কুরআনধর্ম ও বিশ্বাসবিশেষ সংবাদবিশ্ব

কিভাবে টাকা দ্বারা কোরআনের আয়াত নিয়ন্ত্রণ করা হয়?

ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫

মিডিয়া মিহির: ইরানের বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন ও মারজায়ে তাকলীদ আয়াতুল্লাহিল উজমা জাওয়াদী আমুলী বলেছেন, কিছু ক্ষমতালোভী গোষ্ঠী ধর্মের সত্যকে বন্দী করে কোরআনের আয়াতকে নিজেদের স্বার্থে ব্যাখ্যা করেছে, কাল্পনিক হাদিস তৈরি করেছে এবং জনগণের মনোবৃত্তি বিকৃত করেছে। এ ধরনের পরিকল্পিত বিকৃতি খারিজি মতাদর্শের জন্ম দেয় এবং সমাজকে কাঠামোগত বিপথগামী করে তোলে।

ধর্মের বন্দীশালা: বিকৃতির অন্ধকার কারাগার

ইরানের শীর্ষস্থানীয় মারজায়ে তাকলীদ,আয়াতুল্লাহিল উজমা আব্দুল্লাহ জাওয়াদী আমুলী একটি অগ্নিঝরা বক্তৃতায় “اسارت دین با تحریف” বা “বিকৃতির হাতে ধর্মের বন্দীত্ব” বিষয়টি এমন গভীরতায় তুলে ধরেছেন যে, শ্রোতার হৃদয়ে যুগ যুগের বেদনা জেগে ওঠে। তিনি বলেন: হে মালিক! «إِنَّ هَذَا الدِّینَ قَدْ کَانَ أَسِیرًا فِی أَیْدِی الْأَشْرَارِ» “এই দীন একসময় দুষ্কৃতকারীদের হাতে বন্দী হয়ে গিয়েছিল।

তাঁর কথায়, ক্ষমতার লোভে অন্ধ গোষ্ঠী ইসলামকে নিজেদের স্বার্থের কারাগারে আবদ্ধ করেছিল। তারা কুরআনের আয়াতের আলোকে ছায়া ফেলত, অর্থকে বাঁকিয়ে দিত, প্রয়োগকে নিজেদের মতো করে নিত, শানে নুযূলকে উল্টে-পাল্টে দিত। এমনকি নিজেদের পক্ষে নতুন হাদীস গড়ে তুলত। এই সুপরিকল্পিত বিকৃতিই একদিন খারিজী বিষবৃক্ষের বীজ বপন করেছিল এবং সমাজের শিরায় শিরায় বিষ ঢেলে দিয়েছিল।

অর্থের কাছে বিবেকের আত্মসমর্পণ

আয়াতুল্লাহ একটি হৃদয়বিদারক ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করেন:

এক ব্যক্তির কাছে গিয়ে কেউ বলল, “এই এক লাখ দিরহাম নাও। আর বলে দাও—যে আয়াতটি কাফিরদের জন্য নাযিল হয়েছে, সেটি হযরত আলী ইবনে আবী তালিব (আ.)-এর উপর প্রযোজ্য।

প্রথমে সে প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু যখন দুই লাখ, তিন লাখ, চার লাখ দিরহামের স্তূপ তার সামনে এলো, তখন তার জিহ্বা বেঁকে গেল। সে বলে উঠল: “আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে নিজ কানে শুনেছি, এই আয়াতটি আলী ইবনে আবী তালিবের জন্য নাযিল হয়েছে।

একইভাবে উমাইয়া শাসকরা সামুরা ইবনে জুন্দাবের হাতে সোনার থালা তুলে দিয়ে বলেছিলেন: “বলো, যে আয়াতে আল্লাহ হযরত আলীর (আ.) আত্মোৎসর্গের প্রশংসা করেছেন— «وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْرِي نَفْسَهُ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ» —সেটি আব্দুর রহমান ইবনে মুলজামের (আলীর হত্যাকারী) জন্য নাযিল হয়েছে!

এই অর্থের ঝনঝনানি, এই বিবেকের নিলাম, এই সত্যের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাই খারিজীদের জন্ম দিয়েছিল। আয়াতুল্লাহ বলেন: “যদি এই সোনার মোহরের শব্দ না থাকত, খারিজীরা এক মুহূর্তের জন্যও মাটি থেকে মাথা তুলতে পারত না।

যুগ যুগ ধরে চলমান সতর্কতা

আজও তিনি সতর্ক করেন— যখনই ক্ষমতা ও অর্থের লোভ ধর্মের গলায় শিকল পরায়, তখনই সমাজের গভীরে এক অদৃশ্য ক্যান্সার জন্ম নেয়, যার নাম কাঠামোগত বিপথগামিতা।

কুরআনের আসল আলো, হাদীসের আসল প্রেক্ষাপট, শানে নুযূলের পবিত্রতা—এসব যদি আমরা হারিয়ে ফেলি, তবে আমরাই ধর্মকে আবার বন্দী করব। আর ধর্ম যদি বন্দী হয়, তবে মানুষের আত্মা চিরকালের জন্য শৃঙ্খলিত থেকে যাবে।

এই বাণী কেবল অতীতের জন্য নয়, এ যুগের প্রতিটি জাগ্রত বিবেকের জন্য। ধর্মকে মুক্ত রাখতে হলে সত্যকে মুক্ত রাখতে হবে। আর সত্যকে মুক্ত রাখতে হলে—কোনো মূল্যে হোক—অর্থ ও ক্ষমতার কাছে মাথা নত করা যাবে না। কখনোই নয়।

আরও পড়ুন

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button