নারী: শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির করুণা-ধারার মহিমান্বিত মাধ্যম
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির: মানুষের পরিপূর্ণতা শুধু ব্যবস্থাপনা, সংগ্রাম বা দায়িত্ববোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর গভীরতায় লুকিয়ে আছে আবেগের স্পর্শ, স্নেহের উষ্ণতা এবং মমতার অমোঘ আলিঙ্গন। আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলীর দৃষ্টিতে, এই আবেগীয় সম্পদ কেবলমাত্র মায়ের দুধের ধারা এবং তার কোমল আলিঙ্গনের মাধ্যমেই মানুষের সত্তায় প্রবাহিত হয়। শৈশবের প্রথম সাত বছরে মাতৃসান্নিধ্যের অভাব ধীরে ধীরে সমাজকে নির্দয়তার অন্ধকারে নিমজ্জিত করে, অনুভূতির আলোকে বিহীন করে তোলে।
হযরত আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলী তার এক বক্তব্যে মায়ের আবেগময় ভূমিকা এবং সমাজের শান্তি ও নৈতিক উন্নয়নে তার অসীম প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সন্তানের অস্তিত্বের সূচনায় মায়ের ভূমিকা মৌলিক এবং নির্ধারক। পবিত্র কুরআনের ভাষায় আল্লাহ বলেন:
يَخْلُقُكُمْ فِي بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ
অর্থাৎ, মানুষের সৃষ্টি ঘটে মায়ের গর্ভে—এই সত্যের মধ্যেই মাতৃত্বের অপার মহিমা প্রতিফলিত হয়।
তিনি আরও যোগ করেন যে, নারী যদি তার প্রকৃত মর্যাদা উপলব্ধি করতে পারেন, তাহলে তিনি বুঝবেন যে তিনি ‘আহসানুল মাখলুকাত’—সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম জীবের—প্রবাহপথ। মহান আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করার পর নিজেই বলেন:
فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ
অর্থাৎ, মানুষই সৃষ্টির মধ্যে সর্বোত্তম; তার চেয়ে উত্তম, সুন্দর বা পরিপূর্ণ কোনো সৃষ্টি নেই। এই ‘আহসানুল মাখলুকাত’-এর বিকাশ প্রধানত মায়ের আশ্রয়ে ঘটে—পিতার তুলনায় অনেকগুণ বেশি। নারীই হলেন প্রকাশ, প্রবাহ এবং অনুগ্রহের পথ, যার মাধ্যমে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব তার পরিপূর্ণতা লাভ করে। মাতৃগর্ভ কোনো পরীক্ষাগারের কাঁচের পাত্র নয়, যেখানে কেবল কোষের সমাহারে মানুষ জন্মায়। নুতফা, আলাকা, মুদগা, ভ্রূণ, অস্থি—মানব সৃষ্টির প্রতিটি ধাপে স্রষ্টার সমস্ত অনুগ্রহ মায়ের আত্মা এবং অস্তিত্বের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়।
এই কারণে নারীকে তার অস্তিত্বকে অবহেলা করা উচিত নয়। এমন কোনো কর্মব্যস্ততা, যা তাকে মাতৃত্বের এই অনন্য অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করে, আসলে আত্মবিস্মৃতির সমতুল্য। কারণ, মায়ের মর্যাদা এবং মাতৃত্বের স্নেহের কোনো বিকল্প নেই।
মাতৃত্বের মর্যাদা অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে আবেগ এবং মমতার সঙ্গে। মানুষের আবেগের প্রকাশ এবং গ্রহণের সত্যিকারের ক্ষেত্র হলো মায়ের কোল। শিশু এই মমতার বিদ্যালয়ে জীবনের প্রথম সাত বছরের শিক্ষা গ্রহণ করে। এই সময়ে মাতৃস্নেহের শূন্যতা কোনো কিছু দিয়ে—এমনকি উপদেশ দিয়েও—পূরণ করা যায় না।
যেসব শিশু এই সংবেদনশীল সময়ে ডে-কেয়ার বা অনুরূপ প্রতিষ্ঠানে বড় হয় এবং পিতামাতার উষ্ণ স্নেহ থেকে বঞ্চিত থাকে, তারা পরিণত বয়সে নিজেদের বৃদ্ধ বাবা-মাকে অনায়াসে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়। তারা কুরআনের এই মহান নির্দেশনাগুলোর বাস্তব প্রয়োগে ব্যর্থ হয়:
وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا وَاخْفِضْ لَهُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحْمَةِ وَقُل رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
ফলে, বৃদ্ধ বাবা-মা আশ্রয়কেন্দ্রে নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যান, আর সন্তান—যে শৈশবে মায়ের স্নেহ পায়নি—হয়তো বছরে একবার একটি ফুল দিয়ে তার দায়িত্ব সেরে নেয়।
আয়াতুল্লাহ জাওয়াদী আমুলী উপসংহারে বলেন, মানুষ যেমন ব্যবস্থাপনা, জিহাদ এবং দায়িত্ববোধের প্রয়োজন অনুভব করে, তেমনি গভীরভাবে প্রয়োজন আবেগ এবং মমতার। আর এই আবেগ কেবলমাত্র মায়ের দুধ এবং আলিঙ্গনের মাধ্যমেই সন্তানের সত্তায় সঞ্চারিত হয়। এই কারণে, তালাকপ্রাপ্ত হলেও সন্তানের হেফাজতের অধিকার মায়ের জন্য নির্ধারিত।
যদি একটি শিশু মায়ের কোলে তার প্রথম সাত বছরের ভালোবাসা এবং মমতার পাঠ সম্পন্ন করে, তাহলে সেই শিশুই ভবিষ্যতে একটি সহানুভূতিশীল, মানবিক এবং স্নেহময় সমাজ নির্মাণ করে।
সূত্র: তাফসিরে তাসনীম, খণ্ড ৬৯, পৃষ্ঠা ২৮৪–২৮৬।



