মানুষের বিপদের মূল: রবের প্রতি ভুল ধারণা ও জীবনের উদ্দেশ্যকে সঠিকভাবে না বোঝা
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির: হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন হুসাইন আনসারিয়ান কুরআনের আয়াতসমূহ এবং আহলে বাইতের(আ.)রিওয়ায়াতসমূহের আলোকে ব্যাখ্যা করিয়াছেন যে মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক বিপদের অধিকাংশই আল্লাহর ইচ্ছাজনিত নহে; বরং মানুষের নিজস্ব আচরণ, রবের-ধারণা এবং জীবনের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গির ফলস্বরূপ। প্রকৃত সৌভাগ্য নিহিত রহিয়াছে দৃষ্টিভঙ্গির সংশোধনে, মানুষের অধিকার পালনে, অনাথ ও দরিদ্রের প্রতি মমত্বে এবং ধনের দাসত্ব হইতে মুক্তিলাভে। তিনি ইমাম আলী (আ.)-এর রিওয়ায়াত এবং সূরা ফজরের আয়াতসমূহের ব্যাখ্যার মাধ্যমে এই সত্য উন্মোচন করিয়াছেন এবং মানুষকে অন্তর্দৃষ্টি, আত্মসমালোচনা ও পরকাল-চিন্তার দিকে আহ্বান করিয়াছেন।
হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন আনসারিয়ান—যিনি হাওজা ইলমিয়ার অধ্যাপক—গত বৃহস্পতিবার আয়াতুল্লাহ আলভী তেহরানির হুসাইনিয়ায় অনুষ্ঠিত নৈতিকতার অধিবেশনে কুরআন ও আহলে বাইতের(আ.)রিওয়ায়াত সমূহের ভিত্তিতে মানুষের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্যের মূলসূত্র ব্যাখ্যা করিয়া বলেন: মানুষের অধিকাংশ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক সংকট আল্লাহর ইচ্ছা নহে; বরং আল্লাহ, বিশ্ব ও জীবনের প্রতি মানুষের ভুল দৃষ্টিভঙ্গির পরিণাম।
তিনি আমীরুল মুমিনীন আলী(আ.)-এর এক গুরুত্বপূর্ণ রিওয়ায়াত উল্লেখ করিয়া বলেন: ইমাম আলী(আ.)মানুষের সম্মুখে তিনটি পথ স্থাপন করিয়াছেন এবং ঘোষণা করিয়াছেন যে যে ব্যক্তি—নারী বা পুরুষ, বৃদ্ধ বা যুবক—যে কোনো যুগে এই তিন পথ অতিক্রম করিবে, সে সৌভাগ্যবান হইবে: «ثلاثٌ من فُضیٰ علیها سَعِد»। এই সৌভাগ্যের কেন্দ্রবিন্দু হইল মানুষের জীবন ও তার ঘটনাবলীর প্রতি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি।
অধ্যাপক আনসারিয়ান আরও বলেন: মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি হয় ইতিবাচক, নয়তো নেতিবাচক। ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কেবল কুরআন ও আহলে বাইতের(আ.)রিওয়ায়াতের আলোতেই অর্জনীয়। যে ব্যক্তি কুরআনের সঙ্গে জীবন যাপন করে, সে কঠিনতম অবস্থাতেও আল্লাহকে অভিযুক্ত করে না এবং বিশ্বকে শত্রু মনে করে না। কিন্তু যে কুরআন হইতে দূরে সরে যায়, সামান্য চাপেই সে রব, বিশ্ব ও নিজের প্রতি নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে।
তিনি সূরা ফজরের আয়াতসমূহের ব্যাখ্যায় বলেন: কুরআন মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির এক উজ্জ্বল উদাহরণ উপস্থাপন করিয়াছে। যে ব্যক্তি বহু বছর সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে কাটাইবার পর হঠাৎ সংকটে পতিত হয়, সে নিজের আচরণ সংশোধনের পরিবর্তে আল্লাহকে অভিযুক্ত করিয়া বলে: «ربی اهانن»—“আমার প্রভু আমাকে অপমানিত করিয়াছেন।” অথচ আল্লাহ তৎক্ষণাৎ উত্তর দিয়াছেন: «کلا»—“এ বিচার মিথ্যা; এ অভিযোগ ভিত্তিহীন।”
তিনি জোর দিয়া বলেন: আল্লাহ ঘোষণা করিয়াছেন যে আমি আমার বান্দাদের অপমান বা ধ্বংসের জন্য সৃষ্টি করি নাই। যদি কষ্ট আসে, তাহার মূল অন্যত্র। সমস্যা রবের নহে; সমস্যা মানুষের আচরণ, দৃষ্টিভঙ্গি ও নির্বাচনের ফল।
হুজ্জাতুল ইসলাম আনসারিয়ান আরও বলেন: কুরআন বিশ্বকে এক সচেতন সত্তা হিসেবে পরিচয় করাইয়াছে—যে বোঝে, অনুভব করে এবং মানুষের আচরণের প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায়। যখন মানুষ অত্যাচার করে, অধিকার গ্রাস করে, উদাসীন হয়—এই আচরণ তার জীবনে গ্রন্থি, অচলাবস্থা ও চাপের রূপে প্রতিফলিত হয়।
তিনি কুরআনের ভূমিকা ব্যাখ্যা করিয়া বলেন: কুরআন সমস্যার সমাধানের চাবিকাঠি—ব্যক্তিগত, পারিবারিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সকল সমস্যার। কিন্তু মানুষ এই চাবির দিকে না গিয়া সহজ পথ বেছে নেয়: আল্লাহকে অভিযুক্ত করা।
তিনি আয়াতুল্লাহ উলযমা বুরুজার্দী(রহ.)-র একটি স্মৃতি উল্লেখ করিয়া বলেন: এক ধার্মিক ব্যবসায়ী, যিনি হারাম বা সুদে লিপ্ত ছিলেন না, অর্থনৈতিক অচলাবস্থায় পতিত হইয়া আয়াতুল্লাহ বুরুজার্দীর নিকট অভিযোগ করেন। তিনি বলেন: তোমার ধনের খুমস প্রদান কর।ব্যবসায়ী বলেন:আমার কিছুই অবশিষ্ট নাই।কিন্তু মারজা জোর দেন। তিনি খুমস প্রদান করিলে এক বছর পর ফিরে আসিয়া বলেন:আমার জীবন শুধু চলিতেছে নহে, বরং উন্নতিও হইয়াছে।” আয়াতুল্লাহ বুরুজার্দী বুঝিয়াছেন—সমস্যা ছিল ইমাম যামান (আ.)-এর অধিকারের প্রতি অবহেলা; যখন আল্লাহর ওলীর হৃদয় সন্তুষ্ট হইল, জীবনের গ্রন্থি খুলিয়া গেল।
তিনি সূরা ফজরের আয়াতসমূহ ব্যাখ্যা করিয়া বলেন: আল্লাহ মানুষের ধ্বংসের চার কারণ উল্লেখ করিয়াছেন— ১. অনাথকে সম্মান না করা, ২. দরিদ্রকে খাদ্য প্রদানে উদাসীনতা, ৩. অন্যের উত্তরাধিকার গ্রাস, ৪. ধনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি—«و تحبون المال حباً جمّا»।
তিনি বলেন: তোমরা ধনের প্রতি এমন আসক্ত হইয়াছ যে হৃদয়ে আল্লাহ, নবী, আহলে বাইত(আ.)ও সৎকর্মের জন্য কোনো স্থান রাখ নাই। পরে যখন এই আচরণের ফল সংকটের রূপে প্রকাশ পায়, তখন আল্লাহকে অভিযুক্ত কর।
তিনি আরও বলেন: আল্লাহ প্রশ্ন করেন—“আমি কি তোমাকে অপমানিত করিয়াছি, না তোমরাই নিজের আচরণে নিজেকে ধ্বংস করিয়াছ?আমি কি তোমার জীবন নষ্ট করিয়াছি, না তোমরাই অত্যাচার ও অন্যায়ের মাধ্যমে বিশ্বকে তোমাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় করিয়াছ?
অধ্যাপক আনসারিয়ান আয়াত «ما أصابک من حسنة فمن الله و ما أصابک من سیئة فمن نفسک» উল্লেখ করিয়া বলেন: মানুষের নিকট যে কল্যাণ আসে, তাহা আল্লাহর পক্ষ হইতে; আর যে অকল্যাণ আসে, তাহা মানুষের নিজের কর্মফল। যে ব্যক্তি এই মানদণ্ডে জীবন সাজায়, সে অচলাবস্থায় পতিত হয় না।
তিনি বলেন:কুরআন মানুষকে ক্ষণস্থায়ী দৃষ্টিভঙ্গি হইতে মুক্ত করে; কুরআন মানুষকে ভবিষ্যত্মুখী ও পরকালমুখী করে। প্রকৃত মুমিন শুধু ঈমান রাখে না; পরকালের প্রতি নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে—«و بالآخرة هم یوقنون»।
তিনি যোগ করেন:আল্লাহ হযরত মূসা (আ.)-কে নবুয়তের শুরুতেই সতর্ক করিয়াছেন—কিয়ামত অবশ্যম্ভাবী; কেউ যেন তোমাকে পরকালের নিশ্চিততা হইতে বিচ্যুত না করে। কারণ পরকালহীনতা ধ্বংসের মূল।
তিনি বলেন: নবী ও ওলীরা সমস্যার মানুষ ছিলেন, কিন্তু সেই সমস্যাসমূহ ছিল অন্যদের আরোপিত; তাঁহারা নিজেরা সমস্যার কারণ হন নাই। ইমাম হুসাইন (আ.)পরকালীন দৃষ্টিভঙ্গির পূর্ণ উদাহরণ, যাঁহার প্রভাব ইতিহাস, বিবেক ও স্বাধীনতাকামী আন্দোলনে ক্রমশ উজ্জ্বলতর হইতেছে।
শেষে তিনি বলেন: কুরআনে কিয়ামত, বারজাখ ও মানুষের পরিণতি সম্পর্কে প্রায় সহস্র আয়াত রহিয়াছে। যে ব্যক্তি পরকাল-চিন্তা করে, সে দুর্ভাগ্যবান হয় না। সৌভাগ্য নিহিত খোদায়ী দৃষ্টিভঙ্গিতে, মানুষের অধিকার পালনে, অনাথ ও দরিদ্রের প্রতি যত্নে এবং ধনের দাসত্ব হইতে মুক্তিলাভে—যে পথ আমীরুল মুমিনীন আলী(আ.)মানুষের সম্মুখে স্থাপন করিয়াছেন।



