হযরত ফাতিমা (সা.)-এর দৃষ্টিতে: নূরে নবুয়ত থেকে নিফাকের অন্ধকার
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির: নবী করিম (সা.)-এর বিদায়ের সেই ক্রান্তিকালে যখন আসমান থেকে ওহীর আলো মিলিয়ে গেল, তখন ইসলামী সমাজের বুকে এক অদৃশ্য ঝড় উঠল। সেই ঝড়ের আড়ালে নিফাকের বীজ, যা নবুওয়তের জ্যোতিতে সুপ্ত ছিল, হঠাৎ অঙ্কুরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। হযরত ফাতিমাতুজ যাহরা (সা.আ.)-এর অমর খুতবায় প্রতিফলিত সেই ইতিহাস কেবল অতীতের করুণ কাহিনি নয়; বরং সত্যের পথচ্যুতি ও মানব-মনের অন্ধকারের এক অতল গহন চিত্র।
নিফাক কোনো সাধারণ আগুন ছিল না, যা এক ফুঁৎকারে নিভে যায়। এ ছিল গোপন অঙ্গার—নবুওয়তের প্রখর আলোয় যা লুকিয়ে ছিল, কিন্তু নবীজির (সা.) ইন্তেকালের পর সমাজের নতুন বাতাসে তা ধীরে ধীরে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। ধর্মের পবিত্র আবরণ ক্ষয়ে গেল, তার ভেতরের প্রাণশক্তি ঝাপসা হয়ে এলো। যেন একটি উজ্জ্বল প্রদীপ নিভে যেতেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল ঘন অন্ধকার; আর সেই অন্ধকারে হারিয়ে গেল সত্যের পথ।
যখন সর্বশ্রেষ্ঠ দিশারী পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন, যখন সেই শক্তিশালী বাহুদ্বয়—যে বাহুতে ধর্মের ঢাল ছিল—মাটির সঙ্গে মিশে গেল, তখন মুমিন সমাজের বুকে সৃষ্টি হলো এক অপার শূন্যতা। মনে হয়েছিল, নবীজির অমূল্য আমানতকে আঁকড়ে ধরে উম্মাহ এক থাকবে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই লুক্কায়িত দ্বন্দ্বের অঙ্কুর ফুটে উঠল। নেতৃত্বের শূন্যতা যেন সেচ দিল নিফাকের বীজকে—যে বীজ শতাব্দী ধরে অপেক্ষায় ছিল একটি ফাটলের। আর সেই ফাটল দিয়ে প্রবেশ করল ঘন কালো ছায়া, যা সত্যের ওপর বিস্তার করল অন্ধকারের ভারী পর্দা।
এই পরিবর্তনের ঝড় এলো না হঠাৎ। এ ছিল মানুষের অন্তরে লুক্কায়িত দুর্বলতার ফল। যারা নবুওয়তের আলোয় নিজেদের ছায়া হয়ে থাকত, তারা নবীজির বিদায়ের ধোঁয়াশায় সুযোগ দেখল। ক্ষমতার কোলাহলে তাদের কণ্ঠ প্রবল হলো। তারা বাধা দিল কুরআনের আলো ছড়াতে, বন্ধ করল হাদিসের পথ। তারা প্রতিশ্রুতি দিল দুনিয়ার মর্যাদার—যে মর্যাদা আধ্যাত্মিকতার ছায়াও নয়। আর মানুষ, যাদের অন্তরে সত্যের দীপ্ষিকা ম্লান হয়ে এসেছিল, তারা সেই মিথ্যা আহ্বানে সাড়া দিল।
এই বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়ালেন সিদ্দীক্বা তাহেরা, ফাতিমাতুজ যাহরা (সা.আ.)। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হলো সেই অমর খুতবা—যাকে বলা হয় ‘খুতবা-এ-ফাদাকিয়া’। এ ছিল কেবল ফাদাকের জমির দাবি নয়; এ ছিল ওয়ালায়াতের মর্যাদা রক্ষার আহ্বান, রিসালাতের পথকে বিশুদ্ধ রাখার সংগ্রাম।
তিনি বললেন: «فَلَمَّا اخْتَارَ اللَّهُ لِنَبِيِّهِ دَارَ أَنْبِيَائِهِ… ظَهَرَ فِيكُمْ حَصْحَصَ الْحَقُّ…»
অর্থাৎ— যখন আল্লাহ তাঁর নবীর জন্য নির্ধারণ করলেন নবীদের আশ্রয় ও প্রিয়জনদের নিবাস, ঠিক তখনই তোমাদের মাঝে নিফাকের কাঁটা ফুটে উঠল। ধর্মের চাদর জীর্ণ হয়ে গেল। গোমরাহদের জিহ্বা সক্রিয় হলো। তুচ্ছ ও অকিঞ্চিৎকর লোকেরা মাথা তুলে দাঁড়াল। মিথ্যাবাদীরা উঁচু গলায় ডেকে উঠল—যেন বালুকাময় মরুভূমিতে উন্মত্ত উটের গর্জন। শয়তান লুকানো গর্ত থেকে মাথা তুলল, তোমাদের দিকে ডাক দিল—আর তোমরা সাড়া দিলে। তোমরা তার প্রতিশ্রুত মিথ্যা মর্যাদার পেছনে ছুটলে। যখন সে তোমাদের উত্তেজিত করল, তোমরা তৎক্ষণাৎ প্রস্তুত হয়ে গেলে। যখন সে তোমাদের রাগালো, তোমরা ক্রোধে জ্বলে উঠলে—কিন্তু সে ক্রোধ ছিল না সত্যের জন্য, ছিল নিজেদের নবগঠিত স্বার্থের জন্য।
এই কথাগুলো যেন আজও আকাশে লেখা আছে। নবুওয়তের প্রদীপ নিভতেই সমাজ নেমে গেল ছায়ার গভীরে। নৈতিকতার ভিত্তি কেঁপে উঠল। সত্যের জায়গায় এসে দাঁড়াল ক্ষমতার মোহ আর নিফাকের কালো পর্দা।
হযরত ফাতিমা (সা.আ.)-এর সেই কণ্ঠস্বর আজও আমাদের কানে বাজে—সতর্কবাণী হয়ে, আলোর খোঁজে পথ হারানো এই উম্মাহর জন্য একটি উজ্জ্বল মশাল হয়ে।



