Uncategorizedবিশেষ সংবাদবিশ্ব

ট্রাম্পকে ঘিরে ইউরোপের ভীতি স্পষ্ট সমালোচনার পথে প্রধান অন্তরায়

ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ৬ জানুয়ারি ২০২৬

ট্রাম্পকে ঘিরে ইউরোপের ভীতি স্পষ্ট সমালোচনার পথে প্রধান অন্তরায়

মিডিয়া মিহির: একটি পশ্চিমা গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে—ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি ইউরোপের ভীতি তার হস্তক্ষেপমূলক নীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও নির্ভীক সমালোচনাকে ব্যাহত করছে।

একটি পশ্চিমা গণমাধ্যম ইউরোপের ‘ট্রাম্পভীতি’কে তার হস্তক্ষেপমূলক নীতির বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ও খোলামেলা সমালোচনার পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে অভিহিত করেছে।

 ভির্টশাফ্‌ৎসভোখে পত্রিকা তার একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে, যার শিরোনাম ছিল— ট্রাম্পকে নিয়ে ইউরোপের ভীতি ব্রাসেলসের প্রকাশ্য সমালোচনার পথে অন্তরায়”, লিখেছে: যদিও ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, তবুও ব্রাসেলস এ বিষয়ে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়া থেকে বিরত রয়েছে এবং ইউরোপের মনোযোগ এখনো গ্রিনল্যান্ড ও মেরকোসুর চুক্তির দিকেই নিবদ্ধ।

ইউরোপের পক্ষ থেকে কোনো ক্ষোভপ্রকাশ, প্রকাশ্য সমালোচনা বা এমনকি শক্ত সতর্কতামূলক বক্তব্যও শোনা যায়নি। যারা মনে করেছিলেন—মাদুরোকে অপহরণের ঘটনাকে ইউরোপীয়রা ট্রাম্পের ক্ষমতাকেন্দ্রিক নীতির বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ হিসেবে নেবে—তারা ভুল প্রমাণিত হয়েছেন।

ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লাইেন সপ্তাহান্তে দেওয়া তার সংক্ষিপ্ত বিবৃতিতে কেবল বলেন, আমরা ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।”
তিনি আরও জানান, ইউরোপ শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সমর্থক এবং প্রতিটি সমাধানকেই আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়: নিঃসন্দেহে কমিশনপ্রধান একজন দক্ষ চিকিৎসক, আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ নন; তবে বিশেষজ্ঞ না হলেও সহজেই বোঝা যায় যে ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশেষ অভিযান জাতিসংঘ সনদ বা আন্তর্জাতিক আইন উভয়ের সঙ্গেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

তবুও জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎস, যিনি একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী, তিনিও ফন ডার লাইেন এবং অধিকাংশ ইউরোপীয় নেতার মতোই অস্পষ্ট ভাষায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তার বক্তব্য ছিল— এই অভিযানের আইনগত শ্রেণিবিন্যাস জটিল; আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। মানদণ্ড হিসেবে আন্তর্জাতিক আইনই বহাল রয়েছে।”

ইউরোপ সময় নিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আনুগত্যের কথা বলছে—কিন্তু বহু আগেই তারা জেনে গেছে, ট্রাম্প এসবকে খুব বেশি গুরুত্ব দেন না। ফলে নীরব প্রতিক্রিয়ার পেছনে লুকিয়ে আছে আরও কিছু কারণ। একদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও লাতিন আমেরিকার সম্পর্ক অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় ও অসম।

ট্রাম্প-অভিজ্ঞতার ছায়া

বিশেষত অতীত অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় দেশগুলো মনে করে—তীব্র সমালোচনা বা প্রকাশ্য প্রতিরোধ ট্রাম্পকে আরও বেশি ইউরোপবিরোধী অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে। শুল্ক আরোপে তার একতরফা আচরণ ভুলে যাওয়ার মতো নয়, আর বাণিজ্যিক বিরোধগুলিও এখনো অমীমাংসিত।

নানামুখী হুমকি এখনো ইউরোপীয় জনমনে সতেজ—ন্যাটো’র দ্য হেগ সম্মেলনে তিনি এমনকি সতর্ক করেছিলেন, দাবি পূরণ না হলে যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমা সামরিক জোট ত্যাগও বিবেচনা করতে পারে।

উইক্রেন, গ্রিনল্যান্ড ও মেরকোসুর প্রসঙ্গ

ইউক্রেন সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজতে গিয়ে ইউরোপকে ধারাবাহিকভাবে পাশ কাটানোর প্রবণতা ব্রাসেলস–ওয়াশিংটন সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। এছাড়া গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত করার ট্রাম্পের পুনঃপুন আহ্বানও সম্পর্কের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।

এদিকে এখনো আলোচনাধীন ইইউ–মেরকোসুর বাণিজ্যচুক্তি কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কমান্ডো অভিযানের প্রেক্ষাপটে আবারও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহেই এই দুইটি বিষয় ব্রাসেলসকে ব্যস্ত ও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

মাদুরো অপহরণের পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প যখন গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের “দাবি” পুনর্ব্যক্ত করার ইঙ্গিত দেন—তাতে পরিস্থিতির তাৎক্ষণিকতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

চুক্তির নতুন প্রেরণা

এই প্রেক্ষাপটে মেরকোসুরভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি ব্রাসেলসের কাছে নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। গত ডিসেম্বরের শীর্ষ সম্মেলনে ফ্রান্স ও ইতালির সম্ভাব্য কৃষকআন্দোলনের আশঙ্কায়—বহু ছাড় দিয়েও—সমঝোতা সম্ভব হয়নি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক শক্তিপ্রদর্শন এখন অবস্থান বদলাতে বাধ্য করছে।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বাণিজ্য কমিটির চেয়ারম্যান বার্ন্ড ল্যাঙে বলেন, এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এই চুক্তির প্রয়োজনীয়তা বেশি।

তার মতে, মেরকোসুর চুক্তি শুধুমাত্র ন্যায়সঙ্গত অর্থনৈতিক শর্তাবলীর বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক অংশীদারিত্বেরও প্রতীক। এমনকি যাঁরা আগে এই চুক্তির সমালোচক ছিলেন, তারাও মাদুরো অপহরণের পর বুঝেছেন—অন্যান্য বাণিজ্যিক অংশীদারের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের গভীর সম্পর্ক এখন সময়ের দাবি।

চূড়ান্ত পরীক্ষা

এই মাসেই একটি বড় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে—২৫ বছরের আলোচনার পরও অসম্পূর্ণ থাকা এই চুক্তির অনুমোদন শেষ পর্যন্ত আলোচ্যসূচিতে আসতে চলেছে। যদিও এটি হবে পরোক্ষ প্রতিক্রিয়া, তবুও সেটি অন্তত একটি ইঙ্গিত—
যুক্তরাষ্ট্র যখন নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক শৃঙ্খলাকে পাশ কাটায়, তার পরিণতি ইউরোপ বুঝতে শুরু করেছে।

আরও পড়ন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button