জীবনযাপনধর্ম ও বিশ্বাসবিশেষ সংবাদবিশ্ব

জীবনের বাজারে প্রকৃত লাভ: সময়, দয়া ও সৎকর্ম

ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫

মিডিয়া মিহির: এই পৃথিবীকে যেন এক অপার বাজারের সাথে তুলনা করা যায়—যেখানে লেনদেনের মাধ্যম নয় অর্থের ঝলকানি বা বস্তুর ঝনঝনানি, বরং সময়ের অমূল্য ধারা এবং সুযোগের ক্ষণিক আলোক। যারা এখানে সত্যিকারের লাভবান হন, তারা শুধু ধন-দৌলতের পাহাড় গড়ে তোলেন না; বরং সময়কে সোনার ছোঁয়ায় রূপান্তরিত করেন, দয়ার নরম আলিঙ্গনে বিশ্বকে আলোকিত করেন এবং সৎকর্মের পথে নিজেকে অর্পণ করে অমরত্বের ছোঁয়া পান।

প্রতিদিনের প্রভাতে চোখ মেলে যখন আমরা উঠি, তখন যেন এক অনন্ত যাত্রার পথে পা রাখি—যেখানে অগণিত নির্বাচনের ফুলকি ছড়িয়ে থাকে, আলোর মতো ঝলমলে, কিন্তু ছায়ার মতো ধূসর। এই নির্বাচনগুলিই আমাদের জীবনের নকশা আঁকে, তারকার মতো দিকনির্দেশ দেয়। মূল রহস্য লুকিয়ে আছে এই বোঝায়: পৃথিবীর এই মায়াময় রূপটি কী সত্যিকারের অর্থ ধারণ করে, এবং কীভাবে তার সুযোগের ঝরনা থেকে পান করে আমরা অমৃতের স্বাদ পেতে পারি।

পৃথিবীকে কল্পনা করুন এক অসীম বাজার হিসেবে, যেখানে কেনাবেচা চলে না সোনা-রুপোর ওজনে বা পণ্যের গুণে, বরং সময়ের অদৃশ্য সুতোয় এবং সুযোগের ক্ষণিক ঝলকে। সকলে এখানে ব্যস্ত ক্রয়-বিক্রয়ে, কেউ হিসাবের নির্মম চোখে মাপে লাভের মিষ্টতা আর ক্ষতির তিক্ততা।

এই বাজারের বিজয়ীরা কেবল ধনী নন, তারা প্রকৃত লাভের রাজা—যারা সময়কে ফুলের পাপড়ির মতো সযত্নে খুলে তার সুগন্ধ ছড়ান, দয়ার নদী প্রবাহিত করে শুষ্ক হৃদয়কে সিক্ত করেন, এবং সৎকর্মের আলোয় নিজেকে আলোকিত রাখেন। তারা জানেন, সুযোগ যেন প্রজাপতির পাখা—ক্ষণস্থায়ী, তাই অর্থহীন ছায়ায় সময় নষ্ট করেন না; বরং ভবিষ্যতের মহল গড়তে সেই সময়কে অর্পণ করেন। বিপরীতে, ক্ষতিগ্রস্তরা অবহেলার কুয়াশায় ডুবে যান, অচেতনতার অন্ধকারে হারান পথ। তারা শক্তি ব্যয় করেন তুচ্ছ ফুলের পিছনে, লক্ষ্যহীন নদীর মতো দিন-রাত্রি ভেসে যান। যখন চোখ খোলে তাদের, দেখেন মূল্যবান রত্নগুলি হাতছাড়া হয়ে গেছে, ফেরার পথ বন্ধ।

এই বাজারে জয়ের গোপন মন্ত্র লুকিয়ে অন্তরের উদ্দেশ্যে এবং নীতির গভীরতায়। আমরা কি ক্ষণিকের ঝলকানি সংগ্রহের দৌড়ে নেমেছি, নাকি চিরকালীন চরিত্রের মন্দির গড়ার পথে? প্রতিটি কর্ম যেন একটি তারা, প্রতিটি কথা যেন একটি ঢেউ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেন একটি দরজা—লাভের আলোয় খোলে বা ক্ষতির অন্ধকারে বন্ধ হয়। প্রকৃত সফলতা জন্ম নেয় এই পার্থক্যের উপলব্ধিতে, যেন ফুল ফুটে তার সৌন্দর্য প্রকাশ করে।

জীবনের এই বাজার আসলে এক অপার সুযোগ—নিজেকে গড়ে তোলার, আত্মার পালিশ করার। প্রতিটি মুহূর্ত যেন নতুন একটি বীজ, সম্ভাবনার বাগানে ছড়ানো। আমাদের উচিত নয় এই মূল্যবান সময়কে অবহেলার ঝড়ে উড়িয়ে দেয়া। যদি সচেতনতার আলোয় নির্বাচন করি—কী কিনব (সুযোগের ফল আর মূল্যবোধের মধু) এবং কী বিক্রি করব না (নৈতিকতার শিকড় আর সময়ের সোনা)—তবে ক্ষতির ছায়া থেকে মুক্ত হয়ে এক সমৃদ্ধ, আলোকময় জীবন অর্জন করব।

এই ধারণার শিকড় গভীর, যেন প্রাচীন বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে—যেমন ইমাম হাদী (আ.)-এর বাণীতে:

 أَلدُّنیـا سـُوقٌ رَبِحَ فیها قَوْمٌ وَ خَسِرَ آخـَرُونَ. [تحف العقول، ص 774.

 দুনিয়া এক বাজার, যেখানে কেউ লাভবান হয় আর কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।(তাহফুল উকুল, পৃ. ৭৭৪)

এই বাণী যেন একটি দীপশিখা, মনে করিয়ে দেয় যে দুনিয়ার অবস্থান চিরস্থায়ী নয়; আমাদের কর্মই তার ছবি আঁকে। তাই সচেতনতার পথে চলুন, যাতে এই ক্ষণিক বাজারে সর্বোচ্চ মূল্যের রত্ন অর্জন করতে পারি—কারণ আজকের নির্বাচনই আগামীর আলোকিত দিনগুলির ভিত্তি স্থাপন করে।

আরও পড়ুন 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button