ইতিহাসজীবনযাপনধর্ম ও বিশ্বাসবিশেষ সংবাদ

হযরত ফাতিমা (সা.আ.): পরিবারে শান্তি–সাম্য প্রতিষ্ঠার এক অনন্য ও চিরন্তন আদর্শ

রাসেল আহমেদ | প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর, ২০২৫

মিডিয়া মিহির: সাধারণ দৃষ্টিতে বাড়ি কেবল একটি ভৌত কাঠামো; কিন্তু হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)–এর সীরতে বাড়ি ছিল— স্রষ্টানিষ্ঠ মানুষ গড়ার বিদ্যালয় এবং সুস্থ ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের কেন্দ্রবিন্দু।রাসূলুল্লাহ (সা.)–এর কন্যার পরিচালিত এই পবিত্র পরিবার ছিল আধ্যাত্মিকতা, প্রজ্ঞা, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা, ধৈর্য, আর বাস্তব জীবনের দক্ষতার এক পরম সমন্বয়— যা আজও পরিবার-গঠন ও পরিবার-সংরক্ষণে শ্রেষ্ঠতম মডেল হিসেবে বিবেচিত।

বর্তমান বিশ্বে পরিবার ক্রমাগত আক্রান্ত হচ্ছে লিবারেল ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, ভোগবাদ ও বস্তুবাদের চাপে। এর ফলে দুর্বল হচ্ছে— আবেগিক বন্ধন, মানসিক নিরাপত্তা এবং পারিবারিক শান্তি।

এমন এক যুগে, হযরত ফাতিমা (সা.আ.)–এর জীবনদর্শন পারিবারিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য এক বাস্তবিক ও আধ্যাত্মিক পথনির্দেশনা।

ইমাম আলী (আ.)–এর সেই উচ্চারণ— “ফাতিমাকে দেখলেই দুনিয়ার সব দুঃখ আমার হৃদয় থেকে দূর হয়ে যেত।”—তার গৃহে প্রতিষ্ঠিত শান্তি ও প্রশান্তির গভীরতাকে স্পষ্ট করে।

এই শান্তি ছিল তাঁর চরিত্রের স্বাভাবিক বিকাশ;
যা অনুসরণ করলে আজও পরিবারকে নিরাপদ, উষ্ণ ও স্নেহময় আবাসে পরিণত করা সম্ভব।

১. আবেগের প্রজ্ঞাময় ব্যবস্থাপনা ও মানসিক নিরাপত্তা প্রদান

ক) নিঃশর্ত স্নেহ ও আবেগের স্বচ্ছতা

হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)–এর দৃষ্টিতে ভালোবাসা ছিল স্রষ্টামুখী, নিঃস্বার্থ ও লেনদেনবিহীন। তিনি সন্তানদের ভালোবাসতেন প্রতিদানের প্রত্যাশা ছাড়াই— কারণ তাঁর সব কাজের উদ্দেশ্য ছিল রিদওয়ানুল্লাহ—আল্লাহর সন্তুষ্টি।

ইমাম আলী (আ.) বলেন, “আল্লাহর শপথ! ফাতিমা (সা.) জীবিত থাকা পর্যন্ত তিনি কখনো এমন কাজ করেননি যা আমাকে দুঃখ দেয়, এবং আমি-ও তাঁকে কখনো অসন্তুষ্ট করিনি।” এটি পারিবারিক আবেগের নিরাপত্তার সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত।

খ) নির্ভরতার বন্দর ও আবেগীয় আশ্রয়স্থল

সাকীফার রাজনৈতিক অস্থিরতা, ফাদকের অন্যায় দখলসহ বহু সংকটের সময় ইমাম আলী (আ.)–এর দৃঢ়তম সমর্থক ছিলেন হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)। তিনি দেখিয়েছিলেন— পরিবার হলো বাহ্যিক ঝড়ের বিপরীতে এক শান্ত নিরাপদ বন্দর।

গ) ভাষার মর্যাদা, সম্মান ও কোমলতা

তিনি স্বামীকে ডাকতেন— یا ابْنَ عَمِّ رَسُولِ اللَّهِহে রাসূলের চাচাতো ভাই। এ সম্মানসূচক সম্বোধন পরিবারে গভীর শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি করেছিল। সন্তানদেরও শিখিয়েছিলেন পিতাকে ডাকতে— “ইয়া আবাতাহ”—আমার প্রিয় পিতা। পারিবারিক যোগাযোগে এমন কোমলতা ও সম্মান ছিল তাদের পরিবারের স্থায়িত্ব ও সৌহার্দ্যের ভিত্তি।

এমনকি যারা তাঁর প্রতি অন্যায় আচরণ করেছিল, তাদের আচরণে তিনি ক্ষুব্ধ থাকলেও
স্বামীকে বলেছিলেন— “বেইতি বেইতুক”—এই ঘর তো তোমারই ঘর। এটি দাম্পত্য–সহযোগিতা ও সংকট মোকাবিলার এক অনন্য শিক্ষা।

২. বুদ্ধিদীপ্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও সন্তুষ্ট জীবন (কানাআত)

ক) জীবনের বাস্তবতার প্রতি সূক্ষ্ম উপলব্ধি

অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তখনও ছিল, আজও আছে। হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)–ও কষ্টের দিন দেখেছেন, কিন্তু তাঁর দৃষ্টিতে সমাধান ছিল দুইটি নীতিতে:

  • সচেতন ব্যয়ব্যবস্থাপনা,

  • সন্তুষ্টি (কানাআত)।

খ) সরলতা ও বাস্তবতা-ভিত্তিক জীবনযাপন

তিনি কখনো স্বামীর ক্ষমতার অতিরিক্ত কিছু কামনা করেননি। সাধারণ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনধারাই ছিল তাঁর পছন্দ। আজকের পরিবারে বিলাসিতা, প্রতিযোগিতা, সামাজিক তুলনা ও ভোগের চাপ অনেক সংকটের উৎস।

হযরত ফাতিমার (সা.) শিক্ষা হলো— সহযোগিতা, অভিযোগহীনতা, সহমর্মিতা ও সন্তুষ্টি— পারিবারিক শান্তির প্রধান ভিত্তি।

৩. সংকট-সহিষ্ণুতা, ধৈর্য ও সংকট-ব্যবস্থাপনার মাহাত্ম্য

ক) ধৈর্যের সর্বোচ্চ রূপ

নবীর (সা.) ইন্তেকালের পর যে অবর্ণনীয় অন্যায় ও বেদনা তিনি সহ্য করেছিলেন— সেসব নিয়ে তিনি কখনোই ইমাম আলী (আ.)–কে অভিযোগ করেননি। এটি দাম্পত্য সম্মান, আত্মসম্মান ও উচ্চ নৈতিকতার ব্যাপক দলিল।

খ) গোপনীয়তা রক্ষা ও আত্মমর্যাদা

তিনি নিজের বেদনা পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দিতেন না। সমস্যা ও যন্ত্রণাকে

  • কেবল পরিবারের মধ্যে,

  • অথবা আল্লাহর সামনে পেশ করতেন।

এই গোপনীয়তা তাঁর ব্যক্তিত্বে মর্যাদার শক্তি জুগিয়েছিল এবং উম্মাহর ঐক্য রক্ষা করেছে।

ইমাম হাসান (আ.) ও হযরত জয়নাব (সা.আ.)— এই সংযম, শক্তি ও ধৈর্য নিজেদের চোখের সামনে দেখেই শিখেছিলেন।
তাই জয়নাব (সা.আ.)–এর নাম ইতিহাসে রয়ে গেছে— “সবরের পর্বত”।

গ) মাতা—সন্তানের স্থিতিশীলতার প্রথম শিক্ষক

যখন প্রশ্ন ওঠে— “আজকের শিশুরা কেন এত কম ধৈর্যশীল?” এর উত্তর খুঁজতে হয় মায়ের আচার-আচরণে। মা–ই পরিবারের আবেগীয় ভিত্তি। তিনি যদি ধৈর্য, স্থিতিশীলতা ও সংকটবিষয়ক প্রজ্ঞা বাস্তব আচরণের মাধ্যমে দেখান, সন্তানও তেমনিই দৃঢ় মানুষে পরিণত হয়।

ফাতিমীয় মডেল—পরিবারে শান্তি প্রতিষ্ঠার এক পূর্ণাঙ্গ পথরেখা

হযরত ফাতিমা (সা.)–এর জীবন প্রতিফলিত করে—

  • ঈমানের ভিত্তিতে নির্মিত শান্তি,

  • নিঃস্বার্থ ভালোবাসা,

  • প্রজ্ঞাময় সিদ্ধান্ত,

  • অর্থনৈতিক সংযম,

  • সংকটমুখে অবিচল ধৈর্য,

  • এবং আধ্যাত্মিকতার দ্বারা পরিচালিত দৈনন্দিন জীবন।

এই সমগ্র গুণাবলি একত্রে গড়ে তুলেছিল— মানসিকভাবে নিরাপদ, আধ্যাত্মিকভাবে সমুন্নত ও উত্তরণমুখী পরিবার

সমসাময়িক পরিবারব্যবস্থার সংকটময় প্রেক্ষাপটে হযরত ফাতিমা (সা.আ.)–এর সীরত এক চিরন্তন নির্দেশনা— যেখানে শান্তি, ভালোবাসা, ধৈর্য ও আধ্যাত্মিক বিকাশ একই পরিবারের মধ্যে সমবেত হয়।

আরও পড়ুন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button