কুরআনজীবনযাপনধর্ম ও বিশ্বাসবিশেষ সংবাদবিশ্ব

কিয়ামত কি আল্লাহর কাজের শেষ পৃষ্ঠা?

ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন । প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৫

মিডিয়া মিহির: আল্লাহর সৃষ্টি কোনো বন্ধ দরজার গল্প নয়। কেয়ামতের আগুন নিভে গেলেও তাঁর কলমের কালোশ কখনো শুকায় না। এক আকাশ ভেঙে পড়লে অন্য আকাশে আবার নতুন আলো জন্ম নেয়—কারণ আল্লাহর সৃষ্টির স্রোত থেমে থাকা মানেই আল্লাহকে মানুষ ভেবে ভুল করা।

এমন এক সময়ে যখন চিন্তার জটিলতা ও নানান আকিদাগত সংশয় সত্য–সন্ধানী বহু মানুষের মনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে, মৃত্যুর পরের জগতের প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন মানবমনে সবচেয়ে প্রাচীন ও মৌলিক উদ্বেগগুলোর একটি হয়ে রয়েছে।

মানুষের অন্তরে এই প্রশ্ন যুগে যুগে আলোড়ন তুলেছে—মৃত্যুর পর কী আছে? কেমন সেই জগত? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দার্শনিকেরা লিখেছেন গ্রন্থ, কবিরা রচনা করেছেন কবিতা, আর ধর্মীয় শিক্ষায় এসেছে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা। তবুও সংশয় থেকে যায়, কারণ মৃত্যু মানুষের কাছে অদেখা এক সীমান্ত।

এই গভীর ও সূক্ষ্ম বিষয়টি বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করার জন্য আমরা দীন–শিক্ষা ও ধর্মীয় সংশয়–নিরসনের বিশেষজ্ঞ হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমীন রেজা পুর ইসমাঈল–এর সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁর আলোচনায় উঠে এসেছে—মৃত্যুর পরের জগত কেবল ভয় বা রহস্য নয়, বরং আল্লাহর রহমত ও ন্যায়বিচারের প্রতিফলন।

এখন সেই আলাপচারাই আপনাদের জন্য উপস্থাপন করা হলো—একটি যাত্রা, যেখানে মানুষের প্রাচীনতম প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে বিশ্বাস, জ্ঞান ও অন্তরের আলো দিয়ে।

মানবমনের প্রাচীনতম প্রশ্নগুলোর একটি হলো—মৃত্যুর পর কী আছে, নতুন কোনো সৃষ্টি হবে কি না। এ প্রশ্নকে দেখা যায় দু’টি জানালা দিয়ে: বিবেকের আলো এবং ওহীর আলো।

 প্রথম জানালা — বিবেকের আলো

আল্লাহ মানুষকে যে বুদ্ধি দিয়েছেন, তা বলে: সম্ভাবনা দু’দিকেই খোলা। কেয়ামতের নির্দিষ্ট মুহূর্তে কিংবা তারও পরে, আল্লাহ চাইলে অন্য কোনো মহাবিশ্বে, অন্য কোনো স্তরে নতুন সৃষ্টির জন্ম দিতে পারেন। হয়তো এই মুহূর্তেই, কোনো দূর গ্যালাক্সির নিঃশব্দ কোণে বা অদৃশ্য কোনো মাত্রার গভীরে স্বাধীন ইচ্ছার অধিকারী প্রাণী হাঁটছে, ভাবছে, স্বপ্ন দেখছে, প্রেমে পড়ছে—আর তার অজান্তেই আল্লাহর রহস্যময় খেলায় অংশ নিচ্ছে। বুদ্ধি এতে কোনো বাধা দেয় না। আবার বুদ্ধি এটাও বলে: যদি এই মানব-অধ্যায় শেষ হয়ে যায় এবং আর কোনো নতুন মানবজাতি না আসে, তাতেও কোনো অসঙ্গতি নেই। উভয় সম্ভাবনাই আল্লাহর ইচ্ছার সামনে সমানভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।

 দ্বিতীয় জানালা — ওহীর আলো

ওহির ভাষা এখানে নীরব। কুরআন সরাসরি বলে না—“হবে” বা “হবে না”—শুধু এক ঝলক আলো দেখায়।

সূরা জিন-এর ১৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

خَلْقٌ جَدِيدٌএক নতুন সৃষ্টি

এ শব্দেই যেন ইঙ্গিত আছে অসীম সম্ভাবনার।

ইমাম বাকের (আ.) বলেছেন: “আল্লাহর নূরময় আরশে ঝুলছে লক্ষ লক্ষ আলম, লক্ষ লক্ষ আদমের হাসি-কান্না লিখে রাখা আছে। তোমরা তো সেই দীর্ঘ কাহিনির সর্বশেষ পাতার নাম মাত্র।

তবুও কুরআন স্পষ্টভাবে কিছু বলেনি। কারণ এই জানার—বা না জানার—ভিতরে আমাদের মুক্তির কোনো চাবি নেই।

 মানুষের দায়িত্ব

কুরআন যা স্পষ্ট করে বলেছে, তা হলো:

১.তোমার উৎস কোথায়,

২.তোমার গন্তব্য কোন দিকে,

৩.এবং এই মুহূর্তে তোমার হাতে কী দায়িত্ব আছে।

বাকিটা আল্লাহর গোপন বাগান—যেখানে তিনি যখন চান নতুন ফুল ফোটান, যখন চান নিঃশব্দে রাত নামিয়ে দেন। এ সবই আমাদের জ্ঞানের সীমানার বাইরে।

কিয়ামত—শেষ অধ্যায় নয়, এক অনন্ত কাব্যের কমা

কিয়ামত কি আল্লাহর কাজের শেষ পৃষ্ঠা? না। কারণ আল্লাহর কলম কখনো থামে না। এই নীল আকাশ আর সবুজ ধরিতী যখন গুটিয়ে নেয়া হবে, তখনো তাঁর সৃষ্টির বাগানে নতুন নতুন ফুল ফুটবে—শুধু অন্য আকাশে, অন্য মাটিতে, অন্য আলোতে। ইমাম মুহাম্মদ বাকের (আ.)-এর এক হৃদয়–নাড়া–দেওয়া বাণীতে তিনি বলেছিলেন: «إِنَّ لِلَّهِ أَلْفَ أَلْفِ عَالَمٍ وَأَلْفَ أَلْفِ آدَمَ…» আল্লাহর আছে হাজার হাজার—বরং লক্ষ লক্ষ—জগত, আর লক্ষ লক্ষ আদম। আর তোমরা হলে সেই দীর্ঘ শৃঙ্খলার সর্বশেষ আদমের সন্তান, সর্বশেষ জগতের বাসিন্দা।

অর্থাৎ—আমাদের পৃথিবী যখন কেয়ামতের আগুনে ছাই হয়ে যাবে, তখনও কোনো দূর মহাবিশ্বের নিস্তব্ধতায় নতুন কোনো আদম প্রথম কান্না কাঁদবে, প্রথম সিজদায় মাথা রাখবে। আর সে বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করবে, “হে আল্লাহ, আমিই কি প্রথম? আর আল্লাহর মমতার হাসি জবাব দেবে, “না বাছা, তোমার আগে অসংখ্য বার আমি এই সৃষ্টি করেছি, তোমার পরেও করব—চিরকাল।এই দুনিয়া আল্লাহর সৃষ্টির শেষ অধ্যায় নয়—এ কেবল মহাকাব্যিক এক দীর্ঘ কাহিনির ছোট্ট পৃষ্ঠা। যেমন কোনো মহাকবি বই শেষ করলে কলম ফেলে দেন না—নতুন পৃষ্ঠা খোলেন।

কেয়ামতের পরেও সৃষ্টি নদী বয়

আমাদের আকাশ যখন গুটিয়ে নেয়া হবে, পাহাড় তুলোর মতো উড়ে যাবে, সমুদ্র আগুন হয়ে উঠবে—তখনও কোনো দূর বাস্তবে, অন্য কোনো নক্ষত্রের কোলে, আরেকটি নবজাতক জন্ম নেবে। আর আল্লাহ তার কপালে চুমু দেবেন, যেমন তিনি করেছিলেন আমাদের প্রথম পিতা আদমের গালে।

আল্লাহর সৃষ্টি কখনো থামে না। কেয়ামত আমাদের গল্পের শেষ বিন্দু নয়, এ হলো মাত্র একটা নরম, দীর্ঘশ্বাসের কমা।

যেদিন আকাশ গুটিয়ে নেওয়া হবে যেমন পুরনো কাগজ গোটানো হয়, যেদিন তারারা ঝরে পড়বে যেমন বৃষ্টির ফোঁটা, যেদিন সময় নিজের গলা টিপে ধরে চুপ করে যাবে— সেদিনও আল্লাহর কলম থামবে না।

আল্লাহকে কখনোই মানুষের মতো কল্পনা করা যায় না। মানুষ কাজ করে ক্লান্ত হয়, বিশ্রাম নেয়, অবসরে বসে থাকে। কিন্তু আল্লাহর ক্ষেত্রে এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। তিনি কোনো প্রকল্প শেষ করে বলেন না—“হয়ে গেল, এবার অবসর।” কারণ তাঁর সত্তাই সৃষ্টি, তাঁর অস্তিত্বই অবিরাম কার্যধারা।

আল্লাহ কখনো ‘বেকার’ হন না। তাঁর দৃষ্টি যেখানে পড়ে, সেখানেই নতুন জগত প্রস্ফুটিত হয়। তাঁর করুণার হাসি যেখানে ঝরে, সেখানেই নতুন জান্নাত জন্ম নেয়। জান্নাতের বাসিন্দারা ক্রমশ আরো ঊর্ধ্বে উঠবে, আরো নিকটে আসবে। আর যাদের জন্য রহমতের দরজা খোলা থাকবে, তারাও ধীরে ধীরে আলোর দিকে অগ্রসর হবে।

কোনো সৃষ্টি কখনো আল্লাহর হাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না। তাঁর সত্তা থেকে নিরন্তর সৃষ্টির ধারা প্রবাহিত হয়, যেন এক অনন্ত নদী—যার কোনো শেষ নেই, কোনো বিরতি নেই।

কুরআনের শিক্ষাঃ আমাদের কাজ—ফিরে যাওয়া; বাকিটা তাঁর

কুরআন এই বিষয়ে বিস্তারে বলে না, কারণ এই প্রশ্ন আমাদের মুক্তির পথে একফোঁটা উপকারও করে না। কুরআনের বার্তা স্পষ্ট— তোমার কাজ আমাকে খুঁজে পাওয়া; বাকিটা আমার। আল্লাহ কী করবেন, কীভাবে সৃষ্টি চালিয়ে যাবেন—এ জিজ্ঞাসা আমাদের জন্য নয়। কারণ যদি আমরা তাঁকে সত্যিই চিনি, তবে বুঝব—
যিনি নিজেই অসীম প্রেম, তিনি কখনো ‘কাজ শেষ’ বলে বসে থাকেন না।
তিনি সৃষ্টি করেন, ভালোবাসেন, টেনে নেন—চিরকাল।

শেষ কথা: আল্লাহর সৃষ্টি নদী থামে না। কেয়ামত কোনো পর্দা নয়—আরো বৃহৎ পর্দার ওপারে এক নতুন সূর্যোদয়ের প্রবেশদ্বার। তিনি ছিলেন, আছেন, থাকবেন— আর তাঁর প্রেমের নতুন নতুন প্রজন্ম জন্ম নেবে অনন্তকাল ধরে।

আরও পড়ুন 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button