হযরত ফাতেমা (সা.আ.)-র মুসহাফের সঠিক লেখা নির্ধারণের কাজটি কারা সম্পন্ন করেছিলেন?
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির: হযরত ইমাম রেযা (আ.) ইরশাদ করেছেন: “এই মুসহাফই ইমামের নিদর্শন। যেমন ইমামতের সূর্য যখন আকাশে উদিত হয়, তখন তার নূর, তার করামত ও তার ফযিলতই তার পরিচয় বহন করে— ঠিক তেমনি হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-র মুসহাফও ইমামতের একটি জ্বলন্ত আলামত, একটি চিরন্তন চিহ্ন। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর যখন যাহরা (সা.আ.)-র হৃদয় দুঃখ-সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছিল, তখন আসমান থেকে নেমে এলো সেই পবিত্র পত্র—যা তাঁর চোখের অশ্রু মুছে দিত, অন্তরকে শীতল করত এবং ভবিষ্যতের আলো দেখাত।
মুসহাফের উৎস: চারটি আলোকবর্তিকা
প্রাচীন ও বিশুদ্ধ সূত্রসমূহে এই মুসহাফের উৎপত্তি নিয়ে চারটি মহিমান্বিত বর্ণনা পাওয়া যায়:
১. সাক্ষাৎ দৈব-প্রেরণা ইমাম সাদিক (আ.) ইরশাদ করেছেন: আল্লাহ তা‘আলা নিজেই হযরত যাহরা (সা.আ.)-র প্রতি এই বাণীসমূহ প্রেরণ করেছিলেন—যেন তাঁর হৃদয়ে প্রশান্তির ফল্গু বইতে থাকে। এটিই সর্বোচ্চ ও সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত।
২. ফেরেশতার সান্ত্বনা কতক রেওয়ায়েতে এসেছে, একজন ফেরেশতা নিয়োজিত ছিলেন হযরতের সেবায়। তিনি এসে এসে মধুর স্বরে বাণী পাঠ করতেন, যেন দুঃখের আগুনে শীতল স্নিগ্ধতা বর্ষিত হয়। ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন, “এই ফেরেশতা ছিলেন তাঁর জন্য সান্ত্বনাকারী।
৩. জিবরাইল আমিন (আ.)-এর আগমন অনেক বিশ্বস্ত সূত্রে বর্ণিত: স্বয়ং জিবরাইল আমিন নেমে আসতেন এবং বাণী পাঠ করতেন। হযরত আলী (আ.) সেই বাণী লিখে রাখতেন। যিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে ওহী নিয়ে আসতেন, তিনিই এখন বাতুলের কাছে সান্ত্বনা ও ভবিষ্যৎ-সংবাদ নিয়ে আসতেন। এ এক অপরূপ সম্মান!
৪. নবী করিম (সা.)-এর স্বয়ং কণ্ঠ কতক রেওয়ায়েতে এসেছে: স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) জীবিত থাকতেই এই বাণীসমূহ তাঁর প্রিয় কন্যাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন, যেন তিনি চলে গেলেও তাঁর কণ্ঠ যেন যাহরা (সা.আ.)-র কানে বাজতে থাকে।
এই চারটি পথই শেষ পর্যন্ত একই আলোর দিকে নিয়ে যায়: এই মুসহাফ ছিল সম্পূর্ণ আসমানী, আধ্যাত্মিক ও ইলহামী।
মুসহাফের বিষয়বস্তু: এই পবিত্র পত্রে কী ছিল?
১.গভীর হেকমত ও জ্ঞানের মণি-মুক্তা
২.ভবিষ্যতের খবর ও ঘটনাবলী
৩.হযরত যাহরা (সা.আ.)-র হৃদয় শান্ত করার মতো প্রশান্তিময় বাণী
৪.আধ্যাত্মিক উপদেশ ও আসমানী সান্ত্বনা
হযরত আলী (আ.) নিজ হাতে এগুলো লিখতেন। কিছু রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে, এতে ফিকহ বা শরয়ী আহকামও ছিল—কিন্তু অধিকাংশ মুহাক্কিক এ মত গ্রহণ করেন না। কারণ যাহরা (সা.আ.)-র জন্য আলাদা কোনো ফিকহের প্রয়োজন ছিল না; তিনি তো নিজেই ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জ্ঞানের প্রধান দুয়ার।
একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা: এই মুসহাফে কুরআনের একটি আয়াতও ছিল না। এটি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা, সম্পূর্ণ আসমানী, কিন্তু কুরআন নয়। এটি ছিল যাহরা (সা.আ.)-র জন্য আল্লাহর বিশেষ উপহার—যেন তিনি যখনই পড়বেন, তখনই আসমানী সান্ত্বনা তাঁর বক্ষে নেমে আসবে।
মুসহাফের জন্ম–কাহিনী
ইমাম জা‘ফর সাদিক (আ.)-এর পবিত্র যবান থেকে আল-কাফী গ্রন্থে একটি হৃদয়স্পর্শী রেওয়ায়েত এসেছে:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর হযরত ফাতেমা (সা.আ.) মাত্র পঁচাত্তর দিন এই দুনিয়ায় ছিলেন। এই সংক্ষিপ্ত সময়টি ছিল অকথ্য দুঃখের, এমন ভারী বিষাদের যে তাঁর পবিত্র হৃদয় যেন প্রতি মুহূর্তে ভেঙে পড়ছিল।
ঠিক সেই কঠিন দিনগুলোতে জিবরাইল আমিন (আ.) বারবার নেমে আসতেন। তিনি এসে যাহরা (সা.আ.)-র কানে মধুর স্বরে ফিসফিস করে বলতেন:
১.তোমার পিতার আসমানী মর্তবা কত উচ্চ!
২.বেহেশতে তিনি কেমন শান্তিতে আছেন!
৩.তাঁর নূর তোমার সন্তানদের মাঝে চলতে থাকবে, তাঁর রিসালাত তোমার বংশে জারি থাকবে…
এই সান্ত্বনার বৃষ্টিতে যাহরা (সা.আ.)-র চোখের অশ্রু শুকিয়ে যেত। আর আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.) জিবরাইলের প্রতিটি কথা লিখে রাখতেন। এই লেখাগুলোই একত্রিত হয়ে হয়ে উঠল মুসহাফে ফাতেমা (সা.আ.)।
অতএব, এই মুসহাফ কোনো সাধারণ গ্রন্থ নয়—এ হলো এক মহারানীর অশ্রু মোছার আসমানী রুমাল, এক কন্যার জন্য পিতার অমর সান্ত্বনা, এক বিধবার জন্য আল্লাহর বিশেষ দয়ার দলিল।
ইমামতের জ্বলন্ত নিদর্শন
হযরত ইমাম রেযা (আ.) ইরশাদ করেছেন: “هذا المصحف علامة الإمام” “এই মুসহাফই ইমামের আলামত।
যেমন ইলমে লাদুন্নী, ফযিলত ও করামত ইমামের পরিচয় বহন করে— ঠিক তেমনি এই মুসহাফের অধিকারও ইমামতের একটি স্পষ্ট চিহ্ন। শিয়া ইতিহাস ও আকিদা সর্বদাই বিশ্বাস করে যে, এই পবিত্র পত্র ইমাম থেকে ইমামের কাছে প্রজন্মান্তরে হস্তান্তরিত হয়েছে এবং আজ তা সংরক্ষিত আছে স্বয়ং হযরত বাকিয়াতুল্লাহিল আ‘যাম (আরওয়াহুনা লাহুল ফিদা)-এর পবিত্র হাতে। যেদিন যমানার সূর্যোদয় হবে, সেদিন আল্লাহর ইচ্ছায় এর কিছু অংশ বিশ্বের সামনে প্রকাশিত হবে।
এর আয়তন ও বিষয়বস্তু
ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন: “মুসহাফে ফাতেমা (সা)-র আয়তন কুরআনের তিন গুণ।
এর অর্থ এ নয় যে এতে আরও আয়াত বা আহকাম আছে। বরং এতে রয়েছে:
১.ভবিষ্যতের বিস্তারিত সংবাদ
২.কিয়ামত পর্যন্ত ঘটনাবলীর পূর্বাভাস
৩.আগামী যুগের মানুষদের নাম-ধাম, রাজত্ব ও ফিতনার বিবরণ
৪.আধ্যাত্মিক হেকমত ও সান্ত্বনার অমূল্য মণি-মুক্তা
কুরআনের আলোকে প্রমাণ
কুরআন নিজেই সাক্ষ্য দেয় যে, ফেরেশতাদের কথা ও ওহী শুধু নবীদের জন্য সীমাবদ্ধ নয়:
১.হযরত মরিয়ম (আ.)-এর সঙ্গে ফেরেশতারা কথা বলতেন (সূরা আলে ইমরান : ৪২-৪৫)
২.হযরত সারা (আ.)-কে ফেরেশতারা সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিলেন
৩.সবচেয়ে স্পষ্ট: মূসা (আ.)-এর মায়ের প্রতি আল্লাহ “ওহী” করেছিলেন (সূরা কাসাস : ৭)—অথচ তিনি নবী ছিলেন না।
অতএব, যাহরা (সা.আ.)-র প্রতি জিবরাইলের আগমন ও সান্ত্বনা কোনো অসম্ভব বা বিস্ময়কর ঘটনা নয়—বরং এটি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহের আরেকটি উজ্জ্বল নিদর্শন।
আজ মুসহাফ কোথায়?
আমাদের আকিদা স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ: মুসহাফে ফাতেমা (সা.আ.) আজ হযরত মাহদী (আরওয়াহুনা লাহুল ফিদা)-এর পবিত্র হেফাযতে আছে। তিনি যখন তরবারি হাতে নিয়ে আসবেন, তখন এই আসমানী পত্রের কিয়ামত-পূর্ব সংবাদ ও হেকমতের আলো বিশ্বকে আলোকিত করবে।
হে যাহরা! তোমার অশ্রুতে যে মুসহাফ জন্ম নিয়েছিল, সেই মুসহাফ আজও আমাদের চোখের অশ্রুকে শুকিয়ে দেয় এবং বলে: “ধৈর্য ধরো, তোমার মাহদী আসছেন… আর যখন তিনি আসবেন, তখন তোমার বাবার দ্বীন আবার পূর্ণ জ্যোতিতে জ্বলে উঠবে।
سَلَامٌ عَلَيْكِ يَا فَاطِمَةُ بِنْتَ رَسُولِ اللَّهِ وَعَلَىٰ أَبِيكِ وَبَعْلِكِ وَبَنِيكِ وَعَلَىٰ الْمُصْحَفِ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْ وَلِيِّكَ সালাম তোমার উপর হে রাসূলের কন্যা ফাতেমা! সালাম তোমার পিতা, তোমার স্বামী, তোমার সন্তানদের উপর



