কুরআনজীবনযাপনতাফসীরধর্ম ও বিশ্বাসবিশেষ সংবাদবিশ্ব

لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ: ধর্মে জবরদস্তি নেই— তবে কী আকিদা-বিশ্বাস সম্পূর্ণ স্বাধীন?

ডক্টর মুহাম্মাদ ফারুক হুসাইন। প্রকাশ: ২১ ডিসেম্বর ২০২৫

মিডিয়া মিহির: ইসলামের এক মৌলিক ও বহুল আলোচিত নীতি হলো—لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ, অর্থাৎ ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই। কিন্তু এই বাক্যটি কি সত্য–মিথ্যার সব সীমারেখা মুছে দেয়? নাকি এটি মানুষের বিবেক, বুদ্ধি ও স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির প্রতি কুরআনের এক গভীর সম্মানবোধের প্রকাশ? সূরা বাকারা’র ২৫৬ নম্বর আয়াতের আলোকে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা এমন এক তাফসিরের মুখোমুখি হই, যেখানে স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে।ধর্ম গ্রহণে কোনো জবরদস্তি নেই—এই কুরআনিক নীতিকে কেন্দ্র করে একটি গভীর তাফসিরে বলা হয়েছে, এর অর্থ কখনোই সব বিশ্বাসের প্রতি নিরপেক্ষতা বা সত্য–মিথ্যার সীমা মুছে ফেলা নয়। বরং এটি মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ও স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির প্রতি সম্মান—যার মাধ্যমে সে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত হক ও বাতিলের মধ্য থেকে সচেতনভাবে নিজের পথ বেছে নেয়।

সূরা বাকারা’র ২৫৬ নম্বর আয়াতের আলোকে এই তাফসিরে ‘ধর্মে জবরদস্তির অনুপস্থিতি’-কে হকের প্রতি উদাসীনতা নয়, বরং মানববুদ্ধি ও স্বাধীন নির্বাচনের মর্যাদা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এতে ‘উরওয়াতুল উসকা’ (অটুট বন্ধন) ও ‘তাগুতকে অস্বীকার’-এর ধারণা বিশ্লেষণ করে প্রকৃত ঈমানের পথরেখা আঁকা হয়েছে এবং দুনিয়া ও আখিরাতে হক ও বাতিল অনুসরণের পরিণতিও তুলে ধরা হয়েছে।

আয়াতের মূল পাঠ

لَا إِكْرَاهَ فِی الدِّینِ ۖ قَدْ تَبَیَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَیِّ ۚ فَمَنْ یَکْفُرْ بِالطَّاغُوتِ وَیُؤْمِنْ بِاللَّهِ فَقَدِ اسْتَمْسَکَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَیٰ لَا انْفِصَامَ لَهَا ۗ وَاللَّهُ سَمِیعٌ عَلِیمٌ

অর্থ (সারার্থ):ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই; কারণ হেদায়াত ও গোমরাহির পথ সুস্পষ্ট হয়ে গেছে। অতএব যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে, সে এমন এক দৃঢ় বন্ধন আঁকড়ে ধরে যা কখনো ছিন্ন হয় না। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।

ধর্মে জবরদস্তি নেই—এর সঠিক অর্থ

কুরআনের সূক্ষ্ম ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো ‘ধর্মে জবরদস্তি নেই’—যা কখনো কখনো ভ্রান্ত ব্যাখ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপব্যবহারের শিকার হয়। কেউ কেউ মনে করেন, «لَا إِكْرَاهَ فِی الدِّینِ» মানে মানুষের জন্য যেকোনো বিশ্বাস—সত্য হোক বা মিথ্যা, এলাহীর হোক বা শয়তানি—সমানভাবে গ্রহণযোগ্য।

কিন্তু এই আয়াত মোটেই সে কথা বলে না। আয়াতটি মানুষের বিশ্বাসের বিষয়বস্তু নিয়ে নয়; বরং আল্লাহর কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে। অর্থাৎ, আল্লাহ নিজে ধর্মকে কোনো জোরপূর্বক বিষয় বানাননি। কারণ জবরদস্তি থাকলে ঈমানের কোনো মূল্য থাকত না; জান্নাত–জাহান্নামের পুরস্কার ও শাস্তির ধারণাও অর্থহীন হয়ে যেত।

বাস্তবতা হলো—বিশ্বাসের আসন মানুষের হৃদয়। অস্ত্র, ভয় বা চাপ প্রয়োগ করে হৃদয়ে নতুন কোনো বিশ্বাস ঢোকানো যায় না। মানুষ সত্য বা মিথ্যা—যেটিতেই বিশ্বাসী হোক না কেন, জোর করে তার অন্তরের বিশ্বাস বদলানো সম্ভব নয়; বড়জোর সে ভয়ে মুখে ভিন্ন কথা বলতে পারে।

জিহাদের উদ্দেশ্য: ধর্ম চাপিয়ে দেওয়া নয়

ইসলামে যুদ্ধ ও জিহাদের দর্শনও কখনো মানুষের ওপর জোর করে ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার জন্য নয়। বরং জিহাদ হলো— ধর্ম ও ঈমানের প্রতিরক্ষা, আক্রমণকারীর ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা, এবং সেই তাগুতি শক্তির মোকাবিলা করা, যারা যুদ্ধ জ্বালিয়ে দিয়ে আল্লাহর দীনের আলো নিভিয়ে দিতে চায়।

জবরদস্তির আশ্রয় সাধারণত তারাই নেয়, যারা নিজেদের চিন্তা ও সংস্কৃতিকে যুক্তির মাধ্যমে উপস্থাপন করতে অক্ষম বা অনিচ্ছুক। তখন তারা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে মানুষকে সাংস্কৃতিক বা রাজনৈতিক দাসত্বে আবদ্ধ করে।

হেদায়াত ও গোমরাহি: স্পষ্ট দুই পথ

আয়াতের পরবর্তী অংশে আল্লাহ বলেন—

«قَدْ تَبَیَّنَ الرُّشْدُ مِنَ الْغَیِّ»

অর্থাৎ, হেদায়াত ও গোমরাহির পথ সুস্পষ্টভাবে আলাদা করে দেখানো হয়েছে। ইসলামের বিধানসমূহ প্রজ্ঞাপূর্ণ; এর বহু হিকমত জ্ঞানী ও বিবেকবান মানুষের কাছেও স্পষ্ট।

মানুষ—যে কোনো শ্রেণি বা গোষ্ঠীর হোক—নিজের বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি দিয়ে ‘রুশদ’ (সঠিক পথ) এবং ‘গাই’ (পথভ্রষ্টতা) চিনতে সক্ষম। তাই ধর্মে জবরদস্তির কোনো জায়গা নেই। পথ দেখানো হয়েছে; বেছে নেওয়ার দায়িত্ব মানুষের।

পছন্দের স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা

এই কুরআনিক নীতির ভিত্তিতে মানুষ স্বাধীন—সে ঈমান বা কুফর, হক বা বাতিল, আল্লাহ বা শয়তান, জান্নাত বা জাহান্নাম—যেটিই বেছে নিক। কিন্তু এই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়বদ্ধতাও রয়েছে। ভুল পথ বেছে নিলে তার দায় অন্যের নয়, নিজেরই।

যেমনটি কবি সাদী বলেন— এত আলো জ্বালিয়েও যে পথভ্রষ্ট হয়, তাকে ছেড়ে দাও—পড়ে গিয়ে সে নিজেই তার পরিণাম দেখবে।(গুলিস্তান, সাদী)

দাওয়াতের শ্রেষ্ঠ পন্থা

ধর্ম উপস্থাপনের সর্বোত্তম উপায় হলো— কুরআনের সুদৃঢ় তাফসির, আহলে বাইত (আ.) এর নির্ভরযোগ্য হাদিসের প্রামাণ্য অনুবাদ, এবং নৈতিক গ্রন্থ—এসব ন্যায়সংগতভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা, তারপর তাকে ন্যায়বিচার ও গভীর চিন্তার সঙ্গে অধ্যয়নের সুযোগ দেওয়া।

নিশ্চয়ই, ইসলামের সত্য উপলব্ধি করলে অধিকাংশ মানুষ স্বেচ্ছায় হক দীনের পথ বেছে নেবে এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য অর্জন করবে।

রাসূলুল্লাহ -এর দিকনির্দেশনা

নবী করিম ﷺ বলেন—

الْأُمُورُ ثَلاثَةٌ: أَمْرٌ تَبَیَّنَ لَکَ رُشْدُهُ فَاتَّبِعْهُ،
وَ أَمْرٌ تَبَیَّنَ لَکَ غَیُّهُ فَاجْتَنِبْهُ،
وَ أَمْرٌ اخْتُلِفَ فِیهِ فَرُدَّهُ إِلَی اللّه‏ِ عَزَّ وَ جَلَّ
(আল-খিসাল; বিহারুল আনওয়ার)

অর্থাৎ: বিষয় তিন প্রকার—যার হেদায়াত স্পষ্ট, তা অনুসরণ করো; যার গোমরাহি স্পষ্ট, তা থেকে দূরে থাকো; আর যে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে, তা আল্লাহর কাছে সোপর্দ করো।

তাগুতকে অস্বীকার ও আল্লাহতে ঈমান: প্রকৃত তাওহীদের অপরিহার্য শর্ত

তাওহীদ এবং তার পার্শ্ববর্তী বিষয়সমূহ নিয়ে সূরা বাকারা’র ১৬৩ ও ২৫৫ নম্বর আয়াতের তাফসিরে বিস্তৃত আলোচনা ইতিপূর্বে উপস্থাপিত হয়েছে (দ্রষ্টব্য: তাফসিরে হাকিম)।

এই আয়াতে যে বিষয়টি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তা হলো—তাগুতকে অস্বীকার (কুফর) করার বিষয়টি আল্লাহতে ঈমান আনার আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। এর অন্তর্নিহিত কারণ সম্ভবত এই যে, প্রকৃত ও বাস্তব ঈমান কেবল তখনই রূপ পায়, যখন মানুষ তাগুতকে প্রত্যাখ্যান করে, মিথ্যা উপাস্যদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং আল্লাহ বিরোধী সংস্কৃতি ও জীবনদর্শনের অনুসরণ থেকে নিজেকে বিরত রাখে। এই সত্যটি এক অর্থে তাওহিদের কালেমা «لا إله إلاّ اللّه» –এর মধ্যেই সুপ্ত রয়েছে। কারণ এই কালেমার অর্থ কেবল আল্লাহকে মান্য করা নয়; বরং তার আগে সমস্ত মিথ্যা উপাস্যকে অস্বীকার করা, এবং তারপর একমাত্র সত্য উপাস্যের প্রতি দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা। অন্য কথায়, আল্লাহর প্রতি প্রকৃত ঈমান গঠিত হয় দুইটি মৌলিক ধাপের সমন্বয়ে— ১. সকল কৃত্রিম ও মিথ্যা উপাস্যের বর্জন ২. একমাত্র সত্য উপাস্য আল্লাহর নির্বাচন

আল-‘উরওয়াতুল উসকা’: অটুট মুক্তির বন্ধন

‘উরওয়া’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো হাতল বা ধরন, আর ‘উসকা’ শব্দটি এসেছে ‘ওছক’ ধাতু থেকে—যার অর্থ দৃঢ়, মজবুত ও অবিচল। এ কারণেই দৃঢ় অঙ্গীকারকে ‘মীসাক’ বলা হয়। যেমনটি সূরা রা‘দের ২৫ নম্বর আয়াতে দেখা যায়।

এই আয়াতে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে—যে ব্যক্তি বিশ্বাস ও কর্মে তাগুতকে তার সব রূপে প্রত্যাখ্যান করে, তার ধ্বংসাত্মক সংস্কৃতির দাসত্বে আবদ্ধ না হয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে তাওহীদ ও ঈমানের পরিসরে প্রবেশ করে, সে নিঃসন্দেহে মুক্তির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হাতলকে আঁকড়ে ধরেছে—

«فَقَدِ اسْتَمْسَکَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَی» এমন এক হাতল, যার মধ্যে কোনো বিচ্ছেদ বা ভাঙনের আশঙ্কা নেই— «لاَ انفِصَامَ لَهَا» মরহুম আল্লামা মাজলিসি (রহ.)‘উরওয়াতুল উসকা’ প্রসঙ্গে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেন—

‘উরওয়া’ বলতে কলসি বা পানির পাত্রের হাতলকে বোঝানো হয়। যে ব্যক্তি একটি পাত্রের হাতল দৃঢ়ভাবে ধরে, সে যেন পুরো পাত্রটিরই অধিকারী হয়। একইভাবে, যে ব্যক্তি ইসলামের এই ‘উরওয়া’কে আঁকড়ে ধরে, সে সমস্ত কল্যাণ অর্জন করে নেয়।
(বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৬৫, পৃ. ৩৫২)

আহলে বাইত (আ.)-এর বর্ণনায় ‘উরওয়াতুল উসকা’

আহলে বাইত (আ.)-এর বর্ণনায় ‘উরওয়াতুল উসকা’ বিভিন্ন অর্থে ব্যাখ্যাত হয়েছে—যেমন: আল্লাহতে ঈমান, পূর্ণ আত্মসমর্পণ, এবং আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা। কিছু বর্ণনায় এটি সরাসরি আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)-এর সত্তার সঙ্গেও ব্যাখ্যাত হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন—

مَنْ أَحَبَّ أَنْ یَسْتَمْسِکَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَی الَّتِی لاَ انْفِصَامَ لَهَا، فَلْیَسْتَمْسِکْ بِوِلاَیَةِ أَخِی وَ وَصِیِّی عَلِیِّ بْنِ أَبِی طَالِبٍ؛ فَإِنَّهُ لاَ یَهْلِکُ مَنْ أَحَبَّهُ وَ تَوَلاَّهُ، وَ لاَ یَنْجُو مَنْ أَبْغَضَهُ وَ عَادَاهُ

অর্থ: যে ব্যক্তি সেই অটুট বন্ধনকে আঁকড়ে ধরতে চায়, যা কখনো ছিন্ন হয় না—সে যেন আমার ভাই ও ওসী আলী ইবনে আবি তালিবের বেলায়াত কে আঁকড়ে ধরে। কারণ যে তাকে ভালোবাসে ও অনুসরণ করে, সে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় না; আর যে তার সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করে, সে কখনো মুক্তি পায় না। আমিরুল মুমিনিন আলী (আ.) নিজেই বলেন—

«أَنَا صِرَاطُ اللّه‏ِ الْمُسْتَقِیمُ، وَ عُرْوَتُهُ الْوُثْقَی الَّتِی لاَ انْفِصامَ لَها»

অর্থ:আমি আল্লাহর সরল পথ, এবং সেই দৃঢ় বন্ধন—যার কোনো বিচ্ছেদ নেই।

আরও এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ফজরের নামাজ শেষে বলেন—

مَعَاشِرَ أَصْحَابِی، مَنْ أَحَبَّ أَهْلَ بَیْتِی حُشِرَ مَعَنَا، وَ مَنِ اسْتَمْسَکَ بِأَوْصِیَائِی مِنْ بَعْدِی فَقَدِ اسْتَمْسَکَ بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقی

অর্থাৎ:হে আমার সাহাবিগণ! যে আমার আহলে বাইতকে ভালোবাসে, সে আমাদের সঙ্গেই কিয়ামতে উত্থিত হবে; আর যে আমার পরবর্তী ওসীদের অনুসরণ করে, সে নিঃসন্দেহে ‘উরওয়াতুল উসকা’কে আঁকড়ে ধরেছে।এরপর আবু যর গিফারি প্রশ্ন করেন—
হে আল্লাহর রাসূল! আপনার পরে ইমাম কতজন? তিনি বলেন—
«عَدَدَ نُقَبَاءِ بَنِی إِسْرَائِیلَ»

তিনি আবার জিজ্ঞেস করেন—তাঁরা কি সবাই আপনার আহলে বাইত থেকে? রাসূল ﷺ বলেন—
«کُلُّهُمْ مِنْ أَهْلِ بَیْتِی؛ تِسْعَةٌ مِنْ صُلْبِ الْحُسَیْنِ، وَ الْمَهْدِیُّ مِنْهُمْ»

অর্থাৎ:তাঁরা সবাই আমার আহলে বাইত থেকে; নয়জন হুসাইনের বংশধর, আর মাহদি (আ.) তাঁদের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত।

আল-‘উরওয়াতুল উসকা’ আঁকড়ে ধরার পথসমূহ

কুরআনের এই মহিমান্বিত আয়াতের আলোকে স্পষ্ট হয় যে, আল-‘উরওয়াতুল উসকা’—অর্থাৎ অটুট ও অবিচল বন্ধন—কে আঁকড়ে ধরা মানুষের জন্য হেদায়াত অর্জনের মাধ্যম; আর এই হেদায়াতই মানবিক পূর্ণতার চূড়ান্ত লক্ষ্য। তবে এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—

আল-‘উরওয়াতুল উসকা’কে আঁকড়ে ধরার পথগুলো কী কী?

উল্লেখযোগ্য যে, ‘উরওয়াতুল উসকা’-এর প্রতি ইঙ্গিত শুধু সূরা বাকারা’র এই আয়াতেই নয়; বরং সূরা লুকমানের ২২ নম্বর আয়াতেও এসেছে। এই দুই আয়াতের সমষ্টিগত বিশ্লেষণে ‘উরওয়াতুল উসকা’-তে অবিচল থাকার উপায়গুলোও সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

সার্বিকভাবে, এই দুই আয়াতের ভিত্তিতে ‘উরওয়াতুল উসকা’ আঁকড়ে ধরার পথ চারটি—

১.তাগুতকে অস্বীকার করা
«فَمَنْ یَكْفُرْ بِالطَّاغُوتِ»

২.আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা
«وَیُؤْمِنْ بِاللَّهِ»

৩.সমগ্র সত্তাকে আল্লাহর দিকে সমর্পণ করা
«وَمَنْ یُسْلِمْ وَجْهَهُ إِلَى اللَّهِ»

৪.ইহসান ও সৎকর্মে নিজেকে সজ্জিত করা
«وَهُوَ مُحْسِنٌ»

চার পথের ব্যাখ্যা

এখানে তাগুতকে অস্বীকার করা’ বলতে বোঝানো হয়েছে—কুফরি সংস্কৃতি ও আল্লাহ বিরোধী চিন্তাধারার কাছে মাথা নত না করা।

আর আল্লাহর প্রতি ঈমান’ বলতে কেবল মৌখিক বিশ্বাস নয়; বরং তাওহীদে বিশ্বাস এবং তার অপরিহার্য অনুসঙ্গ—নবুওত ও বেলায়েত—কে গ্রহণ করাও অন্তর্ভুক্ত।

সমগ্র সত্তাকে আল্লাহর দিকে সমর্পণ করা’ বলতে বোঝানো হয়েছে—দ্বীনের ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ ইখলাস, প্রতিটি কাজে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের নিয়ত, এবং জ্ঞান ও কর্ম—উভয় ক্ষেত্রেই তাঁর আদেশ–নিষেধের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার।

এই আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, এই চারটি রাজপথের বিপরীত পথ— তাগুতে ঈমান আনা, প্রভুকে অস্বীকার করা, আল্লাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, এবং ইহসান পরিত্যাগ করা—
সবই ‘উরওয়াতুল উসকা’ আঁকড়ে ধরার পথে প্রতিবন্ধক।

কিন্তু যে ব্যক্তি এই চার মূলনীতিতে অবিচল থাকে, তার জন্য ‘উরওয়াতুল উসকা’-তে দৃঢ়তা বাস্তব রূপ পায়; আর তার ফলশ্রুতিতে নিশ্চিত হেদায়াত, আল্লাহর বেলায়েত, শুভ পরিণাম এবং অন্ধকার থেকে আলোর দিকে উত্তরণ তার ভাগ্যে জোটে।

এর বিপরীতে, এই বন্ধন থেকে বিচ্যুত হলে পরিণতি হয়—অসহায়তা, কঠোর শাস্তি, আল্লাহর বেলায়েত থেকে বঞ্চিত হয়ে শয়তানের আধিপত্যে পতন, এবং আলো থেকে অন্ধকারে নিমজ্জন।

‘سَمِيعٌ عَلِيمٌ’—দুটি গুণের তাৎপর্য

আয়াতের শেষে আল্লাহ তাআলা নিজের দুটি নাম উল্লেখ করেছেন—

«وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ»

এর গভীর তাৎপর্য রয়েছে। ঈমানের প্রথম ধাপ হলো মৌখিক স্বীকৃতি—যার সঙ্গে ‘সামি‘’ (সর্বশ্রোতা) নামের সম্পর্ক। আর ঈমানের দ্বিতীয় ধাপ হলো অন্তরের দৃঢ় বিশ্বাস—যার সঙ্গে ‘আলিম’ (সর্বজ্ঞ) নামের গভীর সামঞ্জস্য রয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহ তোমার জিহ্বার ঘোষণা শোনেন এবং তোমার হৃদয়ের দৃঢ় বিশ্বাসও সম্পূর্ণভাবে জানেন।

তাগুত বলতে কী বোঝায়

‘তাগুত’ শব্দটি ‘فَعَلوت’ ওজনে গঠিত এবং এসেছে ‘তুগইয়ান’ ধাতু থেকে—যার অর্থ সীমালঙ্ঘন, বিদ্রোহ ও অবাধ্যতা। কুরআনের আয়াত ও আহলে বাইত (আ.)-এর বর্ণনার আলোকে বোঝা যায়—যে কোনো শক্তি, ব্যক্তি, চিন্তাধারা বা ব্যবস্থা, যা মানুষকে সত্যের পথ থেকে বাধা দেয় এবং গোমরাহির দিকে টেনে নেয়—সবই তাগুতের অন্তর্ভুক্ত।

মরহুম আল্লামা মাজলিসি (রহ.) এ প্রসঙ্গে লিখেছেন— রেওয়ায়েতে তাগুতকে কখনো শয়তান, কখনো পথভ্রষ্ট নেতাদের ব্যাখ্যা করা হয়েছে। তবে সঠিক হলো—এর পরিধি ব্যাপক ধরা, যাতে আল্লাহ ছাড়া সব মিথ্যা উপাস্য এবং আল্লাহর পথে প্রতিবন্ধক সব শক্তিই এর অন্তর্ভুক্ত হয়।(বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ৬৪, পৃ. ১৩১)

তিনি অন্যত্র আরও স্পষ্টভাবে বলেন—

«تَفْسِیرُ الطَّاغوتِ: الشَّیْطَانُ وَ الْأَصْنَامُ، وَ كُلُّ مَعْبُودٍ غَيْرُ اللَّهِ، وَ كُلُّ مُطَاعٍ بَاطِلٍ سِوَى أَوْلِيَاءِ اللَّهِ…»

অর্থাৎ, তাগুত বলতে বোঝায়—শয়তান, মূর্তি, আল্লাহ ছাড়া সব উপাস্য, এবং আল্লাহর ওলিদের বাইরে যে কোনো বাতিল কর্তৃত্ব, যার আনুগত্য করা হয়। আহলে বাইত (আ.) বহু রেওয়ায়াত ও জিয়ারাতে তাঁদের শত্রুদের ‘জিবত’, ‘তাগুত’, ‘লাত’ ও ‘উজ্জা’ নামে অভিহিত করেছেন।(বিহারুল আনওয়ার, খণ্ড ২৮, পৃ. ৪২)

তাফসিরে কুমিতে ‘তাগুত’ বলতে আহলে বাইত (আ.)-এর অধিকার হরণকারীদেরও বোঝানো হয়েছে।(তাফসিরুল কুমি, খণ্ড ১, পৃ. ৪৮)

তাগুতের শয়তানি প্রকৃতি

তাগুতের মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো—তার আল্লাহ বিরোধী সত্তা। প্রকৃতপক্ষে তাগুত একটি শয়তানকেন্দ্রিক প্রবাহ; আর অন্যান্য তাগুত হলো শয়তানের হাতিয়ার, যার মাধ্যমে সে মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও আচরণের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে।

কুরআনের ভাষ্য অনুযায়ী, তাগুতের আনুগত্য—যা মানুষের পথভ্রষ্টতার কারণ—মূলত কাফিরদের বৈশিষ্ট্য। এই আনুগত্য তাদের চিন্তাকে এমনভাবে গ্রাস করে যে তারা আল্লাহর আয়াত অস্বীকার করে এবং শয়তানের শক্তি বৃদ্ধির জন্য হকপন্থীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতেও প্রস্তুত হয়।

তাগুতের অনুসরণের পরিণতি

তাওহীদের ঐশী সংস্কৃতি হলো হেদায়াতের সংস্কৃতি—যা দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের নিশ্চয়তা দেয়। এর বিপরীতে যে কোনো সংস্কৃতি অবধারিতভাবে ধ্বংস ও বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যায়। কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা অনুযায়ী, তাগুতে ঈমান আনা ও তার অনুসরণ করার পরিণতি হলো— পথভ্রষ্টতা,আল্লাহর সাহায্য থেকে বঞ্চনা, ঐশী অভিশাপ, আল্লাহর বেলায়েত থেকে বহিষ্কার, এবং শয়তানের বেলায়েতরে অধীনতা।

আখিরাতে এর ফল হবে কঠোর ও অবশ্যম্ভাবী শাস্তি—যা থেকে কোনো শক্তিই রক্ষা করতে পারবে না।

এটি স্বাভাবিকই; কারণ শয়তান ও তাগুতের পথ হকের পথ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সুতরাং সে পথে চলার ফলও ভিন্ন হবেই। তাগুতের অনুসরণে কোনো কল্যাণ নেই; কারণ সব সত্য ও মঙ্গল নিহিত রয়েছে হেদায়াতের পথে—যা হলো ঈমান ও আত্মসমর্পণের পথ। এর বাইরে যা কিছু আছে, তা কেবলই মরীচিকা।

উৎস: তাফসিরে হাকিম, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৯১।

আরও পড়ুন 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button