মুবাহেলার আয়াতের আলোকে—মিথ্যাবাদীদের পরিণতি কী?
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির:
সংক্ষিপ্ত উত্তর: সূরা আলে ইমরানের ৬১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে সম্বোধন করে বলেন—যখন সুস্পষ্ট জ্ঞান প্রাপ্তির পরও কেউ সত্য অস্বীকার করে তর্ক ও জেদে লিপ্ত হয়, তখন তাদেরকে মুবাহেলার আহ্বান জানাতে হবে এবং ঘোষণা করতে হবে যে আল্লাহর লানত বর্ষিত হোক মিথ্যাবাদীদের ওপর। এই আয়াতে ব্যবহৃত “আল্লাহর লানত মিথ্যাবাদীদের ওপর”—এই কঠোর ভাষা মিথ্যার ভয়াবহতা ও এর নৈতিক অপরাধের গভীরতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
বিস্তারিত উত্তর:
সূরা আলে ইমরানের ৬১ নম্বর আয়াত, যা “মুবাহেলার আয়াত” নামে পরিচিত, মূলত এক বিশেষ ধরনের মিথ্যার দিকে ইঙ্গিত করে—আর তা হলো আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর প্রতি মিথ্যা আরোপ করা। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা মিথ্যাবাদীদের ওপর সরাসরি লানতের ঘোষণা দিয়ে বিষয়টির ভয়াবহতা প্রকাশ করেছেন।
আয়াতে বলা হয়েছে—
﴿فَمَنْ حَاجَّكَ فِيهِ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَأَبْنَاءَكُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَكُمْ وَأَنْفُسَنَا وَأَنْفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَلْ لَعْنَةَ اللَّهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ﴾
অর্থাৎ—তোমার কাছে (ঈসা সম্পর্কে) জ্ঞান এসে যাওয়ার পরও যদি কেউ তোমার সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হয়, তবে তুমি বলো: এসো, আমরা আমাদের সন্তানদের ডাকি, তোমরাও তোমাদের সন্তানদের ডাকো; আমরা আমাদের নারীদের ডাকি, তোমরাও তোমাদের নারীদের ডাকো; আমরা নিজেদের ডাকি, তোমরাও নিজেদের ডাকো। তারপর আমরা মুবাহেলা করি এবং মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর লানত কামনা করি।
মুবাহেলা কী?
‘মুবাহেলা’ শব্দটি মূলত “বাহল” ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ—ছেড়ে দেওয়া বা আল্লাহর হাতে সোপর্দ করা। তাফসিরকারদের মতে, মুবাহেলা হলো এমন একটি পদ্ধতি যেখানে দুই পক্ষ কোনো ধর্মীয় সত্যের প্রশ্নে মুখোমুখি হয়ে একে অপরের ওপর আল্লাহর অভিশাপ কামনা করে। যাঁর দোয়া কার্যকর হয়, তিনিই সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত বলে বিবেচিত হন।ইসলামের প্রথম যুগে রাসূলুল্লাহ (সা.) ও নাজরানের খ্রিস্টানদের মধ্যে এই ঘটনার বাস্তব দৃষ্টান্ত রয়েছে। রাসূল (সা.) যখন তাঁর আহলে বাইত—হযরত আলী, হযরত ফাতিমা, ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (আ.)-কে সঙ্গে নিয়ে মুবাহেলার স্থানে উপস্থিত হন, তখন তাঁদের চেহারায় দোয়া কবুল হওয়ার আলামত দেখে নাজরানের খ্রিস্টানরা পিছিয়ে যায় এবং সংঘাতের পরিবর্তে সন্ধির পথ বেছে নেয়।
মিথ্যার পরিণতি
আয়াতে ব্যবহৃত বাক্য— “فَنَجْعَلْ لَعْنَةَ اللَّهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ” (“আমরা মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর লানত আরোপ করি”)
এই ঘোষণা শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনার বর্ণনা নয়; বরং এটি মিথ্যার নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পরিণতির এক গভীর সতর্কবার্তা। এখানে মিথ্যাকে এমন এক পাপ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা মানুষকে আল্লাহর রহমত থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং তাঁকে অভিশাপের যোগ্য করে তোলে।
উপসংহার
মুবাহেলার আয়াত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়—মিথ্যা, বিশেষত সত্য জেনেও তা অস্বীকার করা, আল্লাহর দৃষ্টিতে মারাত্মক অপরাধ। এর পরিণতি শুধু সামাজিক বা নৈতিক নয়; বরং তা আখিরাতের বিচারে আল্লাহর লানত ও রহমত-বিচ্ছিন্নতার দিকে নিয়ে যায়। তাই কুরআনের এই আয়াত সত্যবাদিতা, সততা ও ন্যায়নিষ্ঠতার পথে অটল থাকার এক শক্তিশালী আহ্বান।
পাদটীকা:
(১) বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে তাফসিরে নমুনা-তে। লেখক: নাসের মাকারেম শিরাজী; প্রকাশক: দারুল কুতুব আল-ইসলামিয়া, তেহরান, ১৩৭৪ হিজরি শামসি, প্রথম সংস্করণ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৫৭৮—সূরা আলে ইমরানের ৬১ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যার অধীনে।
(২) আখলাক দার কুরআন গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা পাওয়া যায়। লেখক: নাসের মাকারেম শিরাজী; সংকলন ও সম্পাদনা: একদল আলেম ও গবেষক; প্রকাশক: মাদরাসাতুল ইমাম আলী ইবন আবি তালিব (আ.), কোম, ১৩৭৭ হিজরি শামসি, প্রথম সংস্করণ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২২৬।



