ইমাম আলী (আ.) কিভাবে আহলে বাইতের (আ.) মর্যাদা ব্যাখ্যা করেছেন?
ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০২৬
ইমাম আলী (আ.) কিভাবে আহলে বাইতের (আ.) মর্যাদা ব্যাখ্যা করেছেন?
ইমাম আলী (আ.) আহলে বাইতের (আ.) মর্যাদা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন—তাঁরা হলো হকের ধারক, দ্বীনের পতাকা ও সত্যের জীবন্ত ভাষা। তাই যেমন কুরআনকে হৃদয়ের গভীরে স্থান দেওয়া হয়, তেমনি আহলে বাইতের ভালোবাসা, আনুগত্য ও শিক্ষা হৃদয়–আত্মার গভীরে ধারণ করতে হবে এবং জ্ঞানলাভের পিপাসু মানুষের মতো তাঁদের স্বচ্ছ জ্ঞানের ঝর্ণাধারায় ফিরে যেতে হবে।
সংক্ষিপ্ত উত্তর: ইমাম আলী (আ.) বলেন:
«هُمْ أَزِمَّةُ الْحَقِّ، وَأَعْلَامُ الدِّينِ، وَأَلْسِنَةُ الصِّدْقِ»
আহলে বাইত (আ.) হকের নিয়ন্ত্রণদণ্ড, দ্বীনের উঁচু পতাকা এবং সত্য ও ন্যায়ের কথা বলা জিহ্বা। তাই যেমন কুরআনকে হৃদয়ের গভীরে সংরক্ষণ করা হয়, তেমনি আহলে বাইতের ভালোবাসা হৃদয়–প্রাণে ধারণ কর এবং জ্ঞানের নির্মল উৎসের মতো তাঁদের দিকে তৃষ্ণার্তের মতো এগিয়ে যাও।
বিস্তারিত উত্তর: ইমাম আলী (আ.) নাহজুল বালাগা-এর ৮৭ নম্বর খুতবায় বলেন:
পথভ্রষ্টতার ধাক্কা কোথায়?
«فَأَيْنَ تَذْهَبُونَ؟ وَأَنَّى تُؤْفَكُونَ؟»
অর্থ: তোমরা কোথায় যাচ্ছ? কোনদিকে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে তোমাদের?
এরপর বলেন—
«وَالْأَعْلَامُ قَائِمَةٌ، وَالْآيَاتُ وَاضِحَةٌ، وَالْمَنَارُ مَنْصُوبَةٌ»
অর্থ:হকের পতাকাগুলো উঁচু করে স্থাপন করা হয়েছে, নিদর্শনগুলো স্পষ্ট, আর হিদায়াতের প্রদীপগুলো জ্বালানো রয়েছে।
এখানে ইমাম (আ.) বোঝাচ্ছেন—
আল্লাহ মানুষের জন্য পথচিহ্ন, নিদর্শন ও আলো—সবই স্থাপন করেছেন।
তাহলে কেন বিভ্রান্তি?
তিনি আবার বলেন: «فَأَيْنَ يُتَاهُ بِكُمْ؟ وَكَيْفَ تَعْمَهُونَ وَبَيْنَكُمْ عِتْرَةُ نَبِيِّكُمْ؟»
অর্থ:তাহলে তোমাদেরকে কোথায় গোমরাহ করা হচ্ছে? কীভাবে অন্ধের মতো ঘোরাফেরা করছ—যখন তোমাদের মধ্যেই আছে তোমাদের নবীর আহলে বাইত?
অর্থাৎ— যাদের কাছে আহলে বাইত আছে, তাদের বিভ্রান্ত হওয়ার কথা নয়।
আহলে বাইতের পরিচয় : ইমাম আলী(আ.)বলেন:
«وَهُمْ أَزِمَّةُ الْحَقِّ، وَأَعْلَامُ الدِّينِ، وَأَلْسِنَةُ الصِّدْقِ»
অর্থ: তাঁরা হকের লাগাম, দ্বীনের পতাকা ও সত্যের ভাষা।
➤ যারা তাঁদের অনুসরণ করে—হকের দিকে পরিচালিত হয়
➤ যারা তাঁদের সান্নিধ্যে থাকে—সত্যের আলো পায়
➤ যারা দূর থেকেও তাঁদের চেনে—পতাকা দেখে পথ চেনা পথিকের মতো পথ খুঁজে পায় “أَلْسِنَةُ الصِّدْقِ” অর্থ—
তাঁদের মুখ সত্য ছাড়া কিছু বলে না এবং তাঁদের জীবনই ওহীর ভাষান্তর।
আহলে বাইতকে কোথায় রাখবে?
ইমাম আলী (আ.) বলেন: «فَأَنْزِلُوهُمْ بِأَحْسَنِ مَنَازِلِ الْقُرْآنِ»
অর্থ: তোমরা আহলে বাইতকে সেই স্থানে রাখো—যেখানে কুরআনকে রাখো। অর্থাৎ হৃদয়ের গভীরে। তিনি আরো বলেন: «وَرِدُوهُمْ وُرُودَ الْهِيمِ الْعِطَاشِ»
অর্থ: তোমরা তৃষ্ণার্তের মতো তাদের জ্ঞানের ঝরনাধারায় ছুটে যাও।
এভাবে তিনি ইঙ্গিত করেন—
◉ কুরআন ও আহলে বাইত অবিচ্ছেদ্য
◉ এ শিক্ষাই “হাদিসে সাকালাইন”-এর সত্য ঘোষণা
সারকথা
১. আহলে বাইত হকের পথপ্রদর্শক
২. তাঁদের প্রতি ভালোবাসা হৃদয়ের গভীরে রাখতে হবে
৩. জ্ঞানের উৎস হিসেবে তাদের দিকে ফিরতে হবে
৪. কুরআন ও আহলে বাইত কখনো বিচ্ছিন্ন নয়
পাদটীকা:
(১)। “তُؤفكون” শব্দটি “اِفك” মূল থেকে উদ্ভূত (ফিকরের ওজনে), যার অর্থ বিচ্যুতি বা পরিবর্তনশীলতা। এই কারণেই মিথ্যা এবং অপবাদকে “افك” বলা হয়।
(২)। “يُتاه” শব্দটি “তَيه” এবং “তِيه” মূল থেকে, যার অর্থ পথ হারানো, বিভ্রান্তি এবং বিহ্বলতা।
(৩)। “তَعْমَهُون” শব্দটি “عَمَه” মূল থেকে (ফরহের ওজনে), যার অর্থ বিভ্রান্তি এবং বিহ্বলতা। কেউ কেউ বলেন, আরবি ভাষায় “عَمى” অর্থ বাহ্যিক চোখের অন্ধত্ব, আর “عمه” অর্থ অন্তর্দৃষ্টির অন্ধত্ব। (অবশ্যই, “عَمى” কখনও কখনও প্রতীকীভাবে অন্তর্দৃষ্টির অভাবকেও বোঝায়।)
(৪)। “هيم” হল “اَهْيمَ” এর বহুবচন, মূলত অর্থ তৃষ্ণার্ত উট। এটি শুষ্ক বালুকণাকেও বলা হয়, যা জল গিলে ফেলে এবং যেন নিজেই তৃষ্ণায় কাতর।
(৫)। সংগ্রহিত বই থেকে: “পেয়ামে ইমাম আমিরুল মুমিনিন (আ.)”, মাকারেম শিরাজি, নাসের; প্রস্তুতি ও সংগঠন: কয়েকজন বিদ্বানের দল; দার আল-কুতুব আল-ইসলামিয়া, তেহরান, ১৩৮৬ সৌরবর্ষ, প্রথম মুদ্রণ, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৫৭৬।



