কুরআন কি শিয়া, আহলে সুন্নাত ও ওহাবী সম্প্রদায়কে উল্লেখ করেছে?
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির: পবিত্র কুরআন মানবজাতির সম্মুখে একটি মাত্র নাম উচ্চারিত করেছে—ইসলাম, যা আল্লাহর প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের প্রতীক। তথাকথিত শিয়া, সুন্নী বা ওহাবী—এমন কোনো নাম সেখানে অনুপস্থিত। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পরবর্তী কয়েক দশকের মধ্যেই ইতিহাসের করাল গ্রাসে মুসলিম উম্মাহ খণ্ডিত হয়ে পড়ল। কে প্রকৃত ইসলামের ধারক-বাহক? এই প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণে মানুষ নিজেরাই নিজেদের মধ্যে নূতন নূতন পথ রচনা করে ফেলল। আজ আমরা সেই প্রথম বিভেদের মুহূর্তে ফিরে যাই, যেখান থেকে শিয়া, সুন্নী এবং পরবর্তীকালে ওহাবী মতবাদের জন্ম হয়েছে।
কুরআন শরীফে শিয়া, সুন্নী বা ওহাবিয়তের কোনো নামোল্লেখ নেই। তথাপি এই মতবাদসমূহ কীভাবে উদ্ভূত হল এবং মানুষ কেন তা অনুসরণ করে—এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় কুরআনের স্পষ্ট ঘোষণায়:
إِنَّ الدِّينَ عِنْدَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ “নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট গৃহীত ধর্ম কেবল ইসলাম।” (সূরা আলে ইমরান: ১৯)
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ “যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম অন্বেষণ করবে, তা কখনো কবুল হবে না।” (সূরা আলে ইমরান: ৮৫)
সুতরাং মানুষের একমাত্র কর্তব্য কুরআন ও রাসূলের সুন্নাহর অনুসরণ। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওফাতের পর যখন নেতৃত্বের প্রশ্ন উঠল, তখন মানবীয় দুর্বলতা, রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা একত্রিত হয়ে উম্মাহকে বিভক্ত করে দিল। প্রত্যেক দলই দাবি করতে লাগল, “আমরাই প্রকৃত ইসলামের পতাকাবাহী।”
শিয়া মতবাদের উৎপত্তি
রাসূলুল্লাহ (সা.) বারংবার স্পষ্ট করে গিয়েছিলেন যে, তাঁর পরে উম্মাহর নেতৃত্ব আহলে বাইতের হাতে থাকবে। হাদীসে সাকালাইন, হাদীসে মানযিলা, ঘাদীরে খুমের ঘোষণা—এই সকল প্রমাণ আজও শিয়া সম্প্রদায়ের হৃদয়ে জ্বলজ্বল করে।
ইন্তেকালের মাত্র তিন দিন পূর্বে নবী করীম (সা.) বলেছিলেন: “আমার জন্য কাগজ ও কলম আনো, আমি এমন কিছু লিখে দেব যার পর তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবে না।” কিন্তু সেই কক্ষে উপস্থিত কতিপয় সাহাবী আপত্তি তুললেন। উমর ইবনুল খাত্তাব বললেন, নবীজী অসুস্থ, তাঁর উপর বোঝা চাপাবেন না; আল্লাহর কিতাবই আমাদের জন্য যথেষ্ট। এই কথায় তর্ক উঠল, বিশৃঙ্খলা দেখা দিল এবং শেষ পর্যন্ত সেই ওসিয়া লেখা হল না। ইবনে আব্বাস (রা.) পরবর্তীকালে কাঁদতে কাঁদতে বলতেন: “বৃহস্পতিবার! হায় বৃহস্পতিবার! সেদিনই উম্মাহর সর্ববৃহৎ বিপর্যয় ঘটেছে।”
এই ঘটনাই ছিল প্রথম বীজ। রাসূলুল্লাহর ইন্তেকালের পর সাকীফায় বনু সা‘ঈদাহর ছায়ায় যখন আবু বকরকে খলীফা নির্বাচিত করা হল, তখন হযরত আলী (আ.) ও তাঁর অনুসারীগণ এই সিদ্ধান্তকে নবীজীর স্পষ্ট নির্দেশের বিরুদ্ধে মনে করলেন। যারা আলী (আ.)-কে নবীর নিযুক্ত উত্তরাধিকারী বলে বিশ্বাস করলেন, তারাই শিয়া। নবী করীম স্বয়ং তাঁদের “শী‘আতু আলী” নামে সম্মানিত করেছিলেন।
সুন্নী মতবাদের উৎপত্তি
রাসূলুল্লাহর যুগে “সুন্নী” বলে কোনো পরিচয় ছিল না। প্রথমদিকে তারা ছিলেন “আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ” বা খলীফাদের অনুসারী। হযরত উসমানের শাহাদাতের পর তাঁর সমর্থকদের “উসমানিয়া” বলা হতো, আর হযরত আলী (আ.)-এর সমর্থকদের “আলাভিয়া”। আব্বাসীয় খিলাফতের সময়ে “আলাভিয়া” পুনরায় “শিয়া” নামে পরিচিত হল এবং বাকি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজ নিজেদের “আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত” নামে অভিহিত করতে লাগল। এইভাবে “সুন্নী” পরিচয় ঐতিহাসিকভাবে গড়ে উঠল।
ওহাবী মতবাদের উৎপত্তি
ওহাবিয়ত সুন্নী মতবাদেরই একটি আধুনিক শাখা। এর প্রবর্তক শাইখ মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল ওহাব (মৃত্যু: ১২০৬ হিজরী/১৭৯২ খ্রিস্টাব্দ)। তিনি তাওহীদের অতি কঠোর ব্যাখ্যা পেশ করলেন এবং শাফা‘আত, তাওয়াসসুল, কবর যিয়ারত ও সুফী তরীকাসমূহকে শিরক আখ্যা দিলেন। তাঁর দাওয়াত প্রথমে নজদের বিভিন্ন শহর থেকে বিতাড়িত হল। অবশেষে দির‘ইয়্যায় মুহাম্মাদ ইবন সউদের সঙ্গে জোট বেঁধে তিনি রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি লাভ করলেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের গোপন সমর্থনে এই আন্দোলন বিস্তার লাভ করল এবং আধুনিক সৌদি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় মতবাদে পরিণত হল।
উপসংহার
ওহাবিয়তের জন্ম দ্বাদশ হিজরী শতাব্দীতে; কুরআন ও সুন্নাহর যুগ থেকে তা প্রায় এগারো শতাব্দী পরের ঘটনা। শিয়া ও সুন্নী বিভেদ প্রথম শতাব্দীতেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্নে সূচিত হলেও উভয়েই নিজ নিজ দাবির সমর্থনে কুরআন-হাদীস উপস্থাপন করে। কিন্তু ওহাবিয়তের মতো কঠোর সংস্কারবাদী আন্দোলনের কোনো স্পষ্ট ভিত্তি কুরআন বা প্রথম তিন শতাব্দীর সালাফে সালেহীনের জীবনে পাওয়া যায় না।
ইসলাম কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহতেই সম্পূর্ণ। মুমিনের দায়িত্ব হল নিরপেক্ষ মনে, গভীর গবেষণার সহিত সেই পথ অনুসরণ করা, যা কুরআনের আলোকে সর্বাধিক সত্য ও ন্যায়সঙ্গত। কোনো দলের নামে নয়, কেবল “মুসলিম” নামেই আমাদের পরিচয়:
قُلْ إِنَّنِي هَدَانِي رَبِّي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ دِينًا قِيَمًا مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ۚ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ “বলো, আমার প্রতিপালক আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করেছেন—সুদৃঢ় ধর্ম, ইবরাহীমের সোজা মিল্লাত। তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।” (সূরা আল-আন‘আম: ১৬১)
অতিরিক্ত অধ্যয়নের জন্য প্রস্তাবিত গ্রন্থসমূহ
১. ওহাবিয়ান — আলী আসগর রেজওয়ানী
২. শিয়া ইতিহাস ও ইসলামের বিভিন্ন মতবাদ — ড. মোহাম্মদ জওয়াদ মাশকূর
৩. যে পথে আমি হেদায়াত লাভ করলাম — সাইয়্যেদ মোহাম্মদ তিজানী
۴. আল-মুরাজআত — সাইয়্যেদ শারফুদ্দীন আমেলী
পাদটীকা
১.আলে ইমরান : ১৯
২. আলে ইমরান : ৮৫
৩.মায়েদা : ৬৭
৪.নিসাবুরি, হাকেম মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ — আল-মুস্তাদরাক আলা সাহিহাইন, দারুল-মা‘রিফাহ, বৈরুত, অপ্রকাশিত সাল, খণ্ড ৩, পৃ. ১১০
৫. নিসাবুরি, মুসলিম ইবনে হাজ্জাজ — সাহিহ মুসলিম, দারুল-ফিকর, বৈরুত, অপ্রকাশিত সাল, খণ্ড ৭, পৃ. ১২০
৬. ইবন আসীর — আসদুল গাবাহ, তেহরান, আসমাঈলিয়ান, অপ্রকাশিত সাল, খণ্ড ৫, পৃ. ২০৫
৭ বুখারি, মুহাম্মদ ইবনে ইসমাইল — সাহিহ বুখারি, দারুস-সা’ব, বৈরুত, অপ্রকাশিত সাল, খণ্ড ৩, পৃ. ৯১
৮ বুখারি, সাহিহ বুখারি ৩/৯১, দারুস-সা’ব, বৈরুত; এবং নিসাবুরি, মুসলিম — সাহিহ মুসলিম, ৫/৭৬, দারুল-মা‘রিফাহ, বৈরুত, অপ্রকাশিত সাল
৯. শায়খ তুসি — মিসবাহুল মুতা’হিদ, পৃ. ১৬, মফতাহ আল-শিয়া ইনস্টিটিউট, বৈরুত, প্রথম সংস্করণ ১৪১১ হি.; এবং মুত্তাকি হিন্দি — কানযুল উম্মাল, খণ্ড ১৩/১৫৬, হাদিস ৩৬৪৮৩, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত
১০. বাইয়্যিনা : ৮
১১. সিউতি, জালালুদ্দিন — আদ-দুররুল মানসুর, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৭৯; এবং গায়াতুল মারাম, পৃ. ৩২৬
১২. আলী রাব্বানী গোলপায়েগানি — ফিরাক ও মাযাহিবে কালামি, পৃ. ১৬৮, কোম, আলেমদের আন্তর্জাতিক কেন্দ্র
১৩. একই গ্রন্থ, পৃ. ৩০৫; এবং জাফর সুভহানি — বুহূস ফিল মিলাল ওন নিহাল, খণ্ড ৪/৩৩৪, মুআসসাসাতুন নাশরুল ইসলামি, তৃতীয় সংস্করণ, ১৪১৪ হি.
১৪. মুগনিয়া, মুহাম্মদ জাওয়াদ — হাযিহিয়াল ওহাবিয়্যাহ, দারুল হাকিকাহ, দ্বিতীয় সংস্করণ, ১৪১৪ হি., পৃ. ৮৭
১৫.একই
১৬. ফাতেহ আবাদি, রেজা — ওহাবিয়তের জন্মে ঔপনিবেশিকতার ভূমিকা, দৈনিক জুমহুরিয়্যে ইসলামী প্রকাশন, প্রথম সংস্করণ ১৩৭৫ শামসি, পৃ. ৫৬
[১৭.কানুজি, সিদ্দীক হাসান — আবজাদুল উলুম, খণ্ড ৩/১৯৮, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ১৯৯৮; উদ্ধৃতি: ইবনে আবিদিনের হাশিয়া



