আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গাজা শিশুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে: রবার্ট ফ্যানটিনা
রাসেল আহমেদ | প্রকাশ: ২২ নভেম্বর, ২০২৫

মিডিয়া মিহির: “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গাজা শিশুদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে”—এটি গাজার শিশুদের ওপর ইসরায়েলি সহিংসতার নজিরবিহীন প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ব্যর্থতা নিয়ে এক মার্কিন লেখক ও মানবাধিকার কর্মীর বিশ্লেষণধর্মী মন্তব্য।
গাজায় চলমান গণহত্যাকে বলা হচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি প্রচারিত গণহত্যা। এর মূল কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—যেখানে একটি মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই কয়েক সেকেন্ডে সারা পৃথিবীতে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ থাকে। কথিত যুদ্ধবিরতির আড়ালেও সেখানে গণহত্যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
ফিলিস্তিনি সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই বছরের গণহত্যায় ইসরায়েল প্রায় সত্তর হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে। তবে বিভিন্ন অনুমান অনুযায়ী, প্রকৃত সংখ্যা এর দশ গুণ পর্যন্ত হতে পারে। এই মাত্রার নৃশংসতা মানুষের কল্পনাকেও ব্যর্থ করে দেয়।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো—এই নৃশংসতার প্রধান শিকার শিশুেরা। সেভ দ্য চিলড্রেন–এর ৫ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল কমপক্ষে ২০,০০০ শিশুকে হত্যা করেছে। প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ রয়েছে— “নিহত শিশুদের মধ্যে অন্তত ১,০০৯ জনের বয়স এক বছরের নিচে। এদের মধ্যে প্রায় ৪৫০ শিশু যুদ্ধ চলাকালীন জন্ম নিয়েছিল এবং জন্মের পরপরই নিহত হয়েছে। আরও অন্তত ৪২,০১১ শিশু আহত হয়েছে, এবং জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী অধিকার কমিটির হিসেবে প্রায় ২১,০০০ শিশু স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করেছে। হাজারো শিশু এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ।”
যে কোনো বিবেকবান মানুষ এসব তথ্য দেখলে স্তব্ধ হয়ে যাবে।
কিন্তু এখানেই বিপর্যয়ের শেষ নয়। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— “ইসরায়েলি বাহিনী গোটা গাজাজুড়ে বোমাবর্ষণের মাত্রা আরও বাড়িয়েছে, যার ফলে ৯৭% স্কুল ও ৯৪% হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিস্ফোরণে শিশুদের মৃত্যুহার বয়স্কদের তুলনায় সাত গুণ বেশি। তাদের দেহ আঘাতের প্রতি বেশি সংবেদনশীল এবং তারা এমন ধরনের আঘাত পায়, যার জন্য তাদের শারীরিক গঠনের কারণে বিশেষ চিকিৎসা প্রয়োজন।”
বেঁচে থাকা শিশুদের অবস্থাও নির্মম—তাদের মানসিক আঘাত তীব্র, দীর্ঘমেয়াদি এবং অনেক ক্ষেত্রে সারাজীবনের জন্য স্থায়ী।
আল জাজিরা–র ৩১ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— “গাজার ৮০ শতাংশেরও বেশি শিশু এখন তীব্র ট্রমার উপসর্গে ভুগছে।”
প্রতিবেদনটিতে কয়েকটি শিশুর দুরবস্থার উদাহরণ তুলে ধরা হয়— একজন ১৫ বছরের ছেলে নিয়মিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়রিয়া এবং কিডনি বিকলের মতো জটিলতায় ভুগছে; যেসব ভয়ংকর দৃশ্য সে দেখেছে সেগুলোর মানসিক আঘাতই এর কারণ। আরেকজন ৮ বছর বয়সী লানা—একটি ইসরায়েলি বিমান হামলায় বাসার ছাদ ধসে পড়ার পর বেঁচে যায়। ধোঁয়া ও রাসায়নিকের প্রভাবে তার শরীরে ভিটিলিগো হয়েছে, এবং সামান্য শব্দেও সে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে।
ইউনিসেফ–এর ২৬ অক্টোবরের রিপোর্টে পরিস্থিতিটি সংক্ষেপে বর্ণনা করা হয়েছে— “বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক এলাকাগুলোর একটিতে প্রতিদিনের ভয়াবহতা প্রায় এক মিলিয়ন শিশু সহ্য করেছে—যা তাদের হৃদয়ে ভয়, ক্ষতি ও শোকের গভীর দাগ এঁকে দিয়েছে।”
এখন প্রশ্ন হলো—এই শিশুদের প্রতি বিশ্বের দায়িত্ব কী? নিহত ২০,০০০ শিশুর প্রতি—এবং হাজারো শিশু যারা আজীবন শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির বোঝা বয়ে বেড়াবে—দায়িত্ব কার?
মিডল ইস্ট মনিটর ১০ নভেম্বর লিখেছে— “বিশ্বের প্রতিটি শিশুর সুরক্ষার কথা বলা হয়, কিন্তু গাজার ধ্বংসস্তূপের সামনে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নীরব। যেসব প্রতিষ্ঠান শিশুদের অধিকারের কথা ‘সর্বজনীন’ বলে দাবি করে, তারা ফিলিস্তিনি শিশুদের বিষয়ে নির্বিশেষে নীরব—এবং এই নীরবতা শুধু গাজাকেই নয়, বিশ্বের সব শিশুর ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।”
রিপোর্টটি আরও উল্লেখ করেছে— “১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ গ্রহণ করে। সেখানে জীবনের অধিকার, সুরক্ষা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—এসবকে প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু গাজায়—যেখানে প্রতিদিন বহু শিশু নিহত বা আহত হয়—সেই ‘সর্বজনীন অধিকার’ কেবল কাগুজে স্লোগানে পরিণত হয়েছে।”
লেখকের মতে, এই অধিকারগুলোর প্রয়োগ ভূগোল ও বর্ণভেদের ভিত্তিতে ভিন্নভাবে ঘটছে।
কানাডার উদাহরণ
লেখক বলেন—তিনি কানাডায় বাস করেন। কানাডা সরকার প্রথমে গাজা থেকে ১,০০০ এবং পরে ৫,০০০ শরণার্থী নেওয়ার ঘোষণা দেয়। কিন্তু এতদিনে ১,০০০ জনেরও কম মানুষ কানাডায় পৌঁছাতে পেরেছে—এবং যাঁরা পেরেছেন, তাঁদের অনেককে মানবপাচারকারীদের টাকা দিয়ে বের হতে হয়েছে।
অন্যদিকে ইউক্রেনের শরণার্থীদের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র—
কানাডা এখন পর্যন্ত ২,৯৮,১২৮ জন ইউক্রেনীয়কে আশ্রয় দিয়েছে এবং প্রায় ১০ লাখ আবেদন অনুমোদন করেছে।
এক গবেষণায় পাওয়া গেছে— “যে শরণার্থী কানাডার প্রচলিত ধারণার সাথে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ—অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গ, পশ্চিমা, উদারনৈতিক—তাদের সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।”
আর যারা এই মানদণ্ডে অমিল, তাদের “ভার”, “হুমকি” বা “অকৃতজ্ঞ” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
অন্যান্য দেশের অবস্থান
টাইমস কলোনিস্ট ২ সেপ্টেম্বর লিখেছে— “ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় শিশু হাসপাতাল এক ভয়াবহ রকেট হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার এক বছর পর কানাডিয়ান রেডক্রস সেটি পুনর্নির্মাণ করছে।”
ইউএনডিপি ৪ এপ্রিল জানিয়েছে— “লাটভিয়ার আর্থিক সহায়তায় যুদ্ধবিধ্বস্ত কিন্ডারগার্টেন ও শিশু হাসপাতাল পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।”
কিন্তু ফিলিস্তিনি শিশুদের ক্ষেত্রে এসব দেশের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন।
যুক্তরাষ্ট্র—শুরু থেকেই ফিলিস্তিনি গণহত্যায় ইসরায়েলের সহযোগী। আগস্টে তারা গাজা থেকে আগতদের সব ভিজিট ভিসা বাতিল করে দিয়েছে। এর ফলে শত শত গুরুতর আহত শিশুর জীবন ঝুঁকিতে পড়েছে।
অক্সফাম ২৯ অক্টোবর জানিয়েছে— “কথিত যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও ইসরায়েল গাজায় মানবিক সহায়তার অতি সামান্য অংশ প্রবেশ করতে দিচ্ছে।”
মানবাধিকার সনদ
জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে— “প্রত্যেক মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আছে… মাতৃত্ব ও শৈশব বিশেষ সুরক্ষা ও সহায়তার দাবিদার।”
গাজার ওপর আরোপিত অবরোধ ভেঙে সেখানে খাদ্য ও ওষুধ প্রবেশ নিশ্চিত করা শুরু থেকেই জরুরি ছিল—এটি যুদ্ধবিরতির শর্ত হওয়ার কথা নয়।
ইতিহাস একদিন কঠোর ভাষায় বিচার করবে সেই দেশগুলোকে, যারা এই ভয়াবহতা থামাতে ব্যর্থ হয়েছে বা এতে সহযোগিতা করেছে—ঠিক যেমন আজ আমরা নাৎসি জার্মানির নৃশংসতা স্মরণ করি।
কেউ কি পুড়ে যাওয়া বা ছিন্নভিন্ন শিশুদের মৃতদেহ দেখে নীরব থাকতে পারে? অপুষ্টিতে হাড় বের হয়ে আসা শিশুদের দেখে কার হৃদয় অশ্রুহীন থাকতে পারে? তাহলে ‘সভ্য বিশ্ব’-এর নেতারা কোথায়?
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে মানবিকতা আশা করা হয়তো অযৌক্তিক। কিন্তু কানাডার মার্ক কারনি, ব্রিটেনের কির স্টারমার, ফ্রান্সের ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ—তাঁরা কোথায়?
সম্প্রতি জনমতের চাপে এ দেশগুলো ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু যদি তাদের আন্তরিকতা সত্যিই থাকে, তবে অবিলম্বে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে ইসরায়েলকে বেসামরিক জনগণের ওপর নির্বিচার বোমাবর্ষণ ও গণঅনাহার বন্ধে বাধ্য করা উচিত।
পৃথিবী ৭৫ বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের ব্যর্থ করেছে—আর ২০২৩ সালের অক্টোবরে সেই ব্যর্থতা আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে।
ফিলিস্তিনিদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে এবং দায়ীদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতে বিশ্বকে অবিরাম কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
—রবার্ট ফ্যানটিনা
মার্কিন লেখক ও মানবাধিকার কর্মী
প্রবন্ধটি বিশ্ব শিশু দিবস উপলক্ষে “যুদ্ধ ও সন্ত্রাসী হামলার শিকার শিশু” শীর্ষক সম্মেলনে উপস্থাপিত হয়, যা আয়োজন করে হাবিলিয়ান অ্যাসোসিয়েশন (ইরানের সন্ত্রাসী হামলার শহীদ পরিবারদের সংগঠন)।



