বিভেদের অন্ধকারে আলোর দিশারি: ইমাম বাকির (আ.) ও সচেতনতার দর্শন
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির: ইতিহাসের এক সংকটময় সময়ে, যখন ধর্ম, রাজনীতি ও চিন্তার বিভাজন সমাজকে খণ্ডিত করে ফেলেছিল, তখন ইমাম মুহাম্মদ বাকির (আ.) সংঘাতের ভাষা নয়—বোধের ভাষায় কথা বলেছিলেন। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সত্যিকার সংস্কার শুরু হয় মানুষের চেতনাকে জাগ্রত করার মধ্য দিয়ে; আর এই দর্শন আজও আমাদের সমাজের জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
হাওজা ইলমিয়্যা মাজান্দারানের শিক্ষার্থী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হুজ্জাতুল ইসলাম মিরি, ইমাম মুহাম্মদ বাকির (আ.)-এর শুভ জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এই সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধির সঙ্গে এক আলোচনায় অংশ নেন। আলোচনার সারাংশ নিচে তুলে ধরা হলো।
সচেতনতার ইমাম: ইতিহাসের পাঠ ও বর্তমানের প্রয়োজন
ইমাম মুহাম্মদ বাকির (আ.)-এর ইমামতির সময়কাল এমন এক অধ্যায়, যখন ইসলামি সমাজ কেবল রাজনৈতিক অস্থিরতায় নয়, বরং গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় বিভ্রান্তিতে আক্রান্ত ছিল। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিকৃতি, পরিকল্পিত বয়ান নির্মাণ এবং পরিচালিত অজ্ঞতা মানুষের বিশ্বাস ও চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করছিল। এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করে ইমাম বাকির (আ.) আবেগনির্ভর প্রতিক্রিয়া কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রিক সংঘাতে না গিয়ে বেছে নেন এক দীর্ঘমেয়াদি পথ—চেতনাগত পুনর্গঠন। যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যার মাধ্যমে তিনি এক স্থায়ী জ্ঞানভিত্তিক আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করেন।
আজকের সমাজে, যখন তথ্যের আধিক্য সত্যকে আড়াল করে এবং আবেগ যুক্তিকে ছাপিয়ে যায়, তখন ইমাম বাকির (আ.)-এর এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। তাঁর শিক্ষা আমাদের জানিয়ে দেয়—যদি সমাজ বিশ্লেষণী বোধে সমৃদ্ধ না হয়, তবে খাঁটি মূল্যবোধও একসময় বিভ্রান্তির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। তাই সচেতনতা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নিরাপত্তার অপরিহার্য শর্ত।
জ্ঞান যখন দায়িত্ববোধের সঙ্গে যুক্ত হয়
ইমাম বাকির (আ.)-এর দৃষ্টিতে জ্ঞান কখনোই নিরপেক্ষ বা মূল্যহীন নয়। জ্ঞান তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা সমাজ সংস্কার, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত হয়। তিনি এমন আলেম গড়ে তুলেছিলেন, যাঁদের জ্ঞান ছিল নৈতিক অঙ্গীকারে দৃঢ়। এর মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দেন—পথনির্দেশক জ্ঞান ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক জ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য কোথায়।
এই বার্তা আজ আরও তীব্রভাবে প্রযোজ্য। আধুনিক বিশ্বে যদি দক্ষতা, প্রযুক্তি, গণমাধ্যম ও ব্যবস্থাপনা নৈতিকতা ও ন্যায়বোধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তবে উন্নয়নও বৈষম্য ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়। ইমাম বাকির (আ.) আমাদের শেখান, প্রকৃত অগ্রগতি আসে তখনই, যখন যুক্তিবোধ ও মূল্যবোধের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা যায়।
বিভেদ নয়, বোঝাপড়া: ঐক্যের পথরেখা
ইমাম বাকির (আ.)-এর সময়ে সমাজ ছিল ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও চিন্তাগত মতভেদের ভারে নুয়ে পড়া। কিন্তু তিনি এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করেননি, আবার উসকেও দেননি। বরং ধর্মীয় যুক্তিবোধ, সংলাপ ও অভিন্ন মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে বিভেদ ব্যবস্থাপনার এক পরিণত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ঐক্য মানে পার্থক্য মুছে ফেলা নয়; বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সচেতন সংলাপের মধ্য দিয়ে একটি বৃহত্তর বোঝাপড়ায় পৌঁছানো। আজকের সমাজে যদি বিভাজনগুলো যুক্তিসম্মতভাবে পরিচালিত না হয়, তবে সেগুলো সহজেই অস্থিরতার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। ইমাম বাকির (আ.)-এর আদর্শ আমাদের সেই বিপদের আগাম সতর্কবার্তা দেয়।
জন্মবার্ষিকীর প্রাসঙ্গিকতা: আত্মসমালোচনার মুহূর্ত
ইমাম মুহাম্মদ বাকির (আ.)-এর শুভ জন্মবার্ষিকী কেবল স্মরণোৎসব নয়; এটি আমাদের জন্য একটি আয়নার মতো। এই উপলক্ষ আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়—আমরা কি মতভেদের মুখে জ্ঞান ও বোঝাপড়ার পথ বেছে নিচ্ছি, নাকি অজান্তেই বিভাজনকে আরও গভীর করছি?
ইমাম বাকির (আ.)-এর জীবন আমাদের শিক্ষা দেয়, সংকটের সময় আবেগ নয়—চিন্তা, শোরগোল নয়—সংলাপ, আর অন্ধ অনুসরণ নয়—সচেতনতা-ই সমাজকে আলোর পথে নিয়ে যায়।



