ইরানিদের ইসলামগ্রহণের ইতিহাস: জবরদস্তি না স্বেচ্ছা স্বীকৃতি?
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন । প্রকাশ: ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫
মিডিয়া মিহির: ইরানে ইসলামের আগমন কোনো হঠাৎ ঘটনা ছিল না, আর কেবল তলোয়ারের ঝনঝনানিতেই ঘটেনি। এটি ছিল পরিচয়, সংলাপ, বোঝাপড়া ও স্বেচ্ছা নির্বাচনের দীর্ঘ যাত্রা। প্রাচীন ও সভ্যতাসম্পন্ন ইরানীয় জনগণ নতুন ধর্মকে প্রথমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে, ভেবেছে-বুঝেছে—তারপরই নিজেদের ইচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেছে।
ইরানে ইসলামের প্রবেশ ছিল না কোনো ক্ষণিক বিষয়, আর শুধুই তলোয়ারের শক্তিতে সংঘটিত ঘটনা নয়; বরং এটি ছিল চেনা-জানা, পারস্পরিক যোগাযোগ এবং স্বাধীন নির্বাচনের এক দীর্ঘ সফর। প্রাচীন সংস্কৃতিসম্পন্ন ইরানীয়রা প্রথমে এই নতুন ধর্মকে মূল্যায়ন করেছে এবং পরে নিজেদের ইচ্ছায় তা গ্রহণ করেছে।
যখন ইরান ও ইসলামের ইতিহাসের কথা ওঠে, তখন যে প্রশ্নটি সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও জটিলভাবে কৌতূহলী মানুষকে ভাবায় তা হলো: ইরানিরা কি এক রাতেই মুসলমান হয়ে গিয়েছিল, নাকি এই মহাপরিবর্তন ছিল দীর্ঘ ও বহুস্তরীয় একটি কাহিনি?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ইতিহাস বোঝার চাবিকাঠিই নয়, বরং আমাদের আজকের পরিচয় বোঝার জানালাও খুলে দেয়।
ইতিহাস যা বলছে
ইতিহাসে উল্লেখ আছে যে ইরানিরা তুলনামূলকভাবে সহজভাবেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল, যদিও এই গ্রহণ-প্রক্রিয়া সময় নিয়েছিল। তবে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় একটি বড় পার্থক্য ছিল— ইরানে অধিকাংশ মানুষ তিন থেকে চার শতাব্দীর মধ্যে মুসলমান হয়।
কিন্তু স্পেনের মতো জায়গায় স্থানীয়রা প্রধানত খ্রিস্টানই রয়ে যায়, এবং পরে আবার খ্রিস্টান শাসনও প্রতিষ্ঠিত হয়। কোথাও কোথাও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান হলেও বড় খ্রিস্টান সম্প্রদায় টিকে ছিল।
গবেষক اشپولر (এশপুলার) লিখেছেন— অধিকাংশ ইরানি খুব কম সময়ে, বিজেতাদের উল্লেখযোগ্য জবরদস্তি ছাড়াই ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু ইরাক, সাম, ফিলিস্তিন, মিশর ও স্পেনে খ্রিস্টান সম্প্রদায় বহু শতাব্দী ধরে টিকে ছিল এবং কোথাও কোথাও শেষ পর্যন্ত মুসলমানদের ওপরও প্রাধান্য পায়।” (ইরানের ইতিহাস ১/২৩৯-২৪০)
অনেক ঐতিহাসিক বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে বিপুলসংখ্যক ইরানি দ্রুত ইসলামের দিকে ঝুঁকেছিল। যদিও বহু শহরে জরথুষ্ট্রীয়রা দুই থেকে চার শতাব্দী পর্যন্ত টিকে ছিল। ফার্স ছিল তাদের প্রধান কেন্দ্র—সেখানে চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জরথুষ্ট্রী ছিল—এ তথ্য “অহসানুল তাকাসিম”-এর কাছে আমরা ঋণী (২/৬৪০)।
কেন ইরানিরা ইসলাম গ্রহণ করেছিল?
১.সাংস্কৃতিক কারণ — চিন্তার আকর্ষণ
এই বড় পরিবর্তনের অন্যতম কারণ ছিল— ইসলামের বৌদ্ধিক ও নৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব জরথুষ্ট্রী ধর্মের তুলনায় অধিক গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠা।
জরথুষ্ট্রী ধর্ম সাসানীয় শ্রেণিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে একধরনের আভিজাত্যকেন্দ্রিক ধর্মে পরিণত হয়েছিল। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে ইসলামের সাম্যবাদী ও ন্যায়নিষ্ঠ বার্তাকে বেশি আকর্ষণীয় মনে হওয়াটা স্বাভাবিক ছিল—যদি অন্যান্য শর্তও অনুকূলে থাকে।
মুতাহারী লিখেছেন— ঐ সময় ইরানের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অবস্থা এমন ছিল যে মানুষ নতুন বার্তার জন্য তৃষ্ণার্ত ছিল, যেন মুক্তির প্রতীক্ষায় দিন কাটাচ্ছিল।” (১৩৬২ শ., পৃ. ৭২)
২.সামরিক কারণ — আধিপত্যের ছায়া
সামরিক বিজয়ও একটি প্রভাবক ছিল। মুসলমানদের রাজনৈতিক বিজয় সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় আকর্ষণ বাড়াতে ভূমিকা রাখে। তবে মনে রাখতে হবে—
অনেক অঞ্চলে কোনো সামরিক দখল ছাড়াও ইসলাম বিস্তার লাভ করেছে।
গিলান ও দেইলেমে মুসলমানদের সরাসরি সামরিক প্রভাব দীর্ঘদিন ছিল না; তারা দুই শতাব্দী নিজ ধর্মে টিকে ছিল। পরে নাসের আতরুশের মতো ব্যক্তিত্ব সাংস্কৃতিক প্রভাবের মাধ্যমে ইসলাম প্রচার করেন। রাজনৈতিক পরাজয় সাধারণত সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের পথ খুলে দেয়—তবে আবারও বলি, অন্য শর্তগুলো থাকলে তবেই তা কার্যকর হয়।
৩.রাজনৈতিক কারণ — পুরোনো ব্যবস্থার পতন
সাসানীয় সাম্রাজ্য—যা জরথুষ্ট্রী ধর্মের রাজনৈতিক ভিত্তি ছিল—ধ্বংস হয়।
সে রাষ্ট্র ছিল ধর্মতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থা। নতুন ধর্মভিত্তিক শক্তির আগমনের ফলে পূর্বতন ধর্ম তার রাজনৈতিক আশ্রয় হারায় এবং দুর্বল হয়ে পড়ে।
৪.সামাজিক কারণ — আরব বসতি ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কারণ ছিল— আরবদের ইরানে স্থায়ী বসতি স্থাপন।
বিভিন্ন আরব গোত্র ইরানের শহরগুলোতে বসতি গড়ে এবং ধীরে ধীরে ইসলামের প্রচার করে। কোথাও গোত্রভিত্তিক, কোথাও ব্যক্তিভিত্তিক বসতি গড়ে ওঠে।
অনেক শহরে আরব বংশোদ্ভূত আলেম, সাহাবি ও তাবেঈন শিক্ষা ও তর্কের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারে ভূমিকা রাখেন।
ইয়াকুবির আল-বুলদান-এ এসব বসতি বিস্তারের বর্ণনা আছে। কোম শহরে আশআরী গোত্র বসতি গড়ে—তারা শুধু ইসলাম নয়, শিয়াবাদেরও প্রচার করে। প্রথমে স্থানীয়দের বিরক্তি থাকলেও সময়ের সঙ্গে তারা সহাবস্থান শিখে নেয়।
মানুষ বলতে শুরু করে— তারা আমাদের সঙ্গে মিশে গেছে, আমরা তাদের সঙ্গে বসবাস করছি; আমরা তাদের থেকে নিরাপদ, তারাও আমাদের থেকে নিরাপদ।(তাবারি ৩/৫৯৬)
আরবরা বসতি স্থাপনের পাশাপাশি মসজিদ নির্মাণ শুরু করে। অনেক জায়গায় এগুলো অগ্নিমন্দিরের স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়। সময়ের সাথে সাথে জরথুষ্ট্রীদের প্রভাব কমে আসে।
স্থানীয় দেহকান ও অভিজাতদের ভূমিকা
এখানে ‘দেহকান’ বলতে গ্রামের প্রধান, জমিদার এবং ভূমির মালিক শ্রেণিকে বোঝানো হয়েছে। ইতিহাসবিদ বার্টোল্ড এশপোলার (আশপোলার) এই শ্রেণির ভূমিকার ওপর জোর দিয়েছেন। তাঁর মতে, এই শ্রেণির লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করে তাদের বিশেষ সুবিধা—বিশেষ করে জমির মালিকানা এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক অধিকার—রক্ষা করতে পেরেছিল (ইরানের ইতিহাস, খণ্ড ১/২৪৪)।তিনি আরও লিখেছেন যে, অধিকাংশ জায়গায় অভিজাত এবং সম্ভ্রান্ত নেতারাই প্রথমে আরব বিজয়ীদের ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। এর বিনিময়ে আরব বিজয়ীরা তাদের ক্ষমতা ও প্রভাব অক্ষুণ্ণ রাখে, এমনকি বিয়ের মাধ্যমে আত্মীয়তার সম্পর্কও গড়ে তোলে (একই বই, খণ্ড ১/২৪৫)।
কিছু শহরে নিম্নশ্রেণির লোকেরাই প্রথমে ইসলাম গ্রহণ করে। উদাহরণস্বরূপ, বুখারার ক্ষেত্রে উল্লেখ আছে যে নিম্নশ্রেণির মানুষ দলে দলে মুসলমান হয়। পরে জমির মালিক অভিজাত শ্রেণি—যাদের দেহকান বলা হতো—ধীরে ধীরে ইসলাম গ্রহণ করে। এটাও মনে রাখতে হবে যে, স্থানীয় অভিজাত এবং শাসকদের মধ্যে তীব্র বিবাদ চলছিল। এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই এই অঞ্চলে মুসলিম আরবদের প্রভাব বিস্তারে অনেক সাহায্য করেছে।
দুঃখের বিষয়, উমাইয়া শাসনের দ্বিতীয়ার্ধে অতিরিক্ত জিজিয়া (অমুসলিমদের কর) আদায়ের লক্ষ্যে অনেক জায়গায় লোকদের ইসলাম গ্রহণের পথই বন্ধ করে দেওয়া হয়। রাজকোষ (বায়তুলমাল) ভরপুর রাখার অত্যধিক আগ্রহ একসময় ইসলামের বিস্তারে বাধা সৃষ্টি করে। তবুও বুখারার লোকেরা ইসলামের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন এবং স্থানীয় কিছু শাসকের চাপ বা বাধা সত্ত্বেও ইসলাম ত্যাগ করেননি। বরং তারা ইসলামের প্রচারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।
হিজরত ও প্রত্যাবর্তন: মুসলমান ইরানিদের ভূমিকা
ইরানিদের ইরাক যাওয়া এবং পরে নিজ দেশে ফিরে আসাও ইসলামের বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছে। কয়েকটি উদাহরণ:
১.সালমান ফারসি খলিফা উমর ইবনে খত্তাবের সময়ে একবার ইসফাহানে ফিরে আসেন।
২.হাম্মাদ ইবনে আবু সুলায়মান কুফি (মৃত্যু ১২০ হিজরি) ইসফাহানের বারখোয়ার অঞ্চলের বন্দিদের মধ্যে ছিলেন। পরে তিনি একজন বিখ্যাত আলেম হয়ে ওঠেন (তাবাকাতুল মুহাদ্দিসিন, খণ্ড ১/৩৩৩)।
৩.ওসাব নামের একজন ব্যক্তি ইবনে আব্বাসের মাওলা(অনুসারী) ছিলেন। তিনি দু’বছর তাঁর সান্নিধ্যে থেকে পরে কাশানে ফিরে যান (একই বই, খণ্ড ১/৩৩৩; ৩৫৫–৩৫৭)।
৪.না’ফি ইবনে আবি নুয়াইম, যিনি মদিনার একজন কারি (কুরআন পাঠক), বলতেন:আমার বংশের মূল ইসফাহান থেকে।
৫.ইবনে আবি যিনাদ—যিনি একজন ফকিহ (ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ) ছিলেন—বলতেন: আমার মূল আবাসস্থল ছিল হামাদান।(একই বই, খণ্ড ১/৩৮২)
এই সবাই প্রথম ও দ্বিতীয় হিজরি শতাব্দীর মানুষ। তাঁদের অনেকেই উচ্চ মর্যাদা এবং জ্ঞানের আসনে বসেন—এরা সবাই ছিলেন ইরানি বংশের মুসলমান।
সাহাবাদের আগমন ও সাক্ষাৎ
একটি আশ্চর্যজনক তথ্য হলো যে, কমপক্ষে আঠারোজন সাহাবি (নবীজির সঙ্গী) ইসফাহানে এসেছিলেন। এছাড়া, অনেক ইরানি ইরাকে থাকার সময় নবীজি ﷺ-এর সাহাবিদের সাক্ষাৎ পান।
একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, একজন ইরানির সঙ্গে ইমাম আলী (আ.)-এর সাক্ষাৎ ঘটে। দাউদ ইবনে সুলায়মান ইসফাহানি বলেন: আমি আমার বাবার সঙ্গে কুফার আবর্জনাস্থলে ছিলাম। দেখলাম, একজন টাকমাথা বয়স্ক ব্যক্তি ‘দুলদুল’ নামের খচ্চরে চড়ে আসছেন। তাঁর চারপাশে লোকজন ভিড় করে আছে। আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই ব্যক্তি কে? বাবা বললেন, ‘এ হলেন আরবদের সম্রাট—আলী ইবনে আবি তালিব।
ধীরগতির প্রক্রিয়া: ঐতিহাসিক সাক্ষ্য
একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, ইরানিদের ইসলাম গ্রহণের প্রক্রিয়াটি প্রথম হিজরি শতকে ধীরে ধীরে শুরু হয় এবং ধাপে ধাপে তার গতি বাড়তে থাকে। চতুর্থ শতকে এসে এই প্রবণতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে যায়। পশ্চিমের কিছু জাতিগোষ্ঠী যেমন আশুরিয়ানরা বা য়াজদ ও শিরাজের কিছু ছোট জারথুস্ত্রী সম্প্রদায় ছাড়া প্রায় সবাই ইসলাম গ্রহণ করে।
এই গবেষণার ভিত্তি হলো প্রথম চার শতকের আলেমদের নামের তালিকায় খুব কম খাঁটি ইরানি নাম দেখা যায়। সাধারণত চতুর্থ শতক পর্যন্ত বংশতালিকা এমন হয় যে, প্রথম প্রজন্মের ব্যক্তির নাম ইরানি থাকে এবং পরের প্রজন্মগুলোয় ক্রমান্বয়ে আরবি বা ইসলামি নাম আসে। উদাহরণস্বরূপ: আহমদ ইবনে হুসাইন ইবনে রুস্তম—এখানে রুস্তম হলেন সেই ব্যক্তি যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং তাঁর ছেলের নাম রাখা হয়েছে আহমদ।
এই পদ্ধতিটিই রিচার্ড বুলেট তাঁর বই “Conversion to Islam in the Medieval Period”-এ অনুসরণ করেছেন। তাঁর মতে, ইসলাম গ্রহণের প্রবণতার গ্রাফটি রেশমকীটের বৃদ্ধি-বিকাশের রেখাচিত্রের মতো: প্রথম ধাপে ১০-১৫ শতাংশ, মধ্যবর্তী ধাপে ৪০-৬০ শতাংশ এবং শেষ ধাপে বাকি ১০-১৫ শতাংশ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। একটি ছোট অংশ একেবারেই ইসলাম গ্রহণ করে না।
স্বেচ্ছায় নাকি জোরপূর্বক ধর্মান্তর?
ইরানিদের ইসলাম গ্রহণ নিয়ে একটি চিরকালীন প্রশ্ন হলো—তারা কি জোর করে ধর্মান্তরিত হয়েছিল, নাকি স্বেচ্ছায়? ঐতিহাসিক সূত্রে উভয় ধরনের উদাহরণ পাওয়া যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যে, জারথুস্ত্র ধর্মে থাকা আইনত বৈধ ছিল। ফলে মূলনীতির দিক থেকে বিজয়ীরা কাউকে জোর করে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করতে পারত না।
তবে এটাও সত্য যে, মুসলিম বিজয়ীদের কাছে এটি বড় মর্যাদার বিষয় ছিল—কেউ উচ্চবিত্ত হোক বা নিম্নবিত্ত—যদি ইসলাম গ্রহণ করে। তাই সুযোগ পেলেই নতুন মুসলিমদের বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হতো। কোনো শহর যুদ্ধ করে জয় করা হলে অনেক সময় অগ্নিমন্দির ধ্বংস করে তার জায়গায় মসজিদ নির্মাণ করা হতো। কিন্তু যখন শান্তিচুক্তি হতো, তখন অগ্নিমন্দির টিকে থাকতে দেওয়া হতো—যদি না সেখানে মূর্তিপূজা বা বৌদ্ধ উপাসনা চলত।
ইতিহাসবিদ জরিনকুব লিখেছেন যে, দুই শতাব্দী জুড়ে ইরানিদের আরবদের সঙ্গে লড়াই অন্ধ আবেগ বা ঘৃণার অন্ধকারে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং জ্ঞান ও বুদ্ধিদীপ্ত বিতর্কের আলোকেও চলেছিল। অনেক ইরানি শুরু থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করে। আরবরা যে নতুন ধর্ম এনেছিল, তারা সেটিকে পূর্বপুরুষদের ধর্মের তুলনায় শ্রেষ্ঠতর হিসেবে উপলব্ধি করেছিল। জারথুস্ত্রের দ্বৈতবাদকে তারা অস্পষ্ট ও অন্ধকারাচ্ছন্ন মনে করত, আর ইসলামের নিখাদ তাওহীদকে স্বচ্ছ ও যুক্তিসঙ্গত বলে গ্রহণ করেছিল।
যেসব শহর যুদ্ধের মাধ্যমে দখল করা হতো, সেখানে অগ্নিমন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরি করা প্রচলিত ছিল।আর শান্তিচুক্তির ক্ষেত্রে সেগুলো অনেক সময় অক্ষত থাকত। বুখারার ইতিহাসে দেখা যায়—প্রথমে তারা ছিল মূর্তিপূজক, পরে অগ্নিউপাসক, এবং শেষে সেখানে মুসলমানদের মসজিদ স্থাপিত হয়। নিশাপুরেও পুরনো দুর্গাঞ্চলের অগ্নিমন্দির ভেঙে জামে মসজিদ নির্মিত হয়।ইতিহাসে উল্লেখ আছে যে, আবদুল্লাহ ইবনে আমির নিশাপুর জয় করার পর কেহান্দেজের অগ্নিমন্দির ভেঙে সেখানে জামে মসজিদ নির্মাণ করেন।
বলা হয় যে, কাজভিনের মানুষ অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দ্রুত ইসলাম গ্রহণ করেছিল। নিঃসন্দেহে কর-ছাড় নিম্নবিত্তদের ইসলাম গ্রহণে উৎসাহিত করেছিল। তবে উমাইয়া শাসকদের কিছু কঠোর নীতি নতুন মুসলিমদের থেকেও জিজিয়া আদায় করত, যার ফলে ইসলামের বিস্তার সাময়িকভাবে ধীর হয়ে যায়।
সমাপ্তি:
শেষ কথা হলো যে, ইরানে ইসলামের আগমন কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না এবং একমাত্র তলোয়ারের জোরে ঘটেনি। বরং এটি ছিল তিন থেকে চার শতাব্দী জুড়ে বিস্তৃত ধীর, জটিল ও বহুস্তরীয় সামাজিক-সাংস্কৃতিক রূপান্তর।
মানুষের আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা, ইসলামের যুক্তিবাদী ও মানবিক শিক্ষা, আরব ও ইরানিদের সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া, সাসানীয় রাজনৈতিক-ধর্মীয় ব্যবস্থার পতন—সবকিছু মিলেই এই বিরাট পরিবর্তন ঘটে।
নিশ্চিত বিষয় হলো যে, ইরানিরা শুধু ইসলাম গ্রহণই করেনি; বরং নিজেদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির সাথে একে মিশিয়ে দিয়ে ইসলামী সভ্যতার নির্মাণে তুলনাহীন অবদান রেখেছে।
উৎস: হাওজা-নেট



