জীবনযাপনইতিহাসধর্ম ও বিশ্বাসবিশেষ সংবাদবিশ্ব

কেন হযরত আদম (আ.)-এর তওবা কবুল হলো?

ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৫

মিডিয়া মিহির: মানবজীবনের প্রকৃত মুক্তি ও শান্তি শুধু এক জায়গাতেই নিহিত—আল্লাহর রহমতের শীতল ছায়ায়। আর সেই ছায়ার নীচে পৌঁছানোর একমাত্র পথ হলো: নিজের প্রতি দয়া আর অন্যের প্রতি দয়া। যে নিজের আত্মার উপর জুলুম করে কিংবা অন্যের উপর জুলুম করে, সে আল্লাহর সেই বিশাল রহমতের সমুদ্র থেকে নিজেকেই দূরে সরিয়ে দেয়। ইতিহাসের প্রথম পৃষ্ঠায়, মানবতার প্রথম কান্না আমাদের এই পথের আলো জ্বেলে দিয়েছে।

মানবতার প্রথম আর্তনাদ

যখন আদম ও হাওয়া (আ.) নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল আস্বাদন করলেন, তখন তাঁরা শয়তানের মতো অজুহাতের আড়াল খুঁজলেন না। হতাশার অন্ধকারেও ডুব দিলেন না। বরং দু’হাত তুলে, কণ্ঠে অশ্রু মিশিয়ে, সরাসরি রবের দরবারে দাঁড়িয়ে বললেন:

رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا وَإِنْ لَمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ

হে আমাদের প্রভু! আমরা নিজেদের উপর জুলুুলুম করেছি। যদি তুমি আমাদের ক্ষমা না করো আর আমাদের প্রতি দয়া না করো—তবে আমরা চিরক্ষতিগ্রস্তদের দলেই গণ্য হব। (সূরা আল-আ’রাফ: ২৩)

এই একটি বাক্যই ছিল মানুষের প্রথম জাগরণ। এই একটি বাক্যই ছিল পাপের পরে প্রথম সত্য কথা। এই একটি বাক্যই আল্লাহর রহমতের দরজা খুলে দিল।

কারণ তাঁরা নিজেদের দোষ স্বীকার করলেন। নিজেদের উপর জুলুমের কথা মেনে নিলেন। আর আল্লাহ যিনি ঘোষণা করেছেন:

قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

বলো, হে আমার বান্দারা যারা নিজেদের উপর অত্যাচার করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সব গোনাহ ক্ষমা করে দেন। তিনিই তো পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।” (সূরা যুমার: ৫৩)

রহমতের বিস্ময়

ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর যুগে হাসান বসরী (র.) বলেছিলেন: “আশ্চর্য নয় যে কেউ ধ্বংস হয়ে গেল। আশ্চর্য যে কেউ মুক্তি পেল!”

ইমাম (আ.) মুচকি হেসে বললেন: “না। আসল আশ্চর্য এটা নয় যে কেউ মুক্তি পেল কী করে। আসল আশ্চর্য এই যে—আল্লাহর এত বিশাল রহমতের সমুদ্র থাকতে কেউ ধ্বংস হলো কী করে?!

مَنْ نَجَا فَبِرَحْمَةٍ مِنِّي، وَمَنْ هَلَكَ فَبِذُنُوبِهِ “যে মুক্তি পেল—আমার রহমতের কুড়িয়ে। যে ধ্বংস হলো—নিজের গোনাহের বোঝায়।”

রহমতের চাবিকাঠি

রাসূল (সা.)-এর কাছে এক ব্যক্তি এসে বলল, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি চাই আল্লাহ আমার প্রতি দয়া করুন।

তিনি তাকালেন, তারপর অতি মোলায়েম কণ্ঠে বললেন: اِرْحَمْ نَفْسَكَ، وَارْحَمْ خَلْقَ اللهِ، يَرْحَمْكَ اللهُ

নিজের প্রতি দয়া করো। আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি দয়া করো। তাহলে আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করবেন।”

উপসংহার:

আদম (আ.)-এর তওবা কবুল হয়েছিল বলে নয় যে তিনি নবী ছিলেন। কবুল হয়েছিল কারণ তিনি নিজের উপর জুলুমের কথা স্বীকার করেছিলেন। কবুল হয়েছিল কারণ তিনি রহমতের দরজায় করাঘাত করেছিলেন।

আজও সেই দরজা খোলা আছে। শুধু দরকার একটি সত্য কথা: “হে আল্লাহ! আমি নিজের উপর জুলুম করেছি। যে এই কথা বলতে পারে, যে নিজের প্রতি দয়া করে গোনাহ ছেড়ে দেয়, যে অন্যের প্রতি দয়া করে ক্ষমা করে দেয়— সে আল্লাহর রহমতের ছায়ায় চিরকালের জন্য আশ্রয় পায়।

আদম (আ.)-এর প্রথম কান্না আজও আমাদের কানে বাজে: “রাব্বানা যালামনা আনফুসানা… আর আল্লাহর রহমত আজও সেই কান্নার জবাবে বলে: আমি আছি। আমি ক্ষমা করি। আমি দয়া করি।

এটাই মানবতার চিরন্তন আশা। এটাই পাপীর একমাত্র পথ। এটাই আদম (আ.)-এর তওবা কবুলের গোপন রহস্য।

আরও পড়ুন 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button