জীবনযাপনধর্ম ও বিশ্বাসবিশেষ সংবাদবিশ্বহাদিস

হযরত আলী (আ.)-এর ফজিলত সম্পর্কে আনাস ইবনে মালিকের সাক্ষ্য

ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫

মিডিয়া মিহির: রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর সাহাবিদের মধ্যে অনেকেই হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (আ.)-এর অসামান্য মর্যাদা ও ফজিলত প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তা নির্ভরযোগ্যভাবে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে আনাস ইবনে মালিকের বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তিনি শুধু নবীজীর ভাষ্যে আলীর (আ.) মহিমা বর্ণনা করেননি; বরং নিজের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আলোকে আলীর (আ.) অবস্থান ও মর্যাদার কথা অকপটে তুলে ধরেছেন।

বিস্তারিত:

রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর বহু সাহাবি আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর ফজিলত সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের অন্যতম আনাস ইবনে মালিক। তিনি বলেন—

নবী করিম ﷺ একবার আমাকে আবু বরযা আসলামীর কাছে পাঠালেন। আমরা একসঙ্গে নবীজীর দরবারে উপস্থিত হলে আমি শুনলাম, তিনি আবু বরযাকে বলছেন—

হে আবু বরযা! বিশ্বজগতের প্রতিপালক আলী ইবনে আবি তালিব সম্পর্কে আমার সঙ্গে এক অঙ্গীকার করেছেন। তিনি বলেছেন—আলী হেদায়াতের পতাকা, ঈমানের নিদর্শন, আমার ওলিদের ইমাম এবং আমার সকল অনুসারীর আলো। হে আবু বরযা! কিয়ামতের দিন আলী ইবনে আবি তালিব হবেন আমার পতাকাবাহক এবং আমার প্রতিপালকের রহমতের ভাণ্ডারের চাবিগুলোর আমিন।

অন্য এক স্থানে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

হে আলী! তুমি মুসলমানদের নেতা, মুত্তাকিদের ইমাম, উজ্জ্বলমুখদের অগ্রদূত এবং মুমিনদের শ্রেষ্ঠ।

আনাস ইবনে মালিক আরও বর্ণনা করেন— রাসূলুল্লাহ ﷺ একদিন তাকে বললেন, হে আনাস! আমার জন্য ওজুর পানি নিয়ে এসো।” নবী ﷺ ওজু করলেন, দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন, তারপর বললেন—

হে আনাস! এই দরজা দিয়ে যে প্রথম প্রবেশ করবে, সে হবে আমিরুল মুমিনিন, মুসলমানদের নেতা এবং উজ্জ্বলমুখদের অগ্রদূত।

আনাস বলেন, আমি মনে মনে দোয়া করলাম—হে আল্লাহ! তিনি যেন আনসারদের কেউ হন। আমি এই ইচ্ছা গোপন রাখলাম। হঠাৎ করেই হযরত আলী (আ.) প্রবেশ করলেন। নবী ﷺ জিজ্ঞেস করলেন—

হে আনাস! ঐ ব্যক্তি কে? আমি বললাম—“তিনি আলী (আ.)।

নবী ﷺ আনন্দে উঠে দাঁড়ালেন, তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, নিজের মুখ তাঁর মুখের সঙ্গে লাগালেন এবং আলীর (আ.) ঘামের স্পর্শ নিজের মুখে লাগালেন।

আলী (আ.) বললেন— হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমার সঙ্গে এমন আচরণ করছেন, যা আগে কখনো করেননি! নবী ﷺ বললেন— আমি কেন তা করব না? তুমি আমার পক্ষ থেকে আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দাও, আমার বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দাও এবং আমার পরে তাদের মতভেদগুলোর ব্যাখ্যা করো।

এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ আরও বললেন—

হে আলী! তুমি আমার স্থলাভিষিক্ত। তোমার কথা আমার কথা, তোমার আদেশ আমার আদেশ। তোমার আনুগত্য আমার আনুগত্য, আর আমার আনুগত্য আল্লাহর আনুগত্য। তোমার অবাধ্যতা আমার অবাধ্যতা, আর আমার অবাধ্যতা আল্লাহর অবাধ্যতা।

আনাস ইবনে মালিক বলেন— আমি নবীজীর কাছে আলী ইবনে আবি তালিবের মতো মর্যাদাবান কাউকে দেখিনি। বহু রাতে নবী ﷺ আমাকে পাঠাতেন তাঁকে ডেকে আনতে; তিনি ভোর পর্যন্ত আলীর সঙ্গে একান্তে থাকতেন। নবী ﷺ দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়া পর্যন্ত আলীর অবস্থান তাঁর কাছে এমনই ছিল।

আরেক বর্ণনায় উসমান ইবনে মুতাররিফ বলেন— এক ব্যক্তি আনাস ইবনে মালিককে আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে আনাস বলেন—

আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যখনই আমাকে আলী (আ.) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে, আমি কোনো হাদিস গোপন করব না। কারণ কিয়ামতের দিন আলী (আ.) হবেন মুত্তাকিদের অগ্রনায়ক। আল্লাহর কসম! আমি এ কথা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছ থেকে শুনেছি।

উপসংহার:

আনাস ইবনে মালিকের বর্ণনাগুলো শুধু হযরত আলী (আ.)-এর ফজিলতের দলিল নয়; বরং নবী করিম ﷺ–এর কাছে তাঁর অনন্য অবস্থান ও নেতৃত্বের সুস্পষ্ট সাক্ষ্য। এই সাক্ষ্যগুলো ইসলামের ইতিহাসে আলীর (আ.) মর্যাদা ও ভূমিকার এক উজ্জ্বল দলিল হয়ে আছে।

পাদটীকা ও তথ্যসূত্র

(১) তারিখে বাগদাদ গ্রন্থে «رحمت» শব্দের পরিবর্তে «جنّت» শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে—যা বর্ণনার পাঠভেদ নির্দেশ করে।

(২) এই বর্ণনাটি এসেছে—হিল্যতুল আওলিয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৬৬;তারিখে দামেস্ক, খণ্ড ৪২, পৃষ্ঠা ৩৩০, হাদিস ৮৮৯২;
তারিখে বাগদাদ, খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ৯৯, হাদিস ৭৪৪১ (এখানে «رحمة»-এর স্থলে «جنة» শব্দ রয়েছে);আল-মানাকিব (খারেজমি), পৃষ্ঠা ৩১১, হাদিস ৩১১;আল-ফিরদৌস, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৬৭, হাদিস ৮৪৫৮—ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে;এবং কিফায়াতুল তালিব, পৃষ্ঠা ২১৫।

(৩) এই হাদিসটি উদ্ধৃত হয়েছে—মানাকিব (ইবনে মাগাজিলি), পৃষ্ঠা ৬৫, হাদিস ৯৩;মানাকিব (খারেজমি), পৃষ্ঠা ২৯৫, হাদিস ২৮৭;আল-ইয়াকিন, পৃষ্ঠা ৪৯০, হাদিস ১৯৭—যেখানে «المؤمنين»-এর পরিবর্তে «الدين» শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।উক্ত সব বর্ণনা আহমদ ইবনে আমির আত-তায়ী থেকে, তিনি ইমাম রেজা (আ.)-এর মাধ্যমে তাঁর পিতৃপুরুষদের সূত্রে বর্ণনাকরেছেন। এছাড়া এসেছে—সহিফা-ই ইমাম রেজা (আ.), পৃষ্ঠা ৯৫, হাদিস ২৯;আল-আমালি (শেখ তুসি), পৃষ্ঠা ৩৪৫, হাদিস ৭১০—দাউদ ইবনে সুলাইমান আল-গাজির সূত্রে।

(৪) এই ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়—তারিখে দামেস্ক, খণ্ড ৪২, পৃষ্ঠা ৩৮৬, হাদিস ৮৯৯৪;হিল্যতুল আওলিয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৬৩ (এখানে «لِكَرَامَتِي»-এর স্থলে «بِكَرَامَتِي» এসেছে);আল-ফিরদৌস, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৬৪, হাদিস ৮৪৪৯;কিফায়াতুল তালিব, পৃষ্ঠা ২১১;মানাকিব (খারেজমি), পৃষ্ঠা ৮৫, হাদিস ৭৫;ফারায়েদুস সামতাইন, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৪৫, হাদিস ১০৯;তাফসিরুল আইয়্যাশি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২৬২, হাদিস ৩৯ (অর্থগত সাদৃশ্যসহ);আল-ইয়াকিন, পৃষ্ঠা ১৬৭, হাদিস ২৬;মানাকিব (ইবনে শাহর আশুব), খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৪৮;কাশফুল গুম্মা, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১১৪;মানাকিব (কুফি), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৯১, হাদিস ৩১৩; পৃষ্ঠা ৩১২, হাদিস ২৩২; পৃষ্ঠা ৪৩০, হাদিস ৩৩৫;এবং আল-মুস্তারশিদ, পৃষ্ঠা ৬০১, হাদিস ২৭২।

(৫) মান লা ইয়াহযুরুহুল ফকিহ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৭৯, হাদিস ৫৪০৫—ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত।

(৬) আল-আমালি (শেখ তুসি), পৃষ্ঠা ২৩২, হাদিস ৪১১;
এবং মানাকিব (ইবনে শাহর আশুব), খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২২৭।

(৭) শরহে নাহজুল বালাগা, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৭৪।

(৮) সংগৃহীত গ্রন্থ:দানেশনামা-ই আমিরুল মুমিনিন —লেখক: মুহাম্মদ মুহাম্মদি রে শাহরি,প্রকাশক: দারুল হাদিস প্রকাশনা সংস্থা,প্রথম সংস্করণ, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৪১ এবং খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৪৮৩।

আরও পড়ুন 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button