কেন আমরা হাঁচি দিই — ইমাম রেজা (আ.)-এর ব্যাখ্যা
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির: ইমাম রেজা (আ.)হাঁচির রহস্যকে এক আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর মতে, হাঁচি কেবল শারীরিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং মানুষের জীবনে আল্লাহর নিয়ামতের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
যখন আল্লাহ মানুষকে কোনো নিয়ামত দান করেন আর সে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, তখন আল্লাহ শরীরে এক ধরণের বাতাস প্রবাহিত করেন। সেই বাতাস শরীর ঘুরে নাকে পৌঁছায় এবং মানুষ হাঁচি দেয়। হাঁচির পর যখন সে বলে “আলহামদুলিল্লাহ”, তখন আল্লাহ সেটিকে সেই নিয়ামতের শোকর হিসেবে গ্রহণ করেন।
অর্থ ও শিক্ষা
১.হাঁচি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শরীর সুস্থ আছে এবং আল্লাহর নিয়ামত আমাদের সঙ্গে রয়েছে।
২.এটি কৃতজ্ঞতার এক প্রাকৃতিক আহ্বান—যেন মানুষ ভুলে না যায়, প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসই আল্লাহর দান।
৩.হাঁচির পর “আলহামদুলিল্লাহ” বলা আসলে নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রতীক।
সামাজিক আদব
১.কেউ হাঁচি দিলে তাকে বলা উচিত: “ইয়ারহামুকাল্লাহ” (আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করুন)।
২.হাঁচি দেওয়া ব্যক্তি উত্তর দেবে: “ইয়াগফিরুল্লাহু লানা ওয়া লাকুম” (আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের ক্ষমা করুন)।
৩.তিনবার পর্যন্ত হাঁচি স্বাভাবিক ও উপকারী; এর বেশি হলে তা অসুস্থতার লক্ষণ, তখন বলা উচিত: “শাফাকাল্লাহ”(আল্লাহ তোমাকে সুস্থ করুন)।
ইসলামে হাঁচি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি
মানুষের সমাজে এমন বহু কুসংস্কার আজও বেঁচে আছে, যেগুলোর কোনো ধর্মীয় বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তারই একটি হলো—হাঁচিকে অশুভ মনে করা। অনেকেই মনে করেন, হাঁচি হলে কাজ থামিয়ে দেওয়া উচিত; নচেৎ কাজ সফল হয় না। অথচ ইসলামের আলোকে হাঁচি কখনোই অশুভ লক্ষণ নয়; বরং এটি শরীরের স্বাভাবিকতা, আরাম এবং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার একটি সুন্দর প্রকাশ।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে—হাঁচি শরীরকে প্রশান্তি দেয়, সুস্থতার ইঙ্গিত বহন করে। তিনবার পর্যন্ত হাঁচি উপকারী; তবে তা বারবার ও অনবরত হলে অসুস্থতার লক্ষণ হতে পারে। প্রচলিত যে ধারণা—হাঁচি দিলে কাজ থামিয়ে বসে থাকতে হবে—তার কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই।
রেওয়ায়েতে এসেছে, যখন কেউ হাঁচি দেয়, তখন সে বলবে:
“আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলে মুহাম্মাদ।”
আর তার পাশের ব্যক্তি দোয়া করবে:
“ইয়ারহামুকাল্লাহ।”
হাঁচিদাতা উত্তরে বলবে: “ইয়াগফিরুল্লাহু লানা ওয়া লাকুম।”
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—হাঁচি রোগীর জন্যও আরাম ও স্বস্তির নিদর্শন। ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর বর্ণনায় রয়েছে—যিনি হাঁচি দেন, আল্লাহ তাঁকে বহু বিপদ থেকে নিরাপদ রাখেন।
হাঁচির কারণ সম্পর্কে ইমাম রেজা (আ.)
ইমাম রেজা (আ.) বলেন—যখন মানুষ আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত লাভ করে অথচ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না, তখন আল্লাহ তার শরীরে এক ধরণের বাতাস প্রবাহিত করেন। তা নাক দিয়ে বের হয়ে আসে—এটাই হাঁচি। আর যখন সে বলে “আলহামদুলিল্লাহ”, আল্লাহ তা-ই তাঁর পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতার স্বীকৃতি হিসেবে কবুল করেন। তিনি আরও বলেন—যদি কেউ হাঁচি দেয়, তাকে বলো: “ইয়ারহামুকাল্লাহ।” যদি কেউ তোমাকে এ দোয়া বলে, উত্তর দাও: “ইয়াগফিরুল্লাহু লানা ওয়া লাকুম।”
তিনবার পর্যন্ত এটি বলা যায়; তার বেশি হলে বুঝতে হবে—ওটা অসুস্থতার লক্ষণ। তখন তাকে বলা উচিত: “শাফাকাল্লাহ”—আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করুন।
ইমাম (আ.) আরও ব্যাখ্যা করেন—
১.মুমিন হাঁচি দিলে বলো: “ইয়ারহামুকাল্লাহ।”
২.মুনাফিক হাঁচি দিলে বলো: “ইয়ারহামুকুমাল্লাহ।”
৩.নারী হাঁচি দিলে বলো: “আফাকিল্লাহ।”
৪.অসুস্থ হলে বলো: “শাফাকাল্লাহ।”
৫.দুঃখিত হলে বলো: “ফাররাজিকাল্লাহ।”
অতএব, হাঁচি কোনো অশুভ সংকেত নয়। বরং হাঁচির পর আল্লাহকে স্মরণ করো, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো—তারপর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাও। কুসংস্কারের অন্ধকারে নিজেকে বন্দি করে রেখো না।
আদম (আ.)-এর প্রথম হাঁচি
রেওয়ায়েতে এসেছে—আল্লাহ যখন আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করলেন এবং তাঁর মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করলেন, ঠিক তখনই তিনি হাঁচি দিলেন। তাঁকে অনুপ্রাণিত করা হলো উচ্চারণ করতে— আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। তিনি যখন এ স্তুতি করলেন, মহান আল্লাহ বললেন— “তোমার প্রতি তোমার প্রতিপালকের রহমত বর্ষিত হোক।
উৎস: ধর্মীয় প্রশ্নের জবাব প্রদানের জাতীয় কেন্দ্র



