বিশ্ব

সৌদি আরব–সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্ব কীভাবে আনসারুল্লাহকে সুযোগ দিচ্ছে?

ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

মিডিয়া মিহির: দক্ষিণ ও পূর্ব ইয়েমেনে বন্দর, জ্বালানি ও সামুদ্রিক পথ নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কৌশলগত প্রতিযোগিতা যেমন বিচ্ছিন্নতা ও নিরাপত্তা-ঝুঁকির আশঙ্কা বাড়াচ্ছে, তেমনি জোটের ভেতরকার ফাটল, আঞ্চলিক কূটনীতি ও সামুদ্রিক প্রতিরোধের মাধ্যমে আনসারুল্লাহর জন্য শক্তির ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণের সুযোগও সৃষ্টি করছে।

হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মুহাম্মদ মালেকজাদে—ইসলামি সংস্কৃতি ও চিন্তাধারা গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক—একটি মন্তব্য নিবন্ধে লিখেছেন:

সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের গোপন এবং কখনো প্রকাশ্য কৌশলগত প্রতিযোগিতা ইয়েমেনের ভূগোলজুড়ে, বিশেষত দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে (আল-মাহরা, শাবওয়া, হাদ্রামাউত ও আদেন), নতুন এক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। জোটবাহিনীর উত্তরাঞ্চলের কিছু অংশ থেকে কৌশলগত পিছু হটার পর এই প্রতিযোগিতা এখন মূলত দক্ষিণ ইয়েমেনের জ্বালানি-রুট, বন্দর এবং কৌশলগত সামুদ্রিক পথের নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যে এই ফাটল যেমন আনসারুল্লাহর জন্য বিশেষ সুযোগ এনে দিচ্ছে, একই সঙ্গে ইয়েমেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতার জন্যও তা গুরুতর হুমকি তৈরি করছে। সাম্প্রতিক গতিবিধি ইঙ্গিত করে যে ইয়েমেনকে কেন্দ্র করে রিয়াদ–আবুধাবির বিরোধ বৃহত্তর হিব্রু–আরব–পশ্চিমা অক্ষের পরিকল্পনার সঙ্গেও আংশিকভাবে সঙ্গতিপূর্ণ; এই অক্ষের যৌথ কৌশলগত লক্ষ্য হলো লোহিত সাগর ও আদেন উপসাগরে প্রভাব সুসংহত করা, বাবুলমন্দেব প্রণালী এবং জ্বালানি পরিবহন রুটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।

ইসরায়েলের স্বার্থ দাবি করে যে দক্ষিণ ইয়েমেন তার জন্য এক সামুদ্রিক নিরাপত্তা-বেল্টে পরিণত হোক, যাতে ইলাত বন্দর থেকে আদেন পর্যন্ত সামুদ্রিক নিরাপত্তা-ছায়া বিস্তৃত করা যায় এবং যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌঘাঁটির সঙ্গে তা সংযুক্ত করা সম্ভব হয়। এই মডেলে আবুধাবি, ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় রেখে, দক্ষিণ ইয়েমেনের বন্দরের নিয়ন্ত্রণ পেতে আদেনে প্রভাব বিস্তারের প্রতি অধিক আগ্রহী। অন্যদিকে রিয়াদ মনোযোগ দিচ্ছে ইয়েমেনের পূর্বাঞ্চল ও ওমানসংলগ্ন স্থলপথে, যা তেল ও গ্যাস পরিবহনের করিডরের সঙ্গে সম্পর্কিত।

তিনটি প্রধান হুমকি

এই পরিস্থিতিতে আনসারুল্লাহর সামনে কয়েকটি হুমকি উপস্থিত:

১) দক্ষিণের কার্যত বিচ্ছিন্নতা — আবুধাবি দক্ষিণান্তরী পরিষদকে সমর্থন দিয়ে এবং আদেনে এক ধরনের আধা-রাষ্ট্রীয় প্রশাসন পরিচালনার মাধ্যমে ভৌগোলিক বিভাজনকে স্থায়ী করতে চাইছে।
২) ইসরায়েলের নিরাপত্তা-প্রভাব বিস্তার — সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিয়ন্ত্রণাধীন দক্ষিণাঞ্চলের ঘাঁটিগুলোতে ইসরায়েলের যে কোনো আনুষ্ঠানিক নিরাপত্তা-উপস্থিতি বা গোপন তথ্যগত তৎপরতা আনসারুল্লাহর কৌশলগত গভীরতার জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে।
৩) ক্ষয়ধর্মী প্রতিযোগিতা — রিয়াদ–আবুধাবির এই প্রতিযোগিতা এমন এক কৌশলে রূপ নিতে পারে, যা দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র-ব্যবস্থা গঠনের পথে বাধা সৃষ্টি করবে।

হুমকির পাশাপাশি সোনালি সুযোগ

তবে এসব হুমকির পাশাপাশি আনসারুল্লাহ ও তাদের মিত্রদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগও উন্মুক্ত:

১.জোটের ফাটলকে কাজে লাগানো — রিয়াদ ও আবুধাবির মতপার্থক্য ইয়েমেনবিরোধী চাপ নিরসনে সহায়ক হতে পারে।

২.ওমানসহ নিরপেক্ষ খেলোয়াড়দের সঙ্গে কূটনীতি জোরদার করা — ইসরায়েলের বাড়তি সক্রিয়তার প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক ভারসাম্য গড়ে তুলে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ বাড়ানো সম্ভব।

৩.ইয়েমেন সংকটকে একক জাতীয় সংকট হিসেবে পুনঃসংজ্ঞায়ন — এর প্রভাব সমগ্র অঞ্চলে পড়ায় এই পরিস্থিতি তেহরান ও সানার নীতির অনুকূলে যেতে পারে এবং প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা ব্যর্থ করতে পারে।

৪.সামুদ্রিক নিরাপত্তা-লিভার সক্রিয় করা — আল-হুদাইদা বন্দর থেকে পশ্চিম আদেন উপকূল পর্যন্ত নৌ-পথে সক্রিয় উপস্থিতি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের কার্যকর উপায় হয়ে উঠতে পারে।

শক্তির ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণ

বিদ্যমান হুমকি ও সুযোগ বিবেচনায় ইরান ও ইয়েমেনের সামনে কয়েকটি কৌশলগত পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত, মিডিয়া-কৌশল—দক্ষিণ ইয়েমেনের বন্দর ও আমিরাত-নিয়ন্ত্রিত ঘাঁটিতে ইসরায়েলের ভূমিকা সম্পর্কে ধারাবাহিক তথ্যউন্মোচন অঞ্চলজুড়ে জনমতকে স্পর্শকাতর করে তুলতে পারে। দ্বিতীয়ত, মাঠপর্যায়ের কৌশল—বাবুলমন্দেব থেকে সোকোত্রা পর্যন্ত সমুদ্রপথে নজরদারি ও ড্রোন-পরিধি শক্তিশালী করা প্রতিপক্ষের খরচ বাড়াতে সক্ষম। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক সংস্থার ব্যবহার—ইকোসহ পশ্চিমবিহীন এশীয় কাঠামোগুলোকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েল ও তার আঞ্চলিক মিত্রদের মোকাবিলা করা।
চতুর্থত, দক্ষিণের বিরোধী গোষ্ঠী ও গোত্রগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক ফ্রন্ট গঠন—যারা বহিরাগত উপস্থিতির ব্যাপারে সমালোচনামুখর। পঞ্চমত, সামুদ্রিক প্রতিরোধের কৌশল প্রয়োগ—ইসরায়েল-সম্পর্কিত জাহাজের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানের অনুরূপ কৌশল ব্যবহার করে উপস্থিতির ব্যয় বাড়ানো।

সংকট-পরিচালনা ও হুমকিকে সুযোগে রূপান্তর

সার্বিকভাবে রিয়াদ–আবুধাবির প্রতিযোগিতা এবং ইয়েমেনের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান হুমকি বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আনসারুল্লাহ ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের জন্য শক্তির ভারসাম্য পুনর্নির্ধারণের সুযোগে রূপ নিতে পারে। এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো সম্মুখীনতামূলক কূটনীতি এবং স্মার্ট সামুদ্রিক–স্থলভিত্তিক প্রতিরোধের সমন্বয়, যাতে হিব্রু–আরব–পশ্চিমা অক্ষের উপস্থিতির ব্যয় তাদের সম্ভাব্য লাভের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button