ইতিহাসজীবনযাপনধর্ম ও বিশ্বাসবিশেষ সংবাদবিশ্ব

হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.আ.)-এর কবর কেন আজও গোপন?

ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫

মিডিয়া মিহির: তিনি চলে গেলেন রাতের শেষ প্রহরে—যখন মদিনার আকাশও অশ্রুতে ভারী। তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিল একটিই: «আমার গোসল, কাফন, জানাজা ও কবর—সবকিছু যেন রাতের আঁধারে, গোপনে, নিঃশব্দে সম্পন্ন হয়। যাদের হাতে আমি আঘাত পেয়েছি, তাদের একজনের পায়ের ধুলোও যেন আমার কবরে না পড়ে।

এই একটি وصيت ওসিয়ত শুধু ব্যক্তিগত ইচ্ছা ছিল না। এ ছিল নবী-কন্যার সর্বশেষ, সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদ—যা চৌদ্দ শতাব্দী পেরিয়েও মাটির নিচ থেকে চিৎকার করে উঠছে।

১. অশ্রুতে ভেজা সেই শেষ দিনগুলো

নবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর যে ঝড় এসেছিল, তার প্রথম আঘাত পড়েছিল বাতুলের ঘরে।

১- সাকিফার ছায়ায় আলীর (আ.) হক ছিনিয়ে নেওয়া

২-ফাদাকের বাগান কেড়ে নেওয়া

৩- দরজায় আগুনের ছায়া, পাঁজর ভাঙার শব্দ

৪- আর সবচেয়ে বড় কষ্ট—যাদের কাছ থেকে ভালোবাসা আশা করেছিলেন, তাদের থেকে নীরবতা পাওয়া।

এই বেদনার গভীরে তিনি স্থির করলেন: যারা আমার উপর জুলুম করেছে, তারা যেন আমার জানাজাতেও না আসতে পারে।

২. রাতের অন্ধকারে লেখা শেষ ওসিয়ত

তিনি হযরত আলী (আ.)-কে ডেকে বললেন:

১.আমাকে রাতে দাফন করবে

২.কেউ যেন না জানে

৩.যাদের আমি ক্ষমা করিনি, তাদের পায়ের ধুলো যেন আমার কবরে না লাগে

৪.আমার কবর যেন চিরদিন মানুষের কাছে গোপন থাকে

৫.আমার শরীরের পোশাক খোলা হবে না—এমনভাবেই গোসল হবে

এই ওসিয়ত ছিল একটি জ্বলন্ত দলিল—যাতে লেখা ছিল: আমি কখনো এই জুলুমকে মেনে নিইনি।

৩. পোশাকের উপর দিয়েই গোসল—মর্যাদার শেষ দৃষ্টান্ত

রাত গভীর হলে ঘরের দরজা বন্ধ। আলো জ্বালানো হলো না—শুধু একটি ম্লান প্রদীপ। গোসল দিচ্ছেন স্বয়ং আমীরুল মু’মিনীন (আ.)। আসমা বিনতে উমাইস পানি ঢালছেন। পোশাক খোলা হলো না—কারণ নবী-কন্যার শরীর যেন কোনো অপরিচিত চোখেও না পড়ে।

এই গোসল ছিল ইতিহাসে একমাত্র ঘটনা—যেখানে পোশাকের উপর দিয়েই পবিত্রতা সম্পন্ন হলো।

৪. জানাজা—যে রাতে মদিনা কাঁদছিল নিঃশব্দে

জানাজায় ছিলেন মাত্র কয়েকজন—যাদের হৃদয়ে ফাতিমা বেঁচে ছিলেন: হাসান, হুসাইন, সালমান, আবু যর, মিকদাদ… তারা কাঁধে তুললেন সেই পবিত্র জানাজা, যার উপর দিয়ে বয়ে গেছে গোটা ইতিহাসের অশ্রু।

৫. দাফন—যখন মাটিও লজ্জায় মাথা নত করল

হযরত আলী (আ.) নিজের হাতে কবর খুঁড়লেন। কিছু বর্ণনায় আছে—কবরের ভিতর থেকে দুটি নূরের হাত বেরিয়ে এলো, যেন রাসূল (সা.)-এর হাত—আর সাহায্য করলো নিজের প্রিয় কন্যাকে শায়িত করতে।

দাফনের পর আলী (আ.) কবর সমান করে দিলেন। তারপর আরও সাতটি—কোথাও বলা হয় চল্লিশটি—মিথ্যা কবর বানালেন। যাতে কেউ কখনো আসল কবর চিনতে না পারে।

৬. পরদিন—যখন শত্রুরাও কবর খুঁজতে এলো

সকাল হতেই আবু বকর ও উমর লোক নিয়ে এলো। তারা বলল: কবর খুঁড়ে দেখতে হবে, ফাতিমার কবর কোথায়? সংবাদ পেয়ে হযরত আলী (আ.) তলোয়ার হাতে বেরিয়ে এলেন। চোখে আগুন, কণ্ঠে দৃঢ়তা: যদি একটি পাথরও সরাও, তবে আমার তলোয়ার দিয়ে উত্তর দেব। তারা পিছিয়ে গেল। সেই থেকে কবর গোপন রয়ে গেল।

৭. আজও যে কবর খুঁজে পাওয়া যায় না

ইতিহাস তিনটি জায়গার কথা বলে:

১.বাকী কবরস্থান

২.রাসূল (সা.)-এর রওজার ভিতর

৩.নিজের ঘর, যাকে আজ বলা হয় «বাইতুল আহযান»

কিন্তু কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। কারণ তিনি নিজেই চেয়েছিলেন—তাঁর কবর যেন কোনো জালিমের পায়ের নিচে না পড়ে।

উপসংহার

আজ ১৪০০ বছর পরেও সেই কবর লুকিয়ে আছে। কিন্তু প্রতি মুহূর্তে সে চিৎকার করে বলছে: আমি জুলুম মেনে নিইনি। আমার বাবার উম্মত যদি আমার সঙ্গে এমন করে, তবে আলীর সঙ্গে কী করবে? যতদিন এই কবর গোপন থাকবে, ততদিন ফাতিমার অশ্রু শুকাবে না, ততদিন ইতিহাস লজ্জায় মাথা নত করে থাকবে, আর ততদিন প্রতিটি বিবেকের কাছে একটিই প্রশ্ন বেজে উঠবে— তুমি কোন পক্ষে?

পাদটীকা

১. তুসি, মুহাম্মদ বিন হাসান, মিসবাহুল মুতাহাহিদ ও সিলাহুল মু’তাব্বেদ, খণ্ড ২, পৃ. ৭৯৩।

২. ইবন-বাউইয়া, মুহাম্মদ বিন আলি, আল-আমালি (সল্লোক), পৃ. ৬৫৮; এবং একই গ্রন্থ, উল্লিল-শারাইহ, খণ্ড ১, পৃ. ১৮৫।

৩. শায়খ তুসি, মুহাম্মদ বিন হোসাইন, আল-আমালি, পৃ. ১৫৬।

৪. সালিম বিন কায়স, কিতাব সালিম বিন কায়স আল-হিলালী, খণ্ড ২, পৃ. ৮৭০।

৫. ইয়াকুবি, আহমদ বিন আবি-বা‘কুব, তারিখ ইয়াকুবি, খণ্ড ২, পৃ. ১১৫।

৬. ইবনে শহরআশুব মাজান্দরানি, মুহাম্মদ বিন আলি, মনাকিব আলে আবি তালিব (আ.), খণ্ড ৩, পৃ. ৩৬৪; ইয়াকুবি, আহমদ বিন আবি-ইয়াকুব, তারিখ ইয়াকুবি, খণ্ড ২, পৃ. ১১৫; মজলিসি, মুহাম্মদ বাকির, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৪৩, পৃ. ২০১।

৭. ইবনে আবদুলওহাব, হোসাইন, অয়ূনুল মুজাজাত, পৃ. ৫৫; তাবরি আমেলি, মুহাম্মদ বিন জারীর, দালায়েলুল ইমামাহ, পৃ. ১৩৬।

৮. ফুতাল নিশাপুরি, মুহাম্মদ বিন আহমদ, রৌযাতুল ওয়াইযিন ও বাসীরাতুল মুত্তাযিন, খণ্ড ১, পৃ. ১৫১–১৫২; তাবরি, ফজল বিন হোসাইন, আল-আলাম উল-ওরী বা আলামুল হুদা, খণ্ড ১, পৃ. ৩০০।

৯. মজলিসি, মুহাম্মদ বাকির, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৪৩, পৃ. ২০০।

১০. ইয়াকুবি, আহমদ বিন ইয়াকুব, তারিখ ইয়াকুবি, খণ্ড ২, পৃ. ১১৫।

১১. ফুতাল নিশাপুরি, খণ্ড ১, পৃ. ১৫১–১৫২; তাবরি, ফজল বিন হোসাইন, খণ্ড ১, পৃ. ৩০০।

১২. ইবনে শহরআশুব মাজান্দরানি, মনাকিব আলে আবি তালিব (আ.), খণ্ড ৩, পৃ. ৩৬৫।

১৩. মজলিসি, মুহাম্মদ বাকির, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ২৮, পৃ. ৩০৪।

১৪. ইবনে আবদুলওহাব, হোসাইন, অয়ূনুল মুজাজাত, পৃ. ৫৫; তাবরি আমেলি, মুহাম্মদ বিন জারীর, দালায়েলুল ইমামাহ, পৃ. ১৩৬।

১৫. তাবরি আমেলি, মুহাম্মদ বিন জারীর, দালায়েলুল ইমামাহ, পৃ. ১৩৭।

১৬. সালিম বিন কায়স, কিতাব সালিম বিন কায়স আল-হিলালী, খণ্ড ২, পৃ. ৮৭০–৮৭১।

১৭. মজলিসি, মুহাম্মদ বাকির, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ২৮, পৃ. ৩০৪।

১৮. তাবরি আমেলি, মুহাম্মদ বিন জারীর, দালায়েলুল ইমামাহ, পৃ. ১৩৭।

১৯. মজলিসি, মুহাম্মদ বাকির, বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ২৮, পৃ. ৩০৪।

আরও পড়ুন 

Related Articles

One Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button