সৈয়দ খুরাসানী : রেওয়ায়াতের সৌন্দর্য ও যুগান্তকারী ভূমিকা
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির: শেষ যুগের আকাশে কালো পতাকার প্রথম ঝলক ,যখন পৃথিবী জুলুমের শেষ সীমায় পৌঁছে যাবে, যখন মানুষের বুক থেকে আশা প্রায় উবে যাবে, যখন আকাশ-পাতাল কেঁদে উঠবে নির্যাতিতের আর্তনাদে— তখন খোরাসানের পাহাড়ের গভীর থেকে উঠবে এক অদ্ভুত আলোড়ন। একটি কালো পতাকা আকাশে উড়বে। তার নিচে দাঁড়িয়ে থাকবেন এক সৈয়দ— হুসাইনের রক্তের উত্তরাধিকারী, আলীর বংশের অমলিন সন্তান। শিয়া রেওয়ায়াতের পাতায় তিনি “সৈয়দ খুরাসানী”— হযরত মাহদী (আ.)-এর আগমনের প্রথম সুস্পষ্ট আলামত, যুগান্তরের অগ্রদূত, ন্যায়ের বিপ্লবের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।
তিনি সেই মহামানব, যাঁর নাম শুনলেই মাহদী-আন্দোলনের হৃদয়ে ধ্বনিত হয় বজ্রনিনাদ। যুগের পর যুগ ধরে হাদিসের পুঁথি, তাফসিরের পাতা আর ইতিহাসের ধুলোমাখা কাগজে মানুষ খুঁজে গেছে তাঁর পদচিহ্ন। প্রতিটি নতুন প্রজন্ম জিজ্ঞাসা করেছে: “তিনি কে? কোথা থেকে আসবেন? কখন উঠবেন তাঁর পতাকা?”
তিনি আসবেন খোরাসান থেকে। খোরাসান—যে নাম একদিন ছিল বিশাল এক সাম্রাজ্যের হৃদয়, যার মধ্যে ছিল আজকের ইরানের পাহাড়, আফগানিস্তানের উপত্যকা, মাওয়ারাউন্নাহরের সবুজ সমতল আর প্রাচ্যের অগণিত ইসলামী ভূমি। সেই বিশাল ভূখণ্ডের বুক থেকে তিনি উঠবেন, কালো পতাকা হাতে, হৃদয়ে মাহদীর প্রতীক্ষা নিয়ে, কুফার দিকে অগ্রসর হবেন— সেই কুফা, যেখানে একদিন হুসাইনকে ডাকা হয়েছিল, যেখানে একদিন মাহদীকে বরণ করা হবে।
তিনি কেবল একজন সামরিক নেতা নন। তিনি সেই পুরুষ, যিনি পৃথিবীর বুকে আবার রচনা করবেন ন্যায়ের কাব্য। তাঁর পদধ্বনিতে কেঁপে উঠবে জালিমের সিংহাসন, তাঁর ডাকে জেগে উঠবে লাখো ঘুমন্ত আত্মা। তিনি মাহদীর পথ প্রশস্তকারী, তিনি শেষ যুগের প্রথম সূর্যোদয়, যাঁর আলোতে পৃথিবী বুঝতে পারবে— আর দেরি নেই। ফজর আর খুব কাছে এসে গেছে।
হে মুমিন হৃদয়! যখন খোরাসানের আকাশে কালো পতাকা উড়বে, তখন আর দ্বিধা কোরো না। উঠে পড়ো। কারণ সেদিনই হবে ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর ভোর। সেদিনই জেগে উঠবে পৃথিবী— লাব্বাইক ইয়া মাহদী!
সৈয়দ খুরাসানী কে?
যখন এই প্রশ্ন ওঠে—“সৈয়দ খুরাসানী কে?” তখন হাদিসের পাতা নিজেই যেন কেঁপে ওঠে, আর বাতাসে ভেসে আসে এক অদ্ভুত সুবাস— কারবালার রক্তমাখা মাটির সুবাস।
তিনি “রজুলুম মিন খুরাসান”। তাঁর শিরায় বয় না সাধারণ রক্ত— বয় হুসাইনের লাল, আলীর আলো। তিনি সৈয়দ, অর্থাৎ ফাতেমাতুজ যাহরা (সা.আ.)-র বংশের অমলিন ফুল। তাঁর পরিচয় কেবল নামে নয়, রক্তের গভীরে লেখা। তিনি যখন উঠবেন, তখন সামরিক তরবারির সঙ্গে তাঁর হৃদয়ে ধ্বনিত হবে আধ্যাত্মিক আজান। কারণ তিনি শুধু সেনাপতি নন— তিনি আল্লাহর পথে নির্বাচিত এক নৈতিক বিপ্লবের প্রতীক।
হাদিস তাঁকে এঁকেছে অল্প কয়েকটি শব্দে, কিন্তু প্রতিটি শব্দই যেন আগুনের অক্ষর: ধর্মপরায়ণ… সাহসী… জনগণের হৃদয়ে বাস করেন এমন প্রিয়… আর সর্বোপরি—ন্যায়ের জন্য পাগল এক যোদ্ধা।
যখন পৃথিবী জুলুমের ভারে নুয়ে পড়বে, যখন শাসকের স্বৈরাচার মানুষের শিরদাঁড়া ভেঙে দেবে, তখন তিনি উঠে দাঁড়াবেন। নিজেকে সঁপে দেবেন মাহদীর হাতে। কালো পতাকা তুলে ধরবেন আকাশে— যে পতাকার ছায়ায় সমবেত হবে লাখো মুক্তিকামী আত্মা। তাঁর লক্ষ্য একটাই— বিশ্বশান্তি, ন্যায়ের রাজত্ব, মাহদীর পথ প্রশস্ত করা।
ইমাম মুহাম্মাদ বাকির (আ.)-এর মুখে তিনি অমর হয়ে আছেন: «رَجُلٌ مِنْ أَصْحَابِنَا مِنْ أَهْلِ قُمْ يَقُومُ بِأَمْرِنَا وَيَدْعُو إِلَى سَبِيلِنَا… ثُمَّ يَسِيرُ إِلَى الْكُوفَةِ فَيَكُونُ مَعَ الْقَائِمِ» (বিহারুল আনোয়ার, ৫৭/২১৬)
অর্থাৎ: “আমাদের সঙ্গীদের মধ্যে কোমের এক ব্যক্তি আমাদের আদেশ নিয়ে উঠবেন, আমাদের পথের দাওয়াত দেবেন… তারপর কুফার দিকে রওনা হবেন এবং কায়েম আলি মুহাম্মাদ (আ.)-এর সঙ্গে একাত্ম হবেন।”
এই একটি বাক্যেই লুকিয়ে আছে পুরো ইতিহাস। তিনি মাহদীর যুগের প্রথম সিঁড়ি। তিনি সেই সেতু—যিনি আধ্যাত্মিক জাগরণ ও সমাজের পুনর্গঠনের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীকে প্রস্তুত করবেন সেই মহামানবের আগমনের জন্য।
সংক্ষেপে বলতে গেলে— সৈয়দ খুরাসানী কোনো সাধারণ নাম নন। তিনি একটি আহ্বান। তিনি একটি স্বপ্ন। তিনি সেই পুরুষ—যাঁর পদধ্বনি শুনে জালিমের হৃদয় কেঁপে উঠবে, আর নির্যাতিতের চোখে জ্বলে উঠবে আশার আলো।
যেদিন তিনি উঠবেন, সেদিন পৃথিবী বুঝবে— মাহদীর সকাল আর খুব দূরে নেই।
সৈয়দ খুরাসানী: রেওয়ায়াতের বৈশিষ্ট্য এবং মহাপরিবর্তনমূলক ভূমিকা
সৈয়দ খুরাসানী হলেন এক মহান ব্যক্তিত্ব যিনি শিয়া মেহদী আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে পরিচিত। তিনি হযরত মাহদী (আ.)’র আগমনের পূর্বে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিপ্লবী ভূমিকায় আবির্ভূত হবেন এবং তাঁর নেতৃত্বে সমাজে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। শিয়া ঐতিহ্য, হাদিস এবং ধর্মীয় গ্রন্থে এই চরিত্রটির ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
সৈয়দ খুরাসানী সম্পর্কে রেওয়ায়াতের বৈশিষ্ট্য:
শিয়া মাহদী আন্দোলনের সূত্র অনুসারে, সৈয়দ খুরাসানীকে একটি ধর্মীয় নেতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যিনি খোরাসান অঞ্চল থেকে আগমন করবেন এবং হযরত মাহদী (আ.)’র প্রাক্কালে কালো পতাকা তুলে ধরবেন। তাঁর নেতৃত্বে এক বিরাট পরিবর্তন আসবে এবং তিনি পুরো সমাজকে ইসলামের আদর্শের দিকে পরিচালিত করবেন।
অনেকে এই ব্যক্তিত্বকে একটি ঐতিহাসিক এবং আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখেন। তবে, বেশিরভাগ হাদিসে সৈয়দ খুরাসানী’র শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং অন্যান্য দিকগুলো রূপকভাবে বর্ণিত হয়েছে, যা তাঁর আসল ভূমিকা এবং উদ্দেশ্যকে কেবল আধ্যাত্মিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
সৈয়দ খুরাসানীর শামায়েল:
একটি সাধারণ প্রশ্ন হলো, সৈয়দ খুরাসানী’র শামায়েল বা চেহারা কেমন হবে? হাদিসে তাঁর সম্পর্কে কিছু বর্ণনা রয়েছে:
১.কালো পতাকা: সৈয়দ খুরাসানী একটি কালো পতাকা বহন করবেন, যা তার নেতৃত্বের এবং আন্দোলনের সিম্বল হবে।
২.নির্দিষ্ট চিহ্ন: তাঁর হাতে বা বাহুতে কোনো নির্দিষ্ট চিহ্ন থাকবে (এই চিহ্নকে কিছু হাদিস বিশ্লেষকরা প্রতীকী হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন)।
৩.শোয়াইব বিন সালেহ এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক: কিছু হাদিসে উল্লেখ রয়েছে যে তিনি একজন শোয়াইব বিন সালেহ নামক ব্যক্তির সঙ্গে সহযোগিতা করবেন।
৪.হযরত মাহদী (আ.)’র সঙ্গে মিলিত হওয়া: পরবর্তীতে তিনি হযরত মাহদী (আ.)’র কাছে পৌঁছাবেন এবং তাঁর সাথে বৈয়াত (চুক্তি) করবেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টি দেওয়া দরকার: মাহদী সম্পর্কিত অধিকাংশ হাদিসে বিষয়গুলি রূপক ও প্রতীকী ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। তাই শামায়েলের বিস্তারিত চেহারা বা বাহ্যিক চিহ্নকে বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা উচিত, না যে সেগুলি বাস্তব অর্থে নিলেও তাদের গভীর অর্থ আছে যা তার ঐতিহাসিক ভূমিকা স্পষ্ট করে।
সৈয়দ খুরাসানীর ভূমিকা:
সৈয়দ খুরাসানী একটি ধর্মীয় নেতা, যিনি খোরাসান অঞ্চলে নেতৃত্বের জন্য উঠবেন। তাঁর উদ্দেশ্য বিশ্বব্যাপী ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামের আদর্শে সমাজকে আনা। তিনি জালিম সরকারগুলির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেন এবং সঠিক পথের প্রতি পৃথিবীকে আহ্বান করবেন।
১.হযরত মাহদী (আ.)’র আগমনের পূর্বে তিনি সমাজের মধ্যে যথাযথ প্রস্তুতি তৈরি করবেন যাতে মানুষ ইসলামের সঠিক পথ অনুসরণ করতে পারে।
২.একটি রাজনৈতিক এবং আধ্যাত্মিক বিপ্লব ঘটানোর চেষ্টা করবেন এবং তাঁর আন্দোলন নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে পরিচালিত হবে, যার মধ্যে সর্বশেষে হযরত মাহদী (আ.)’র বৈয়াত (চুক্তি) ঘটবে।
সৈয়দ খুরাসানী এবং ইয়ামানি:
এছাড়া, ইয়ামানি নামক একজন নেতা, যিনি ইয়েমেন থেকে উঠবেন, তাঁর সঙ্গে সৈয়দ খুরাসানী’র সম্পর্কও রয়েছে। ইয়ামানি মূলত আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় আন্দোলন পরিচালনা করবেন, যেখানে সৈয়দ খুরাসানী রাজনৈতিক ও সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজে পরিবর্তন আনবেন। উভয় নেতা একীভূতভাবে হযরত মাহদী (আ.)’র আগমনের জন্য প্রস্তুতি নেবেন এবং সমাজকে তাদের হুকুমত ও আধিকারিক প্রতিষ্ঠানের অধীনে আনবেন।
সৈয়দ খুরাসানী: তার নাম ও পরিচয়
একটি প্রশ্ন দীর্ঘকাল ধরে উঠছে তা হল সৈয়দ খুরাসানী’র নাম কী? তবে শিয়া হাদিস এবং ঐতিহাসিক উৎসগুলিতে স্পষ্টভাবে তাঁর নাম উল্লেখ করা হয়নি। হাদিসগুলো কেবল তাঁর বৈশিষ্ট্য, প্রকৃতি এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছে, যাতে ঐ সময়ের সঠিক দিকটি বোঝা যায়।
এখানে যে এক মৌলিক বিষয় রয়েছে তা হল:
- মাহদী আন্দোলন সম্পর্কিত কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা নামের সঙ্গে তাকে যুক্ত না করে, হাদিসগুলোকে শুধু আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা উচিত। কারণ হাদিস তাদের সঠিক অর্থেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে: পথের পরিপূর্ণতা এবং আল্লাহর সঠিক বিচার প্রতিষ্ঠা।
উপসংহার
শিয়া বিশ্বাস অনুযায়ী, সৈয়দ খুরাসানী হলেন এক আল্লাহর মনোনীত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, যিনি হযরত মাহদী (আ.)’র আগমনের পূর্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। তিনি একজন সিদ্ধান্তবান, বিশ্বাসী, সাহসী ও ন্যায়পন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত, যিনি খোরাসান অঞ্চল থেকে আন্দোলন শুরু করবেন এবং তার প্রচেষ্টায় পুরো সমাজকে ইমাম সঠিক (আ.)’র আগমনের জন্য প্রস্তুত করবেন। যদিও তার শামায়েল (চেহারা), সঠিক নাম এবং বিপ্লবের সময় সম্পর্কে হাদিসে বিস্তারিত আলোচনা সীমিত, তবে এই সীমাবদ্ধতা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, হাদিসের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা নয়, বরং সঠিক পথের সন্ধান দেওয়া। যদিও সৈয়দ খুরাসানি’র আন্দোলন সম্পর্কে অনেক বিশ্লেষণ রয়েছে, তবে শিয়া পন্ডিতগণ সব সময় সতর্ক করেন যে, অবিলম্বে এবং একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। আমাদের উচিত আহলে বাইত (আ.)’র নির্ধারিত পরিসীমা অনুসরণ করা। সৈয়দ খুরাসানি’র পরিচয় আসলে আল্লাহর একটি সত্যিকার পথের অনুসন্ধান, যা শেষ যুগে একটি সঠিক ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের দিক নির্দেশ করে। এটি স্পষ্ট করে যে, হযরত মাহদী (আ.)’র আগমন এবং তার শাসন কেবল তখনই সম্ভব, যখন সমাজে যথাযথ নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও সামাজিক প্রস্তুতি থাকবে।



