের গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা, যা শিয়া চিন্তায় অনন্য আলো ছড়ায়। এটি কিয়ামতের পূর্বে ন্যায়ের পূর্ণ প্রতিষ্ঠার মধ্যবর্তী সেতু, যা সৎকর্মীদের বিজয়ের সাক্ষী হতে এবং অত্যাচারীদের দুনিয়াবী শাস্তি দিতে আহ্বান জানায়। ইমাম হাদী(আ.)-এর জিয়ারাত জামে’য়াহর ফিরোজায় এই বিশ্বাস তিন স্তরে উন্মোচিত হয়: প্রত্যাবর্তনের মৌলিক ঈমান, রাজ’আতের সত্যায়ন এবং ন্যায়ের বিশ্বরাজ্যের সক্রিয় প্রত্যাশা—যেন একটি চিরন্তন গান যা হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে।

রাজ’আত বা পুনরাগমনে বিশ্বাস—অর্থাৎ আবির্ভাবের পর কিছু বিশেষ মানুষ আবার দুনিয়ায় ফিরে আসবেন—ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ও গভীর এক আধ্যাত্মিক শিক্ষা, যেন একটি লুকানো রত্ন যা শিয়া চিন্তায় অনন্য স্থান দখল করে আছে। রাজ’আতের বিশ্বাস মোটেই কিয়ামতের প্রত্যাখ্যান নয়; বরং কিয়ামতের আগে ন্যায়বিচারের পূর্ণ প্রতিষ্ঠাকে নিশ্চিত করার এক মধ্যবর্তী পর্ব, যেন একটি সেতু যা অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে যায়। এই বিশ্বাস মানবসমাজে ন্যায়ের সর্বাঙ্গীণ প্রতিষ্ঠার আশাকে শক্তিশালী করে, কারণ সালেহ বা সৎকর্মশীলদের পূর্বসূরিরা তখন ইমাম মাহদীর (আ.) পতাকার নিচে চূড়ান্ত বিজয়ের সাক্ষী হতে পারবেন এবং নির্দয় অত্যাচারীরাও আখিরাতে প্রবেশের পূর্বেই দুনিয়ায় তাদের প্রাপ্য শাস্তি অনুভব করবে, যেন একটি ন্যায়ের তলোয়ার যা অন্ধকারকে ছিন্ন করে।

এই কারণে রজ’আতের প্রতি আস্থা গভীর ঈমানের লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়; কেননা এটি আহলে বাইতের বর্ণিত বাণীর প্রতি অনুগত সমর্পণ এবং আল্লাহ চাহিত ন্যায়ের পূর্ণপ্রকাশের প্রতি নিশ্চিত বিশ্বাসের প্রকাশ, যেন একটি আলোকিত পথ যা হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করে। রজ’আতে বিশ্বাস ইসলামের ন্যায়কেন্দ্রিক দর্শনের গভীরতা তুলে ধরে এবং ইতিহাসের অন্ধকারতম সময়েও চূড়ান্ত সত্যের বিজয়ের আশাকে জাগরূক রাখে, যেন একটি চিরসবুজ বৃক্ষ যা ঝড়ে অটল থাকে। এই বিশ্বাস মুমিনকে নিশ্চিত করে যে—যদিও গায়েবতের যুগে কিংবা ইতিহাসের তীব্র নির্যাতনের সময় সৎরা তাদের প্রাপ্য মর্যাদা না-ও পেতে পারে এবং জালিমরা শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারে—তবুও আল্লাহ এক বিশেষ পর্যায়ে এ পৃথিবীতেই ন্যায়বিচারের পূর্ণ উপলব্ধির ব্যবস্থা করবেন। ফলে রাজ’আতের বিশ্বাস সাময়িক মিথ্যার বিজয়ের সামনে নিরাশাকে দূরে ঠেলে দিয়ে মানুষকে প্রতিশ্রুত সত্যের জন্য সক্রিয় প্রতীক্ষায় আহ্বান জানায়, যেন একটি ঝরনা যা শুষ্ক মরুভূমিতে প্রাণের জল বহন করে।

এ কারণেই রাজ’আতকে ঈমানের লক্ষণ বলা হয়; কারণ এটি ইমামত ও বেলায়াতের পূর্ণ শৃঙ্খলাকে মেনে নেওয়ার ঘোষণা এবং ইহজাগতিক ইন্দ্রিয়ের বাইরে থাকা আধ্যাত্মিক সত্যগুলোকে গ্রহণ করার প্রস্তুতির নিদর্শন, যেন একটি আকাশ যা তারার মালায় সজ্জিত। এই বিশ্বাস মানুষকে ভবিষ্যতের ঐশী রাষ্ট্রে অংশগ্রহণের আকাঙ্ক্ষা জাগায় এবং তাকে এমন এক সালেহের দলে থাকতে আহ্বান জানায়, যারা ফিরে আসার যোগ্যতা অর্জন করবে এবং আল্লাহ প্রদত্ত মহাপুরস্কার পাবে, যেন একটি মুক্তো যা সমুদ্রের গভীর থেকে উঠে আসে।

ইমাম হাদী (আ.)জিয়ারাতে জামে-এর এক অংশে রাজ’আত ধারণার কথা উল্লেখ করে বলেন— «مُؤْمِنٌ بِإِیابِكُمْ، مُصَدِّقٌ بِرَجْعَتِكُمْ، مُنْتَظِرٌ لِأَمْرِكُمْ، مُرْتَقِبٌ لِدَوْلَتِكُمْ» “আমি তোমাদের পুনরাগমনে দৃঢ় বিশ্বাসী; তোমাদের রজ’আতকে সত্য বলে স্বীকার করি; তোমাদের আদেশের প্রতীক্ষায় আছি; আর তোমাদের ন্যায়রাজ্যের প্রত্যাশায় দৃষ্টিপাত করে আছি।”

এই বাক্যে গায়েবতের যুগে একজন সত্যিকারের শিয়া কী ধরনের বিশ্বাসে বেঁচে থাকে—তার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র অঙ্কিত হয়েছে, যেন একটি চিত্রকলা যা হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে যায়। প্রথমে “মু’মিনুন বিইয়াবিকুম”-এর মাধ্যমে আহলে বাইতের প্রত্যাবর্তনে সামগ্রিক বিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে; এরপর “মুসাদ্দিকুন বিরাজআতিকুম”-এর মাধ্যমে সেই সাধারণ বিশ্বাসকে বিশেষভাবে রাজ’আতের নির্দিষ্ট ধারণায় নিবদ্ধ করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে ইমামদের প্রত্যাবর্তনের সুস্পষ্ট স্বীকৃতি। এই দুই ধাপ বিশ্বাসের ভিত্তি নির্মাণ করে—আর পরবর্তী দুই অংশে তার বাস্তব ফলাফল বর্ণিত হয়, যেন একটি নদী যা তার উৎস থেকে সমুদ্রে পৌঁছে।

“মুন্তাজিরুলি আমরিকুম”—অর্থাৎ আবির্ভাবের মুহূর্তে ঐশী আদেশের প্রতি সম্পূর্ণ আনুগত্যে প্রস্তুত থাকা, যেন একটি প্রহরী যা সর্বদা সতর্ক। কুরআনে “أمر الله” শব্দটি আবির্ভাবের অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে—যেমন সূরা নাহলের প্রথম আয়াতে: “أتى أمرُاللَّهِ فلا تَستَعجِلُوهُ”—“আল্লাহর নির্দেশ অবশ্যম্ভাবীভাবে এসে যাবে; তাতে ত্বরা করো না।” হাদিসে এসেছে—প্রথম যে ব্যক্তি কায়েম-এর সাথে বায়আত করবেন তিনি হবেন ফেরেশতা জিবরাইল, যিনি সাদা পাখির রূপে অবতীর্ণ হয়ে সমগ্র সৃষ্টিকে শুনিয়ে ঘোষণা করবেন: “أتى أمرُاللَّهِ فلا تَستَعجِلُوهُ।”

শেষাংশে “মুরতাকিবুন লিদাওলাতিকুম”—আহলে বাইতের বিশ্বব্যাপী ন্যায়ের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি গভীর প্রত্যাশার ঘোষণা। “মুরতাকিব” মানে এমন প্রতীক্ষা, যা নিছক অপেক্ষা নয়; বরং সচেতন প্রস্তুতি, তীক্ষ্ণ মনোযোগ ও কার্যকর অংশগ্রহণের মানসিকতা, যেন একটি তারা যা আকাশে জ্বলে ওঠে। এটি ঐশী প্রতিশ্রুত ন্যায়রাজ্যের নিশ্চিত আগমনে অটল বিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ।

সুতরাং জিয়ারাতে জামে-এর এই অংশটি ইমামত প্রসঙ্গে তিন স্তরের বিশ্বাসকে একসূত্রে গেঁথে উপস্থাপন করে—পুনরাগমনের মৌলিক বিশ্বাস, রাজ’আতের সুস্পষ্ট স্বীকৃতি এবং ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় সক্রিয় প্রতীক্ষা। বাস্তবে, ইমাম হাদী (আ.) এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর বাক্যে মাহদাবিয়াত-সম্পর্কিত সমগ্র বিশ্বাসযাত্রাকে অনুপম ভাষায় শিক্ষা দেন—যাতে যিয়ারাতকারী ব্যক্তি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের ইমামদের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের অবস্থান স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে পারে, যেন একটি আয়না যা আত্মার প্রতিফলন দেখায়।

আরও পড়ুন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button