ইতিহাসজীবনযাপনধর্ম ও বিশ্বাসবিশেষ সংবাদবিশ্ব

ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর শিক্ষা: নিফাকের বিরুদ্ধে সচেতনতার আহ্বান

ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: 31 ডিসেম্বর ২০২৫

ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর শিক্ষা: নিফাকের বিরুদ্ধে সচেতনতার আহ্বান

মিডিয়া মিহির: রজব মাসের পবিত্র ছোঁয়ায় ইমাম জাওয়াদ (আ.) ও ইমাম হাদি (আ.)-এর জন্মদিন মুসলিম সমাজের হৃদয়ে গভীর শ্রদ্ধা ও স্মৃতির আলোক জাগিয়ে তোলে। স্বল্পকালীন জীবন সত্ত্বেও ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর পথ ছিল অবিরাম জিহাদের, সংগঠনের, চিন্তার বিস্তারের এবং কপট ক্ষমতার মুখোশ খুলে সত্যের উচ্চারণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

ইমাম জাওয়াদ (আ.) ও ইমাম হাদি (আ.)-এর জন্ম রজব মাসের পবিত্রতায় আলোকিত, যা আমাদের সম্মান ও শ্রদ্ধার প্রতীক। ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর সংক্ষিপ্ত জীবনকাল ছিল অল্প বয়সে ইমামতের দায়িত্ব গ্রহণ, নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম, শিয়া সমাজের যোগাযোগ ও সংগঠনের বিস্তার এবং যুগের কপট শক্তিগুলির মোকাবিলায় পরিপূর্ণ—যা সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য এক অমর আদর্শে রূপান্তরিত হয়েছে।

ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে “ইমামত ও বিলায়াতের নবম জ্যোতির্ময় নক্ষত্রের ব্যক্তিত্ব” বিষয়ে সর্বোচ্চ নেতার কয়েকটি অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য এখানে উপস্থাপিত হলো, যা আমাদের প্রিয় পাঠকদের হৃদয়ে নতুন আলো ছড়াবে।

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ী বক্তব্যসমূহ

আমি মনে করি, ইমাম জাওয়াদ আল-আইম্মাহ (আ.)-এর জন্মস্মৃতি পালন করা অত্যন্ত জরুরি; রজব মাসের দোয়ায় আমরা পড়ি: “হে আল্লাহ! তোমার নিকট প্রার্থনা করি তাঁদের মাধ্যমে, যাঁরা রজব মাসে জন্মগ্রহণ করেছেন—মুহাম্মদ ইবনে আলী আস-সানি এবং তাঁর পুত্র আলী ইবনে মুহাম্মদ আল-মুনতাজাব।”

ইমাম জাওয়াদ (আ.) ও ইমাম হাদি (আ.)-এর উভয়ের জন্মই এ মাসে; তাই এ দুটি দিনকে আমাদের মর্যাদা ও শ্রদ্ধার সাথে উদযাপন করা উচিত। আমি নিজের পক্ষ থেকে এবং আপনাদের হৃদয়ের পক্ষ থেকে এই দুই সম্মানিত ইমামের দরবারে আমাদের ভালোবাসা, নিষ্কলুষ আনুগত্য ও অটুট ঈমান নিবেদন করছি। আল্লাহর নিকট প্রার্থনা—তিনি যেন দুনিয়া ও আখিরাতে তাঁদের জ্ঞান, স্মৃতি ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে আমাদের জীবনকে সজীব রাখেন এবং তাঁদের সাথে আমাদের মিলিত করেন। (৮/৮/১৯৯৮)

ইমাম জাওয়াদ (আ.)-এর জীবন আমাদের জন্য এক মহান আদর্শ। অসংখ্য মর্যাদা ও মহিমার অধিকারী এই ইমাম মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে দুনিয়া ত্যাগ করেন। এটি আমাদের কথা নয়; ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়—এমন ইতিহাস, যা অশিয়া লেখকরাও লিপিবদ্ধ করেছেন। শৈশব ও কৈশোরেই তাঁর মর্যাদা ও ব্যক্তিত্ব এমন উচ্চতায় পৌঁছেছিল যে, মাআমুনসহ সকলে তাঁকে অসাধারণ মহিমার অধিকারী হিসেবে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিল। এসব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং আমাদের জন্য প্রকৃত অনুকরণীয়। (৭/২/১৯৯৮)

ইমাম রেজা (আ.), ইমাম জাওয়াদ (আ.), ইমাম হাদি (আ.) ও ইমাম আসকারি (আ.)-এর যুগে শিয়াদের পারস্পরিক যোগাযোগ ও সংগঠন পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বিস্তৃত ছিল। ইসলামী বিশ্বের কোনো যুগে শিয়া সমাজের এমন ব্যাপক নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠেনি, যেমন গড়ে উঠেছিল এই তিন ইমামের সময়ে। প্রতিনিধি ও নায়েবদের ব্যবস্থা, এবং ইমাম হাদি (আ.) ও ইমাম আসকারি (আ.)-এর সম্পর্কিত ঘটনাবলি—যেমন কেউ সম্পদ এনে দিলে ইমাম তা কোন খাতে ব্যয় করবেন তা নির্ধারণ করতেন—এসবই এ বাস্তবতার প্রমাণ। সামর্রায় কঠোর নজরদারিতে থাকা সত্ত্বেও, এবং তার আগে ইমাম জাওয়াদ (আ.) ও ইমাম রেজা (আ.)-এর জীবনে, জনগণের সাথে এই সম্পর্ক ধীরে ধীরে আরও বিস্তার লাভ করেছে। ইমাম রেজা (আ.)-এর খোরাসানে আগমন এতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। (৩০/১২/২০১৪)

ইমাম জাওয়াদ (আ.) অন্যান্য নিষ্পাপ ইমামদের মতোই আমাদের জন্য আদর্শ ও পথপ্রদর্শক। এই মহান আল্লাহভীরু বান্দার সংক্ষিপ্ত জীবন কেটেছে কুফর ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে অবিরাম সংগ্রামে। কৈশোরেই তিনি ইসলামের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং অল্প কয়েক বছরে আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে এমন তীব্র জিহাদ চালান যে, মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে তাঁর অস্তিত্ব শত্রুদের কাছে অসহ্য হয়ে ওঠে এবং বিষপ্রয়োগে তাঁকে শহীদ করা হয়। অন্যান্য ইমামগণ যেমন তাঁদের জিহাদের মাধ্যমে ইসলামের গৌরবময় ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করেছেন, তেমনি এই মহান ইমামও ইসলামি সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক তাঁর জীবনে বাস্তবায়িত করেন এবং আমাদের এক মহান শিক্ষা দিয়ে যান। সেই শিক্ষা হলো—যখন আমরা কপট ও ভণ্ডামিপূর্ণ শক্তির মুখোমুখি হই, তখন আমাদের দায়িত্ব মানুষকে সচেতন ও সজাগ করে তোলা। যদি শত্রু প্রকাশ্যে শত্রুতা করে, তবে তাকে চেনা সহজ; কিন্তু যখন মাআমুন আব্বাসীর মতো কেউ ধর্মীয় চেহারা ধারণ করে পবিত্রতার মুখোশে নিজেকে আবৃত করে, তখন সাধারণ মানুষের পক্ষে তাকে চিনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আমাদের যুগে এবং ইতিহাসের প্রতিটি যুগে ক্ষমতাধররা যখন সরাসরি মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে, তখনই কপটতা ও নিফাকের আশ্রয় নিয়েছে। (১৩/৬/২০১১)

ইমাম জাওয়াদ (আ.) ও ইমাম হাদি (আ.)-এর যুগ ছিল এক বিচিত্র কালপর্ব—তীব্র দমন-পীড়নের ছায়ায়ও সমগ্র ইসলামী বিশ্বে শিয়া সমাজের বিস্ময়কর প্রাণচাঞ্চল্য ও সংগঠিত অগ্রযাত্রা ফুটে উঠেছিল। ইমামদের জীবনের অন্য কোনো যুগে শিয়ারা এত ব্যাপক কার্যক্রম, সংগঠন, উদ্যম ও বিস্তার অর্জন করতে পারেনি, যেমন অর্জিত হয়েছে এই তিন ইমামের—ইমাম জাওয়াদ (আ.), ইমাম হাদি (আ.) ও ইমাম আসকারি (আ.)—যুগে। অথচ এই তিন ইমামই মদিনা, বাগদাদ ও সামর্রায় কঠোর নজরদারি ও চাপের মধ্যে জীবন যাপন করছিলেন। এখান থেকে বোঝা যায়, সে সময় হযরত আবদুলআযীম (রা.) ছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় ব্যক্তিত্ব, যিনি খলিফার নজরে পড়েন, নির্যাতনের মুখোমুখি হন এবং রেই শহরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। (২৬/৫/২০০৩)

আরও পড়ুন 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button