তাকওয়া | ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর বাণীতে মানবজীবনের আধ্যাত্মিক যাত্রা
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির: মানুষের জীবন কেবল জন্ম ও মৃত্যুর মাঝখানের একটি সময়খণ্ড নয়; বরং এটি একটি সচেতন আধ্যাত্মিক যাত্রা। এই যাত্রায় দিকনির্দেশনা, পাথেয় ও গন্তব্য—সবকিছুরই প্রয়োজন হয়। ইমাম সাজ্জাদ (আ.) তাঁর গভীর ও হৃদয়স্পর্শী দোয়াসমূহে এই সফরের রূপরেখা অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষ্যে, এই যাত্রার শ্রেষ্ঠ পাথেয় হলো তাকওয়া—যা মানুষকে আল্লাহর রহমত ও সন্তুষ্টির পথে এগিয়ে নেয়।
তাকওয়া: ভয় নয়, সচেতনতা
একটি প্রচলিত ভুল ধারণা হলো—তাকওয়া মানেই ভয়, সংকোচন বা কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণ। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে তাকওয়া কোনো কারাগার নয়; বরং এটি জ্ঞান, উপলব্ধি ও নৈতিক নির্বাচনের এক পরিশীলিত ব্যবস্থা।
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করেন-
وَ اجْعَلْ تَقْوَاکَ مِنَ الدُّنْیَا زَادِی
وَ إِلَی رَحْمَتِکَ رِحْلَتِی
وَ فِی مَرْضَاتِکَ مَدْخَلِی
صحیفه سجادیه، دعای ২১)
এই দোয়ায় মানুষের জীবনের এক অপূর্ব মানচিত্র আঁকা হয়েছে। এখানে জীবনকে দেখা হয়েছে একটি সফর হিসেবে—
- যার পাথেয় হলো তাকওয়া,
- যার পথচলা রহমতের দিকে,
- আর যার চূড়ান্ত গন্তব্য আল্লাহর সন্তুষ্টি।
সর্বোত্তম পাথেয় : সফরের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে পাথেয়ের ওপর। পবিত্র কুরআন এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা দেয়—
وَتَزَوَّدُوا فَإِنَّ خَیْرَ الزَّادِ التَّقْوَی
البقرة ১৯৭
তাকওয়া সেই নূরানী সম্বল, যা মানুষকে দুনিয়ার বিভ্রান্তি, প্রবৃত্তির দাসত্ব ও নৈতিক বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করে। এটি মানুষের অন্তরে এক ধরনের সতর্ক প্রজ্ঞা সৃষ্টি করে, যার মাধ্যমে সে বুঝতে শেখে—কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা; কোনটি কল্যাণ, কোনটি ধ্বংসের পথ।
তাকওয়া ও প্রকৃত স্বাধীনতা
বস্তুত তাকওয়া মানুষের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে না; বরং তাকে মুক্ত করে। যে ব্যক্তি তাকওয়ার আলোয় জীবন পরিচালনা করে, সে আর কামনা-বাসনা, সামাজিক চাপ কিংবা ভয়ভীতির গোলাম থাকে না।
কুরআন কারিম এ সত্যকে এভাবে ব্যক্ত করেছে—
یَا أَیُّهَا الَّذِینَ آمَنُوا إِنْ تَتَّقُوا اللَّهَ یَجْعَلْ لَکُمْ فُرْقَانًا
الأنفال ২৯
ফুরকান—অর্থাৎ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য নির্ণয়ের শক্তি—তাকওয়ারই ফসল। এই শক্তি মানুষকে সিদ্ধান্তহীনতা ও বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করে এবং তাকে আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ়চেতা করে তোলে।
তাকওয়া: জীবনের জট খুলে দেয়
মানুষের জীবনে জটিলতা, সংকট ও অস্থিরতা অবধারিত। কিন্তু তাকওয়া এই জট খুলে দেওয়ার এক অলৌকিক চাবিকাঠি। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَمَنْ یَتَّقِ اللَّهَ یَجْعَلْ لَهُ مِنْ أَمْرِهِ یُسْرًا
الطلاق ৪
যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে, তার পথ আল্লাহ সহজ করে দেন—হোক তা পার্থিব জীবন কিংবা আখিরাতের সফর।
রহমত থেকে রিজওয়ান
তাকওয়া মানুষকে শুধু রহমতের পথে নিয়ে যায় না; বরং শেষ পর্যন্ত পৌঁছে দেয় সর্বোচ্চ গন্তব্যে—রিজওয়ান-ই ইলাহী, আল্লাহর সন্তুষ্টি। এ সন্তুষ্টিই মুমিন জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য, পরম শান্তি ও চিরস্থায়ী নিরাপত্তা।
উপসংহার
মানবজীবন যদি একটি সফর হয়, তবে তাকওয়া তার শ্রেষ্ঠ পাথেয়। এটি মানুষকে অন্ধ অনুসরণ নয়, সচেতন জীবনবোধ শেখায়; ভীত সত্তা নয়, দায়িত্বশীল ও স্বাধীন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর বাণীতে তাকওয়া তাই কেবল একটি ধর্মীয় গুণ নয়—বরং মানুষের পূর্ণতা ও মুক্তির পথ।
«وَمِنَ اللَّهِ التَّوْفِيقُ»
সাফল্য তো একমাত্র আল্লাহর পক্ষ থেকেই।
পাদটীকা: সহিফা সাজ্জাদিয়া, একুশতম দোয়া



