আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী: রিজিক ও অন্তর-নিবিড় শান্তির আধ্যাত্মিক চাবি
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির: ইরানের জাতির প্রতি পিতৃতুল্য স্নেহে ভরা এক বার্তায় ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী বলেছেন:দোয়া ও মুনাজাতকে জীবনের সকল জটিলতা দূর করার ‘মাস্টার-কী’ এবং বরকত, নিরাপত্তা, সুস্থতা ও সমৃদ্ধির চিরন্তন উৎস হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর আহ্বান স্পষ্ট: হৃদয় ও জিহ্বা মিলিয়ে যখন বান্দা স্রষ্টার দরবারে ফিরে আসে, তখন বন্ধ দুয়ারগুলো নিজেই খুলে যায়; আল্লাহ নিজ হাতে তার বান্দার সমস্যার সমাধান সৃষ্টি করেন।
জাতির উদ্দেশে দেওয়া সেই উষ্ণ, পিতৃস্নেহময় ভাষণে সর্বোচ্চ নেতা এক গভীর সত্যের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, যা কেবল উপদেশ নয়, বরং ব্যক্তি ও সমাজের কণ্টকাকীর্ণ পথ পার হওয়ার এক কৌশলগত জীবন-মানচিত্র।
তিনি বলেছিলেন:আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ককে আরও গভীর করুন… নিরাপত্তার জন্য, সুস্থতার জন্য, বৃষ্টির জন্য, সব কিছুর জন্য দয়াময় প্রভুর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করুন। তাঁর সঙ্গে কথা বলুন, তাঁর কাছে চান, বিনয়ের সঙ্গে তাঁর দরবারে হাজির হন। ইনশাআল্লাহ, মহান আল্লাহ সবকিছুর সংশোধনের পথ নিজেই প্রশস্ত করে দেবেন।
এই বাণী কোরআন ও আহলে বাইত (আ.)-এর শিক্ষায় গভীরভাবে মজ্জিত। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে কয়েকটি অমূল্য পাথেয়:
১. দোয়া— নিষ্ক্রিয়তা নয়, কর্মের প্রাণশক্তি
অনেকে ভাবেন, দোয়া মানে হাত গুটিয়ে বসে থাকা। কিন্তু নেতার কথায় স্পষ্ট হয়— দোয়া হলো প্রচেষ্টাকে আল্লাহর রহমতের সঙ্গে যুক্ত করার সেতুবন্ধ। প্রতিটি সাফল্যের পেছনে এই অদৃশ্য শক্তি কাজ করে।
কোরআন এ সত্য ঘোষণা করে:
﴿وَما مِن دَابَّةٍ فِي الأَرْضِ إِلّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا﴾ (সূরা হূদ, আয়াত ৬)
অর্থাৎ:পৃথিবীর বুকে বিচরণশীল প্রতিটি প্রাণীর রিজিকের দায়িত্ব একমাত্র আল্লাহর।”
২. দোয়া— উদ্বেগের এ যুগে হৃদয়ের শান্তি-নীড়
আজকের অশান্ত পৃথিবীতে উৎকণ্ঠা মানুষের হৃদয়কে গ্রাস করছে। নেতার আহ্বান: আল্লাহর দরবারে মাথা নত করুন, নিরাপত্তা-সুস্থতা-জীবিকার সব ভার তাঁর হাতে তুলে দিন। তখনই হৃদয়ের বোঝা হালকা হয়, প্রশান্তির সুবাতাস বয়ে যায়।
কোরআন সাক্ষ্য দেয়:
﴿أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ﴾ (সূরা আর-রা‘দ, আয়াত ২৮)
অর্থাৎ: শোনো! আল্লাহকে স্মরণ করলেই কেবল হৃদয় শান্তি পায়।
৩. দোয়া— সমাজের ঐক্যের অদৃশ্য সুতো
যখন একটি জাতি একই সঙ্গে বৃষ্টি, শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য একই প্রভুর কাছে হাত তুলে, তখন জন্ম নেয় অভিন্ন ভাগ্যের বোধ। এই সমষ্টিগত মুনাজাত বিভেদের দেয়াল ভেঙে ঐক্যের সেতু রচনা করে।
৪. দোয়া— তাওয়াক্কুলের স্কুল, অহংকারের প্রতিষেধক
আজকের স্ব-কেন্দ্রিক যুগে “আল্লাহর কাছে চাইতে হবে” এই একটি বাক্যই যথেষ্ট— মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে সবকিছু তাঁর ইচ্ছাধীন। এই বিনয় অহংকারের বিষ ধ্বংস করে, মানুষকে মাটির কাছাকাছি নিয়ে আসে।
সর্বোচ্চ নেতার এই বারবারের তাগিদ কেবল আধ্যাত্মিক নির্দেশ নয়; এ এক পরিপূর্ণ সাংস্কৃতিক কৌশল— যা গড়ে তোলে এমন সমাজ, যেখানে মানুষ আল্লাহর উপর ভরসা করে আরও উজ্জ্বল আশা নিয়ে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যায়।
এভাবেই দোয়া ব্যক্তিগত সীমা ছাড়িয়ে ওঠে এক মহৌষধে পরিণত হয়— যে কঠিন শিলাকে ধৈর্যের সোনায় রূপান্তরিত করে, যে সন্দেহের ঘন অন্ধকারকে ছিন্ন করে নিশ্চিত আলোর ঝর্ণা উথলে ওঠায়।
দয়াময় ও ক্ষমাশীল প্রভুর উপর ভরসা রেখে আমরা আশাবাদী— তাঁর অসীম রহমতের ছায়ায় আমাদের গোনাহ মোচন হবে, প্রয়োজন পূর্ণ হবে, আর হৃদয় ভরে উঠবে প্রশান্তির অপার্থিব সুগন্ধে।
আমিন।



