অশোভন অভ্যাসের অন্ধকার থেকে মুক্তির আলোকপথ
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির: অশোভন অভ্যাসের জাল যেন শয়তানের ফাঁদ, যা মানুষের আত্মাকে বন্দী করে। কিন্তু ইসলামের আলোতে এই বন্ধন থেকে মুক্তির পথ স্পষ্ট—যেন এক প্রাচীন কুরআনী গ্রন্থের পাতায় লিখিত। এটি দাঁড়িয়ে আছে তিনটি অটুট স্তম্ভের উপর: অন্তরের আল্লাহপ্রদত্ত ইচ্ছাশক্তি, আল্লাহর হুকুমে অবিচল আনুগত্য, এবং আত্মসংযমের অবিরাম সাধনা। এই স্তম্ভগুলো কুরআন মজীদ এবং হাদিস শরীফের আলোয় উজ্জ্বল, যেন একটি মহাকাব্যের নায়ক তার নাফসের সাথে জিহাদ করে বিজয়ী হয়।
১. অন্তরের আল্লাহপ্রদত্ত ইচ্ছাশক্তির জাগরণ
একদা এক মুমিন ছিল, যার হৃদয়ে আল্লাহর দান—এক অমোঘ ইচ্ছাশক্তি—যেন লুকানো এক নূরানী অস্ত্র। সে অশোভন অভ্যাসের শয়তানী ফাঁদে পড়ে যায়, কিন্তু তওবা করে সংকল্প করে: “আমি সত্য বলব, হারাম থেকে বিরত থাকব, অশ্লীলতার ছায়া স্পর্শ করব না।” এই স্তম্ভ হলো নিয়্যাহের—প্রত্যেক কাজের পেছনে বিশুদ্ধ অভিপ্রায়। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “প্রত্যেক কাজ নির্ভর করে তার নিয়্যাতের উপর।” (মুত্তাফাক আলাইহি) আল্লাহ তা’আলা কুরআনে বলেন: “আর যখন আমার বান্দারা তোমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, তখন (বলো) নিশ্চয় আমি নিকটবর্তী; দোয়াকারীর দোয়ায় সাড়া দেই যখন সে আমাকে ডাকে। সুতরাং তারা যেন আমার ডাকে সাড়া দেয় এবং আমার প্রতি ঈমান আনে; যাতে তারা সঠিক পথে চলে।” (সূরা আল-বাকারা: ১৮৬) এই ইচ্ছাশক্তি ছাড়া যাত্রা শুরু হয় না
২. আল্লাহর হুকুমে অবিচল আনুগত্যের ধারা
মুমিনটি তখন বুঝল, একা জিহাদ কঠিন। তাই সে আল্লাহর হুকুমের নদীতে ডুবে গেল—অবিচল আনুগত্য যেন তার সঙ্গী, ধারাবাহিক সৎকর্ম যেন তার পথের নূর। যত বেশি সে সালাত কায়েম করল, জিকর করল, ততই তার শক্তি বৃদ্ধি পেল, যেন একটি ছোট বীজ থেকে ঈমানের মহীরুহ উঠে দাঁড়ায়। কুরআন বলে: “তুমি কিতাবের যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে, তা পাঠ কর এবং সালাত কায়েম কর। নিশ্চয় সালাত অশ্লীলতা ও মন্দকাজ থেকে বিরত রাখে। আর আল্লাহর স্মরণ সর্বশ্রেষ্ঠ। আর তোমরা যা কর আল্লাহ তা জানেন।” (সূরা আল-আনকাবুত: ৪৫) রাসূল (সা.) বলেছেন: “আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো সেইগুলো যা ধারাবাহিকভাবে করা হয়, যদিও তা অল্প হয়।” (সহীহ আল-বুখারী) এই স্তম্ভ হলো ধারাবাহিকতার—প্রতিদিনের সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, সৎকর্মের অভ্যাস, যেন একটি কবিতার প্রতিটি ছন্দ। বিপরীতে, যারা আনুগত্যে পিছিয়ে থাকে, তারা অশোভন অভ্যাসের জালে আটকে পড়ে। এতে নাফসের জিহাদ সুগম হয়, এবং হৃদয়ের অন্ধকার আল্লাহর নূরে ভরে ওঠে।
৩. আত্মসংযমের অবিরাম প্রচেষ্টার মহাকাব্য
শেষে মুমিনটি তার যুদ্ধের চূড়ান্ত অস্ত্র নিল—আত্মসংযমের অবিরাম সাধনা, যেন এক অনন্ত মহাকাব্যের নায়কের উত্থান। প্রতিটি পতন থেকে তওবা করে উঠে দাঁড়ানো, আচরণ সংশোধনের প্রচেষ্টা যেন তার রক্তে মিশে যাওয়া ঈমানের অমৃত। কুরআন বলে: “যারা আমার আয়াতসমূহে বিশ্বাস করে তারা যখন তোমার কাছে আসে, তখন বলো, তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। তোমাদের রব নিজের উপর রহমতকে অবধারিত করে নিয়েছেন যে, তোমাদের মধ্যে যে কেউ অজ্ঞতাবশতঃ মন্দকাজ করে, অতঃপর তওবা করে এবং সংশোধিত হয়, সে তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আল-আন’আম: ৫৪) আরও বলা হয়েছে: “হে মুমিনগণ! নিশ্চয় আল্লাহ সবরকারীদের সাথে আছেন।” (সূরা আল-বাকারা: ১৫৩) রাসূল (সা.) বলেছেন: “যদি তোমাদের কেউ রাগান্বিত হয় এবং সে দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে সে বসে যাক; যাতে তার রাগ চলে যায়। অন্যথায় সে শুয়ে পড়ুক।” (সুনান আবি দাউদ) এই স্তম্ভ ছাড়া অন্য দুটি অসম্পূর্ণ; এটি যেন গল্পের ক্লাইম্যাক্স, যেখানে নায়ক তার নাফসকে জয় করে। আল্লাহর দান এবং আনুগত্যের সাথে মিলে এই প্রচেষ্টা মানুষকে সংশোধিত করে, অশোভন অভ্যাসকে দূর করে, যেন একটি পুরোনো পাতা ঝরে পড়ে এবং জান্নাতের বসন্ত আসে।
এই তিন স্তম্ভ—আল্লাহপ্রদত্ত ইচ্ছাশক্তি, অবিচল আনুগত্য এবং আত্মসংযমের সাধনা—যেন একটি সুন্দর কুরআনী সিম্ফনি, যা মুমিনের আচরণকে সংশোধিত করে এবং মুক্তির পথকে আল্লাহর নূরে আলোকিত করে। অনুশীলনে এগুলো অনুসরণ করলে, অশোভন অভ্যাসের ছায়া দূর হয়, এবং জীবন যেন একটি হাদিসী উপাখ্যান হয়ে ওঠে।



