হিফজে কুরআন,একটি জাতীয় ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির: কুরআনকে শুধু কাগজে রাখা যথেষ্ট নয়। তাকে হৃদয়ের গভীরে, রক্তের প্রতিটি কণায়, স্মৃতির সবচেয়ে নিরাপদ খিলানে জীবন্ত করে তুলতে হয়। এ কাজ যখন কোনো ব্যক্তি করে—তখন সে হয়ে ওঠে হাফেজ। আর যখন একটি পুরো জাতি, বিশেষ করে তার যুবকেরা এই পথে পা বাড়ায়—তখন সে জাতি আর কখনো অন্ধকারে হারিয়ে যায় না। ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে এই দেশে যে কুরআনী জাগরণ শুরু হয়েছে, তার পেছনে আছে শহীদদের রক্তের উত্তাপ আর একজন পিতার মতো নেতার অবিরাম আহ্বান— ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ি (হাফি.)।
যখন বড় আলেমরাও আফসোস করেন
আয়াতুল্লাহ হাসানজাদে আমেলী (রহ.) একবার গভীর আক্ষেপে বলেছিলেন: «আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ এই যে, কিশোর বয়সে যে উৎসাহ আর প্রেম নিয়ে আমি হাফেজ, সায়েব তাব্রিজী আর মওলানার দিওয়ান মুখস্থ করেছি, সেই একই আগুন যদি কুরআনের জন্য জ্বলত… আজ আমার বুক এত খালি লাগত না।»
একটি বাক্যেই তিনি পুরো উম্মতের বিবেককে নাড়া দিয়ে গেছেন।
কুরআনকে বুকে ধারণ করা কেন জাতীয় দায়িত্বদ্ধতা?
১.কারণ কুরআন যদি শুধু মসজিদের তাকে আর লাইব্রেরির শেলফে থাকে, তবে একদিন শত্রু এসে তা পুড়িয়ে দিতে পারে।
২.কিন্তু যখন লাখো যুবকের বুকে কুরআন জীবন্ত হয়ে বেঁচে থাকে, তখন কোনো আগুনই আর তাকে স্পে পারে না।
ইমাম খামেনেয়ী (রহ.) বারবার বলেছেন: «আমি চাই আমাদের কিশোর-যুবকেরা বুঝুক—এই বয়সটাই কুরআনকে হৃদয়ে গেঁথে নেওয়ার সবচেয়ে উর্বর সময়। হয়ত আজ তারা পুরো অর্থ বুঝবে না, কিন্তু জীবনের প্রতিটি মোড়ে, প্রতিটি সংকটে, প্রতিটি রাতের নামাযে সেই আয়াতগুলো তাদের হাত ধরে আলোর পথ দেখাবে। এ এক আজীবনের ভাণ্ডার।
আলেমদের একই সুর
আয়াতুল্লাহ বাহজাত (রহ.): কুরআন মুখস্থ করো, যেন সে সবসময় তোমার সঙ্গে থাকে। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বিপদেও সে তোমার ঢাল হয়ে দাঁড়াবে।
আয়াতুল্লাহ বুরুজর্দি (রহ.): যে ব্যক্তি কুরআন হিফজ না করে মারা যায়, তার জন্য আফসোস করা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না।
আয়াতুল্লাহ মার‘আশী নাজাফী (রহ.) ও আয়াতুল্লাহ মারেফাত (রহ.) বলতেন: আজও ইসলামের প্রথম যুগের মতোই কুরআন হৃদয়ে ধারণ করা একটি সামাজিক ফরজ। কাগজে থাকলেই হবে না—তাকে জীবন্ত মানুষের বুকে বেঁচে থাকতে হবে।
বিপ্লবের পর যে আলো জ্বলে উঠল
ইসলামী বিপ্লবের পর এই দেশের প্রতিটি গ্রাম-শহরে যে কুরআনী বসন্ত ফুটেছে, তার পেছনে আছে শহীদদের রক্ত আর একজন পিতৃতুল্য নেতার অবিরাম তাগাদা। তিনি (ইমাম খামেনেয়ী) বছরের পর বছর ধরে প্রতিটি মাহফিলে, প্রতিটি হিফজ অনুষ্ঠানে একটি কথাই বলে আসছেন: হে আমার সন্তানেরা! কুরআনকে বুকে তুলে নাও। এই কিতাব তোমাদের পরিচয়, তোমাদের অস্তিত্ব, তোমাদের অস্ত্র। যে জাতির যুবকেরা কুরআনের হাফেজ হয়, সে জাতি কখনো পরাজিত হয় না।
শেষ কথা
হিফজে কুরআন কোনো ব্যক্তিগত শখ বা প্রতিযোগিতা নয়। এ হলো একটি জাতির বেঁচে থাকার শর্ত। যেদিন আমাদের লাখ লাখ শিশু-কিশোরের বুক কুরআনের নূরে ভরে উঠবে, সেদিন এই জাতি আর কারো দাসত্ব করবে না— সেদিন সে নিজেই হবে পৃথিবীর আলো। তাই আসুন, প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি মাদ্রাসায়, প্রতিটি হৃদয়ে কুরআনকে আবার জীবন্ত করে তুলি। কারণ যে জাতি কুরআনকে বুকে ধারণ করে, আল্লাহ তাকে কিয়ামত পর্যন্ত মাথা উঁচু করে হাঁটতে দেন।
উৎস: কুরআনের ক্বারী ও হাফেজদের বিদায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য, অধ্যাপক শেহাত মুহাম্মাদানুর ও অধ্যাপক মুহাম্মাদ বেসিউনি, ১ম ফারওয়ার্দিন ১৩৬৯ হিজরি شمسی



