ধর্ম ও বিশ্বাসকুরআনজীবনযাপনবিশেষ সংবাদবিশ্ব

আল্লাহর স্রষ্টা-সত্তার প্রমাণ ও প্রকৃতিবাদীদের শঙ্কার নিরসন

ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫

মিডিয়া মিহির: আদিকাল থেকে মানুষের অন্তরে একটিই প্রশ্ন জ্বলজ্বল করে— “যদি এই বিশ্ব সৃষ্ট, তবে তার স্রষ্টা কে? এই একটি প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আল্লাহ তা‘আলার অস্তিত্বের চাবিকাঠি, তাঁর চিরন্তন সত্তার স্বাক্ষর এবং সৃষ্টির অপার রহস্যের দ্বার উন্মোচন। নাস্তিকদের প্রিয় প্রশ্ন—“যদি আল্লাহ থাকেন, তবে তাঁর স্রষ্টা কে?”—এই প্রশ্নটিই আসলে তাদের গভীর ভ্রান্তি প্রকাশ করে। কেননা যিনি প্রথম কারণ, যিনি অনাদি-অনন্ত, আজালি-আবাদি, তিনি কারো সৃষ্টি নন, বরং সবকিছুর স্রষ্টা তিনিই।

প্রতিটি সৃষ্টির পেছনে একজন স্রষ্টা

প্রতিটি তৈরি বস্তুরই একজন তৈরিকারী থাকে—এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। অপরিশোধিত তেল রিফাইনারিতে প্রবেশ করে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসে পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিন। মায়ের দুধ শিশুর অন্ত্রে গিয়ে রূপান্তরিত হয় রক্ত-মাংস, হাড়-চুল, নখ-দাঁত।

যেমন রিফাইনারি নিজে নিজে তৈরি হয়নি, তেমনি হজমযন্ত্রও নিজে থেকে গড়ে ওঠেনি। দুটোর পেছনেই আছে একজন জ্ঞানী ও শক্তিমান স্রষ্টার হাত।

প্রকৃতিই স্রষ্টা”— দাবির খণ্ডন

কেউ বলেন, “প্রকৃতিই সবকিছু সৃষ্টি করেছে।”

যদি “প্রকৃতি” বলতে এক অদৃশ্য, জ্ঞানী, হেকমতওয়ালা, ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন সত্তাকে বোঝানো হয়—তবে তিনি তো আল্লাহই, শুধু নাম বদলে ফেলা হয়েছে।

কিন্তু যদি প্রকৃতি বলতে শুধু পানি, মাটি, আগুন ও বায়ু—এই চার জড় উপাদানকে বোঝানো হয়, তবে প্রশ্ন জাগে: এই নির্জীব, অচেতন উপাদানের মধ্যে কি বুদ্ধি আছে? ইচ্ছা আছে? হেকমত আছে? কখনো না। তবে কী করে এরা সেই সব প্রাণী সৃষ্টি করল, যাদের মধ্যে জ্ঞান-বুদ্ধি, চেতনা ও ইচ্ছাশক্তি রয়েছে?

কেউ বলতে পারেন, “উপাদানগুলো মিলে নতুন গুণের জন্ম দেয়।” ঠিক আছে। কিন্তু সেই মিলন কি এলোমেলো, উদ্দেশ্যহীন? যদি তাই হতো, তবে একই উপাদান মিশে হাজার রকম ফল দিত। কিন্তু আমরা দেখি—প্রতিবার নির্দিষ্ট নিয়মে মিললেই নির্দিষ্ট ফল। এই নিয়ম কে স্থির করলেন? কে এই অপূর্ব সমন্বয় রচনা করলেন? নিশ্চয়ই এক জ্ঞানী ও শক্তিমান স্রষ্টা—আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা।

বিশ্ব এক অতি জটিল যন্ত্র। কোনো যন্ত্রই নিজে নিজে তৈরি হয় না। ঘড়ির পেছনে ঘড়ি-নির্মাতা যেমন আবশ্যক, তেমনি মহাবিশ্বের পেছনে আছেন সর্বজ্ঞানী স্রষ্টা।

প্রকৃতিবাদীদের মূল ভ্রান্তি

প্রকৃতিবাদীরা নির্মাণসামগ্রীকেই নির্মাতা ভেবে বসেন। যেমন কেউ একটি প্রাসাদ দেখে বলল, “এ তো ইট-সিমেন্ট-বালি দিয়ে তৈরি, সুতরাং এগুলোই নির্মাতা!”—এর চেয়ে হাস্যকর আর কী হতে পারে? হাজার বছর ইট-সিমেন্ট পড়ে থাকলেও প্রাসাদ হবে না, যদি না স্থপতি ও কারিগর থাকেন।

ঠিক তেমনি পানি-মাটি-আগুন-বায়ু শুধু উপকরণ। স্রষ্টা তিনি, যিনি এই উপকরণগুলোকে এমন নিখুঁত শৃঙ্খলায় বেঁধেছেন যে, তারা প্রতি মুহূর্তে তাঁর হুকুম পালন করে চলেছে।

মানুষ নিজের অস্তিত্বের কারণ নিয়ে চিন্তা করলে

মানুষ ভাবে, আমি এসেছি কোথা থেকে? সম্ভাব্য উত্তর পাঁচটি: ১. নিজে নিজে ২. পিতা-মাতা ৩. প্রকৃতি ৪. আকস্মিকতা ৫. আল্লাহ

কিন্তু প্রথম চারটিই অসম্ভব:

১.নিজে নিজে হলে তো অস্তিত্বের আগেই অস্তিত্ব থাকতে হয়—যা মহা অসঙ্গতি।

২.পিতা-মাতা শুধু মাধ্যম, স্রষ্টা নন।

৩.প্রকৃতি অচেতন, চেতন সৃষ্টি করতে পারে না।

৪.আকস্মিকতা? কলম কি নিজে নিজে লেখে? ভবন কি নিজে নিজে গড়ে ওঠে?

অতএব একমাত্র যুক্তিসঙ্গত উত্তর: আল্লাহ।

ইমাম রেজা (আ.)-এর অমর যুক্তি: “তুমি এক সময় ছিলে না, পরে হয়েছ। তুমি জানো তুমি নিজে নিজেকে সৃষ্টি করোনি, তোমার মতো কেউও করেনি। সুতরাং একজন জ্ঞানী, শক্তিমান, হেকমতওয়ালা স্রষ্টা অবশ্যই আছেন।”

জীবনআল্লাহর অস্তিত্বের জ্বলন্ত প্রমাণ

ইমাম আলী (আ.) বলেছেন:

وَلَوِ اجْتَمَعَ جَمِیعُ حَیَوَانِهَا مِنْ طَیْرِهَا وَبَهَائِمِهَا وَمَا کَانَ مِنْ مُرَاحِهَا وَسَائِمِهَا وَأَصْنَافِ أَسْنَاخِهَا وَأَجْنَاسِهَا وَمُتَبَلِّدَةِ أُمَمِهَا وَأَکْبَاسِهَا عَلَی إِحْدَاثِ بَعُوضَةٍ، مَا قَدَرَتْ عَلَی إِحْدَاثِهَا وَلَا عَرَفَتْ کَیْفَ السَّبِیلُ إِلَی إِیجَادِهَا وَلَتَحَیَّرَتْ عُقُولُهَا فِی عِلْمِ ذَلِکَ وَتَاهَتْ وَعَجَزَتْ قُوَاهَا وَتَنَاهَتْ وَرَجَعَتْ خَاسِئَةً حَسِیرَةً، عَارِفَةً بِأَنَّهَا مَقْهُورَةٌ، مُقِرَّةً بِالْعَجْزِ عَنْ إِنْشَائِهَا

 যদি পৃথিবীর সকল জীব—পক্ষী, চতুষ্পদ জন্তু, এমনকি জড়বুদ্ধি ও নিতান্ত দুর্বল প্রাণীরাও—একত্র হয় একটি মশা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে, তবু তারা তা করতে সক্ষম হবে না; সৃষ্টির পথও খুঁজে পাবে না। তারা বিস্ময়ে স্তব্ধ ও অক্ষম হয়ে পড়বে; এবং শেষপর্যন্ত পরাজয় ও হতাশার ভার বক্ষে নিয়ে ফিরে এসে স্বীকার করবে যে এই ক্ষুদ্র প্রাণীটিকে সৃষ্টি করাও তাদের সাধ্যের বাইরে।

কুরআন ঘোষণা করে:

یَا أَیُّهَا النَّاسُ ضُرِبَ مَثَلٌ فَاسْتَمِعُوا لَهُ إِنَّ الَّذِینَ تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ لَنْ یَخْلُقُوا ذُبَابًا وَلَوِ اجْتَمَعُوا لَهُ وَ لَوْ کَانُوا لَهُ نَصِیرًا

হে মানুষ! এক দৃষ্টান্ত পেশ করা হচ্ছে—অতএব মনোযোগ দিয়ে শুনো। যাদের তোমরা আল্লাহ ব্যতীত আহ্বান কর, তারা কেউই—যদিও সবাই মিলেমিশে একত্রিত হয়—একটি মাত্র মাছিকেও সৃষ্টি করতে সক্ষম নয়।

আল্লাহকে অস্বীকারকারীদের প্রধান আপত্তি

যুগের পর যুগ ধরে নাস্তিকের ঠোঁটে একটিই প্রশ্ন ঘুরে বেড়ায়:যদি আল্লাহ সত্যিই থাকেন, তবে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করলেন? এই একটি প্রশ্ন শুনে মুমিনের হৃদয়ে যেন হাজারো ফুল ফুটে ওঠে—কারণ এই প্রশ্নটিই আল্লাহর একত্ব ও মহিমার সবচেয়ে উজ্জ্বল দলিলে পরিণত হয়। আসুন, দুটি মণি-খচিত আলো দিয়ে এর জবাব দিই।

প্রথম আলো: স্বরূপগত জবাব — যিনি সৃষ্টি নন, তাঁর স্রষ্টা লাগে না আল্লাহ সেই সত্তা, যাঁর স্বরূপই হলো অনাদি ও অনন্ত। তিনি আজালী—অর্থাৎ কোনো “আগে” তাঁর জন্য কখনো ছিল না। তিনি আবাদী—অর্থাৎ কোনো “পরে” তাঁর জন্য কখনো আসবে না। যাঁর অস্তিত্বের কোনো শুরু নেই, তিনি কী করে সৃষ্ট হবেন? সৃষ্টি তো শুরুর নাম—আর যিনি নিজেই সমস্ত শুরুর শুরু, তাঁকে কে সৃষ্টি করবে? যদি আমরা বলি, “আল্লাহকেও কেউ সৃষ্টি করেছে তবে সেই “কেউ”-এরও স্রষ্টা চাই… তারপর তারও… এভাবে শৃঙ্খলা অনন্তকাল পিছনে ছুটতে থাকবে।

কিন্তু বুদ্ধি ও যুক্তি চিৎকার করে বলে: “অনন্ত পশ্চাদ্গমন (তাসালসুল) অসম্ভব! এ এক বাতিল দৌড়! যদি কোনো শুরু না থাকে, তবে কিছুই শুরু হতে পারে না।

অতএব, অবশ্যই এক অসৃষ্ট, অনাদি, চিরন্তন সত্তা আছেন—যাঁর নাম আল্লাহ।

কুরআন তাঁর পরিচয় এভাবে দিয়েছে:

‎هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخِرُ وَالظَّاهِرُ وَالْبَاطِنُ وَهُوَ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمٌ

তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ, তিনিই প্রকাশ্য, তিনিই গোপন—এবং তিনি সবকিছুর জ্ঞানী। (সূরা হাদীদ : ৩) দ্বিতীয় আলো: প্রতিবাদমূলক জবাব — তোমার প্রকৃতিকেই প্রশ্ন করছি হে আল্লাহ-অস্বীকারকারী! তুমি বলো, “প্রকৃতিই সবকিছুর মূল কারণ, কোনো আল্লাহ লাগে না। ঠিক আছে। তবে একটি শান্ত

 প্রশ্ন: প্রকৃতিকে কে সৃষ্টি করল?

যদি বলো, “প্রকৃতির কোনো স্রষ্টা নেই, সে নিজে থেকেই আছে”— তবে আমরাও বলব: “তাহলে আল্লাহও নিজে থেকেই আছেন। তুমি প্রকৃতিকে যে “অনাদি” গুণ দান করছ, সেটিই তো আল্লাহর গুণ। তুমি নাম পাল্টে প্রকৃতির পূজা করছ—কিন্তু পূজা করছ তো সেই একই সত্তার! আর যদি বলো, “প্রকৃতিকেও কেউ সৃষ্টি করেছে”— তবে তোমার নিজের তীরই তোমার বুকে বিঁধল। তুমি যতবার কারণের পেছনে কারণ খুঁজবে, শেষ পর্যন্ত এক অসৃষ্ট কারণের দরজায় এসে দাঁড়াতে হবে।

সেই অসৃষ্ট কারণ, সেই প্রথম কারণ, সেই “علت العلل”—তিনিই আল্লাহ।

দার্শনিক ও বুদ্ধিগত মূলনীতি

কোনো কারণের শৃঙ্খলা অনন্তকাল পিছনে যেতে পারে না। কারণ প্রতিটি কারণের অস্তিত্ব নির্ভর করে প্রথম কারণের ওপর। যদি সব কারণই সৃষ্ট হয়, তবে কোনো “প্রথম কারণ” থাকবে না— আর প্রথম কারণ না থাকলে কোনো ফল, কোনো সৃষ্টিই অস্তিত্বে আসতে পারে না। অতএব, বুদ্ধি, যুক্তি, দর্শন—সবাই একসুরে ঘোষণা করে:

সৃষ্টি জগতের প্রথম ও চূড়ান্ত কারণ একমাত্র অসৃষ্ট সত্তা— তিনি আল্লাহ, যিনি বলেন:

‎أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ ۗ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ

শোনো! সৃষ্টি ও আদেশ একমাত্র তাঁরই। মহান ও বরকতময় আল্লাহ—বিশ্বজগতের রব।” (সূরা আ‘রাফ : ৫৪)

হে সত্যান্বেষী! তোমার প্রশ্ন যত গভীরই হোক, আল্লাহ তার চেয়ে অসীম গভীর।

যেদিন তুমি এই সত্যের সামনে মাথা নোয়াবে, সেদিন প্রশ্ন শেষ হবে না— বরং প্রশ্ন রূপান্তরিত হবে প্রেমের দো‘আয়:

اَللّٰهُمَّ أَرِنَا الْحَقَّ حَقًّا وَّارْزُقْنَا اتِّبَاعَهُ

হে আল্লাহ! সত্যকে আমাদের সত্য হিসেবে দেখাও এবং তা অনুসরণের তাওফীক দান করো।আমীন, ইয়া রব্বাল ‘আলামীন।

উপসংহার

কারণের শৃঙ্খলা অনন্তকাল পিছনে যেতে পারে না। যদি প্রতিটি কারণই সৃষ্ট হয়, তবে কোনো কারণই প্রথম হবে না, ফলে কিছুই সৃষ্টি হবে না। অতএব অবশ্যই এক অনাদি, অসীম শক্তিমান, সর্বজ্ঞ, হেকমতওয়ালা স্রষ্টা আছেন—যিনি মহাবিশ্বের প্রথম কারণ, যাঁর কোনো শুরু নেই, কোনো শেষ নেই।

তিনিই আল্লাহ, একক, অদ্বিতীয়। ‎أَلاَ لَهُ الْخَلْقُ وَالأَمْرُ ۗ تَبَارَكَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ “শোনো! সৃষ্টি ও নির্দেশ একমাত্র তাঁরই। বরকতময় আল্লাহ—বিশ্বজগতের রব।” (আ‘রাফ : ৫৪)

এই সত্য উপলব্ধি করলেই মানুষ শান্তি পায়, এই সত্য অস্বীকার করলেই পথভ্রষ্ট হয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর সন্ধানের তাওফিক দান করুন। আমীন।

সূত্র

১. বিহারুল আনওয়ার, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৭ ।

২. হাক্কুল ইয়াকীন, আল্লামা শিবর, পৃষ্ঠা ৭ এবং তাওহীদ, শাইখ সাদূক, পৃষ্ঠা ২৯৩। ৩. পবিত্র কুরআন, সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২৭ ৪. নাহজুল বালাগা, খুতবা নং ২২৮ ৫. পবিত্র কুরআন, সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত ৭৩।

মূল উৎস: উসূলুল আকায়েদ (ঈমানের মৌলিক বিশ্বাসসমূহ এবং যুবকদের ধর্মীয় প্রশ্নের উত্তর) লেখক: জনাব মুহাম্মাদ তুরসুলী (হাফি.)

আরও পড়ুন 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button