রজব: আত্মশুদ্ধি, ইবাদত ও আল্লাহর সঙ্গে গভীর সংযোগের মাস
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির: ইসলামি বর্ণনায় রজব এমন এক মহিমান্বিত মাস, যা ইবাদত, দোয়া, ইস্তিগফার ও নানাবিধ আধ্যাত্মিক আমলের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়কে আল্লাহ ও তাঁর ওলিয়াদের সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত করে। এই মাস আত্মিক উন্নতি ও নৈকট্যের এক বিরল সুযোগ নিয়ে আসে।
হাওজা ইলমিয়ার দারসে খারেজের শিক্ষক হুজ্জাতুল ইসলাম আহমদ আবেদি রজব মাসের মর্যাদা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই মাসের ফজিলত ও আমল সম্পর্কিত বহু হাদিসের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। তাঁর মতে, রজব এমন এক সময়, যা ইবাদত, দোয়া ও আধ্যাত্মিক সুযোগে পরিপূর্ণ এবং মানুষের সঙ্গে মহান আল্লাহর সম্পর্ককে গভীরতর করে।
বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, রজব মাসকে “আল্লাহর মাস” নামে অভিহিত করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মাফাতিহুল জিনান গ্রন্থসহ অসংখ্য হাদিসে এই অভিব্যক্তি পাওয়া যায়।
এছাড়াও বর্ণিত হয়েছে, আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) বলেছেন: রজব আমার মাস, আর শাবান রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মাস। বহু হাদিসে রজব মাসকে বিশেষভাবে হযরত আলী (আ.)-এর সঙ্গেও সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
তবে রজবকে আল্লাহর মাস, নবীর মাস কিংবা আমিরুল মুমিনিনের মাস—যেভাবেই দেখা হোক না কেন, প্রথমেই মনে রাখতে হবে যে রজব ইসলামের চারটি হারাম মাসের একটি।
এই মাস সম্পর্কে ব্যবহৃত একটি বিশেষ অভিধা হলো রজবুল আসাম্ম, অর্থাৎ ‘নীরব রজব’। এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এই মাসে যুদ্ধ, রক্তপাত, সংঘর্ষ ও সব ধরনের সহিংসতা নিষিদ্ধ ছিল। মানুষ অস্ত্র ও বর্ম নামিয়ে রাখত।
অর্থাৎ, এই সময়ে যুদ্ধের কোনো শব্দ শোনা যেত না, আর এই মাসে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া আরও গুরুতর পাপ হিসেবে গণ্য হতো।
কিছু বর্ণনায় আরও এসেছে, যেসব গুণ ও মর্যাদা লাইলাতুল কদর সম্পর্কে বলা হয়েছে, সেগুলোর কিছু রজব মাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বলা হয়েছে, এই মাসে এমন এক রাত রয়েছে যা সারা বছরের কোনো রাতের সঙ্গে তুলনীয় নয়; বরং তা সব রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। প্রবল সম্ভাবনায় সেটি রজবের ২৭তম রাত।
সওয়াব ও ইবাদতের দিক থেকে রজব মাস অসংখ্য আমল ও ফজিলতে সমৃদ্ধ।
যেমনটি রমজান মাসে এক হাজার রাকাত নফল নামাজের কথা বর্ণিত হয়েছে—যা আহলে সুন্নাতরা তারাবিহ হিসেবে আদায় করেন, যদিও শিয়া মাজহাবে তারাবিহ নেই—ঠিক তেমনি রজব মাসেও এক হাজার রাকাত নফল নামাজের কথা উল্লেখ রয়েছে।
তবে পার্থক্য হলো, রমজানের নফল নামাজগুলো সাধারণত একই কাঠামোর, কিন্তু রজব মাসের নামাজগুলো নির্দিষ্ট জিকির ও সূরা দ্বারা স্বতন্ত্র। উদাহরণস্বরূপ, রজবের প্রথম রাতে ৩০ রাকাত নফল নামাজের কথা বলা হয়েছে, যা দুই রাকাত করে আদায় করতে হয় এবং প্রতিটি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর ১২ বার সূরা ইখলাস পাঠ করতে হয়।
এছাড়াও এই মাসের বহু রাত ও দিনে বিশেষ নামাজ, নির্দিষ্ট সূরা ও জিকিরসহ বর্ণিত হয়েছে।
নামাজের পাশাপাশি রজব মাসে দোয়ার সংখ্যাও অত্যন্ত বেশি। এর মধ্যে রয়েছে আম্মে দাউদের আমল, ইতিকাফ, এবং এই মাসে ইমাম মাহদী (আ.) থেকে বর্ণিত বিশেষ দোয়াসমূহ। কিছু বর্ণনায় বলা হয়েছে, এত গুরুত্বপূর্ণ ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ দোয়া এমনকি রমজান মাসেও নেই।
এমনকি ইসলাম-পূর্ব জাহেলি যুগেও রজব মাসের একটি বিশেষ মর্যাদা ছিল। তখন দুই ব্যক্তির মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হলে একজন আরেকজনকে বলত: আমি তোমার বিরুদ্ধে রজব মাসে বদদোয়া করব।
অর্থাৎ, তারা এই মাসকে এতটাই প্রভাবশালী মনে করত যে, এতে করা দোয়া বা বদদোয়াকে অত্যন্ত কার্যকর ও ভাগ্যনির্ধারক বলে বিশ্বাস করত—তা কল্যাণের জন্য হোক বা অকল্যাণের জন্য।
হাদিস অনুযায়ী, রজব মাসে সকল ইমামের (আ.) জিয়ারত মুস্তাহাব। বিশেষভাবে ইমাম রেযা (আ.)-এর জিয়ারতের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, এবং অন্যান্য ইমামদের জিয়ারতও এই মাসে সুপারিশকৃত।
রজব মাসে রোজার গুরুত্বও অত্যন্ত বেশি। এই মাসের প্রতিটি দিনের জন্য আলাদা আলাদা সওয়াবের কথা বর্ণিত হয়েছে—প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত। এমনকি সপ্তম, অষ্টম ও নবম দিনের রোজা সম্পর্কেও বহু হাদিসে বিশেষ ফজিলতের উল্লেখ রয়েছে।
এই সব আমল ধর্মীয় মূল্যবোধের অংশ এবং পবিত্রতার অন্তর্ভুক্ত, কারণ এগুলো মানুষকে মহান আল্লাহ, নিষ্পাপ ইমামগণ (আ.) ও ঐশী ওলীয়াদের সঙ্গে সংযুক্ত করে। দোয়া, জিকির ও আধ্যাত্মিক সম্পর্ক মানবজীবনে গঠনমূলক ও গভীর প্রভাব ফেলে।
এর বিপরীতে, কেবল আকিদা ও ফিকহসংক্রান্ত জ্ঞানচর্চায় সীমাবদ্ধ থাকা—যদিও তা গুরুত্বপূর্ণ—কখনো কখনো মানুষকে আলেম ও মনীষীদের প্রতি অতিরিক্ত সমালোচনামুখী করে তোলে, যা হৃদয়ে এক ধরনের অন্ধকার ডেকে আনতে পারে। হাদিসে বলা হয়েছে:
“আল-ইলমু হুয়াল হিজাবুল আকবার”—অর্থাৎ, যদি জ্ঞান আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে যুক্ত না হয়, তবে সেটিই সবচেয়ে বড় পর্দায় পরিণত হতে পারে। এই অবস্থায় দোয়া ও জিকিরকে সেই পর্দা দূর করার উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
বিভিন্ন গ্রন্থে রজব মাসের দোয়া এবং সেগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। যেমন, মরহুম আয়াতুল্লাহ শুশতারীর আল-আখবারুদ দাখিলা গ্রন্থে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পাওয়া যায়।
আহলে সুন্নাতদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কেও বলা হয়েছে, সাধারণত তাদের মধ্যে শিয়াদের মতো ব্যাপক দোয়ার প্রচলন নেই; বরং তারা অধিকাংশ সময় কুরআন তিলাওয়াত করেন। এর একটি কারণ হিসেবে কিছু ক্ষেত্রে তাদের জাবরিয়াত্ত্বের বিশ্বাসকে উল্লেখ করা হয়েছে, যা দোয়ার ভূমিকা সীমিত করে।
তবে আল-আযকার (কুরতুবি) প্রভৃতি গ্রন্থে আহলে সুন্নাতদের মধ্যেও রজব মাসের বহু দোয়ার উল্লেখ রয়েছে এবং এই মাসের ইস্তিগফারের ভাণ্ডার অত্যন্ত সমৃদ্ধ।
অতএব, রজব মাসের জিকির ও দোয়া নিঃসন্দেহে ধর্মীয় মূল্যবোধের অংশ এবং সেগুলোর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া উচিত।
এছাড়াও বর্ণিত হয়েছে, হযরত খাদিজা (সা.) নবুয়তের পূর্বে, যখন রাসূলুল্লাহ (সা.) হেরা গুহায় ইবাদতের উদ্দেশ্যে ইয়াতাহান্নাস—অর্থাৎ নির্জন সাধনায়—লিপ্ত থাকতেন, তখন তিনি রাতে ঘরের দরজা বন্ধ করে ভোর পর্যন্ত জিকির ও ইবাদতে মগ্ন থাকতেন।
এই বর্ণনা প্রমাণ করে যে জিকির ও ওয়ার্দ শুধু ইসলামের মধ্যেই নয়, বরং নবুয়তের আগেও তাঁদের জীবনে প্রচলিত ছিল। সাধারণভাবে, যে দোয়া বা আয়াত মানুষ নিয়মিত পাঠ করে, তাকে ওয়ার্দ বলা হয়। সব মিলিয়ে, রজবকে বলা যায়— জিকিরের মাস, ওয়ার্দের মাস, ইস্তিগফারের মাস এবং নফল নামাজের মাস।



